You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব ৩: ২য় খন্ড)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব ৩: ২য় খন্ড)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস  এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

মহিলা মুক্তিফৌজ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি দিবস উপলক্ষে পঞ্চম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদূর পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে আবদ্ধ। স্বাধীন বাংলার জননায়ককে আটক রাখার কোন অধিকার পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নেই। বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রিয় নেতাকে উদ্ধার করে আনবে। এজন্য প্রয়োজন হলে আমরা পাঞ্জাবের বুকেও রক্তের সমুদ্রে কঙ্কালের পাহাড় তৈরি করতে কুন্ঠিত হবো না। আমরা বিশ্বের সকল দেশ ও জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, ৭ কোটি বাঙ্গালির প্রিয় নেতার প্রতি ইয়াহিয়া খানের কোন অশিষ্ট আচরণ বা বঙ্গবন্ধুর প্রাণের প্রতি হানিকর কিছু ঘটলে মুক্তিযোদ্ধারা কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যদি এতে বিশ্ব শান্তি বিপন্নও হয় তবু আমরা ক্ষান্ত হব না। জয় বাংলা।’

ষষ্ঠ সভায় মোট ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছেÑ প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানকারী দলকে প্রশিক্ষণ দিতে একজন চিকিৎসক নিয়োগ করতে চেলা শরনার্থী শিবিরের আঞ্চলিক ত্রাণ কর্মকর্তাকে অনুরোধ, ওষুধ এবং কাপড় প্রদানের জন্য ভারতীয় সমাজসেবী অঞ্জলি লাহিড়ীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং কুটির শিল্প কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করে সদস্যাদেরকে প্রদান।

বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কাজের জন্যে সদস্যাদের নাম তালিকাভূক্ত করা করা হয় এদিন।

প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রীতি রানী দাস পুরকায়স্থ, শুল্কা রানী দে, লক্ষী রানী দে, রানী বালা দাস, শৈবলেনী দে, হেমলতা দেব, গীতা রানী নাথ ও মণিরানী দেব, কুটির শিল্পে অনিরানী দাশ, মীরা রানী দাশ, গৌরী রানী ঘোষ, দুলু রানী ঘোষ, শেফালী রানী দাস, আরতি রানী আচার্য্য, শান্তিলতা চন্দ, সন্ধ্যা রানী দাশ, শান্তি রানী ঘোষ ও রেখা রানী দস্তিগার, মুদ্রাক্ষরে আরতি রানী চন্দ, গীতা রানী দাশ, বেলা রানী দাশ ও নমিতা রানী সরকার, ধাত্রীবিদ্যায় শেফালী রানী দাশ, রেবা রানী কর, শুল্কা রানী দে ও হীরা প্রভা দাস, রামকৃষ্ণ মিশনের কাজে গায়ত্রী তরফদার বাসন্তী আচার্য্য ও রমা রানী দাশ, প্রশিক্ষণ সেবায় কানন দেবী, উপাসনা রায়, সুধারানী কর, রমারানী দাশ, মঞ্জুরানী দেবী, কল্পনারানী নাগ, প্রতিভারানী দাস, প্রভারানী দাশ, পূর্ণিমা রানী দাস ও নিশা রানী মজুমদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সপ্তম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল ভারতের ডেপুটি স্পীকার অধ্যাপক জি. জি. সোয়েলের চেলা আগমন উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহন, প্রসূতিদের যথাযথ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে মাতৃমঙ্গল প্রতিষ্ঠা, ডাক্তার সেবিকার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিশুখাদ্য ও রেশনের মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন।

অঞ্জলি লাহিড়ী কতৃক প্রদত্ত কাপড় লটারির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় অষ্টম সভায়।

নবম সভায় ৪টি সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল অঞ্জলি লাহিড়ীর দেওয়া ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ, ১০ জন সদস্যের মধ্যে কুটির শিল্পের উপকরণ বণ্টন, ১৫ অক্টোবর থেকে ডাক্তারদের সাথে সেবা প্রশিক্ষণ শুরু, আহতদের জন্যে ২ শয্যা বিশিষ্ট একটি গৃহের ব্যবস্থা গ্রহনে আলোচনা এবং সংগঠনের সম্পাদিকা অসুস্থ অবস্থায় শিলং অবস্থান করায় কানন দেবীকে এ পদের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা হয়।

দশম সভায় গৃহীত ৩টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের শিলং যাবার পথে বিশ্রামের জন্য একটি গৃহনির্মান করে দিতে তরুণ সংঘের সম্পাদক তপন কুমার দাশকে অনুরোধ, যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ফোটানো জল ও শুকনো খাবার পৌছে দেবার প্রয়োজনে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানীর কাছে এক হাজার টাকা সাহায্যের আবেদন এবং ডাঃ দিগেন্দ্র দাশ ও ডাঃ খলিলুর রহমানকে সেবা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গতিশীল করতে অনুরোধ জ্ঞাপন। ওসমানী চেলা সাব-সেক্টর পরিদর্শনকালে ১ হাজার টাকা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বালিউড়া যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিকীর পরিবারকে সাহোয্যের জন্য একাদশতম সভায় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের নিকট অনুরোধ জানান মহিলা মুক্তিফৌজের সদস্যরা। কর্নেল ওসমানী এ দিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিকীর গর্ভধারিণীকে একশ’ টাকা সাহায্য প্রদান করেন। সভায় এই অর্থ সাহায্য প্রদানের জন্য ওসমানীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরো একটি নিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

দ্বাদশতম এবং শেষ সভায় চেলা শরণার্থী শিবিরে অবস্থানকারীদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সংগ্রহ, গোলা সরবরাহ ও রাস্তাঘাট নির্মাণে দিনরাত প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে ৪টি সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানে শরণার্থীদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে মনোরঞ্জন চক্রবর্তী ও গীতা রাণী দত্তকে ইছামিত, হেমেন্দ্র দাশ পুরকায়স্থ ও প্রীতি রানী দাশ পুরকায়স্থকে চেলা ও আরজদ আলী মিয়াকে ডিংরাই শিবিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া অঞ্জলি লহিড়ী ও ভারতীয় জেনারেল অফিসার কমাণ্ডিং এর নিকট থেকে প্রাপ্ত ওষুধপত্র মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার স্বার্থে চেলা সাব-সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ক্যাপ্টেন (মেজর) এম এ. মুত্তালিবের নিকট প্রদান ও কুটির শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী বিক্রির জন্যে শিলংয়ে অঞ্জলি লাহিড়ীর কাছে প্রেরণ, বাঁশতলা মুক্তিবাহিনী হাসপ্রতাল ও ভোলাগঞ্জ সাব-সেক্টরে সত্বর সেবিকাদের যোগদানের সুবিধার্থে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রশিক্ষন সমাপ্ত করার জন্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরকে অনুরোধ জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তথ্যসূত্র

১. আল-আজাদ, একাত্তরের সিলেট: অন্যরকম যুদ্ধ, আদৃতা প্রকাশনী, সিলেট ১৯৯৮

২. মালেকা বেগম, একাত্তরের নারী, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা ২০০৪

আগের অংশ পড়ুন 

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব ৩: ১ম খন্ড)

 

 

Similar Articles

Leave a Reply