You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব ৩: ১ম খন্ড)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব ৩: ১ম খন্ড)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

মহিলা মুক্তিফৌজ

মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকার একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে ‘চেলা সাব-সেক্টর মহিলা মুক্তিফৌজ সহায়ক কমিটি’। ৫ নং সেক্টরের অধীনস্থ চেলা সাব সেক্টরের কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের উদ্যোগে এই কমিটি গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তারা এই উদ্যোগ গ্রহন করেন। সেই প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে মহিলা মুক্তিফৌজ সহায়ক কমিটি গড়ে উঠে। যাদের প্রাগ্রসর চিন্তায় এই কমিটি গঠিত হয় তারা হচ্ছেন ছাতক-জগন্নাথপুর থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম আবদুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা হেমেন্দ্র দাস পুরকায়স্থ, ধর্মগুরু প্রভাত চক্রবর্তী এবং ভারতীয় খাসিয়া নেতা দেবদাস রায়। তারা ছাতক, জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ থানার নারীদের সংগঠিত করে এক প্লাটফর্মে সমবেত করেন। ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই চেলা সাব-সেক্টরের মুক্তাঞ্চল বাঁশতলায় এই কমিটি গঠনের লক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামীলীগ নেতা হেমেন্দ্র দাশ পুরকায়স্থ। সভায় প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থকে সভানেত্রী, গীতা রানী নাথকে সহ-সভানেত্রী ও নিবেদিতা দাশকে সাধারন সম্পাদক করা হয়। সদস্য করা হয় সুধারানী কর, প্রমীলা দাশ, যূথিকা রানী রায়, কানন দেবী (শক্তি), মঞ্জু দেবী, সুষমা দাস, সুমীতি দেবী, শেফালী দাশ ও রমা রানী দাশকে।

প্রথম সভায় কার্যকরী পরিষদ গঠনসহ নানা সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এরমধ্যে ছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের অভাব-অভিযোগ শুনা এবং সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহন এবং অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য শিক্ষিত মেয়েদেরকে নিয়ে স্থানীয় ডাক্তারদের সহায়তায় সেবিকা দল গঠন।

সভায় ভারতীয় সমাজসেবিকা অঞ্জলি লাহিড়ীর শিলং থেকে প্রেরিত ওষুধ মুক্তি বাহিনীর বিভিন্ন শিবিরে প্রেরণের জন্যে হেমেন্দ্র দাশ পুরকায়স্থের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মহিলা মুক্তিফৌজের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় সভার কার্য বিবরণী থেকে। যা ঐ সময় তারা মলাটবদ্ধ খাতায় তুলে রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মহিলা মুক্তিফৌজ কমিটির মোট ১২ টি সভা দেবদাস রায় ও প্রীতি রানী দাস পুরকায়স্থের বাসভবন এবং স্থানীয় শরণার্থী শিবিরস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভানেত্রী প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থ।

মহিলা মুক্তিফৌজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হয়ে ২৩ জুলাই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান ও ২২ অক্টোবর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এম. এ জি. ওসমানী চেলা সাব-সেক্টর পরিদর্শন করেন। দু’জনেই দুঃসময়ে নারীদের এমন কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রংশা করেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মহিলা মুক্তিফৌজের ১২ টি সভা ২৭ জুলাই, ২৮ জুলাই, ২৯ জুলাই, ১ আগস্ট, ৮ আগস্ট, ৯ আগস্ট, ২৫ আগস্ট, ২৫ সেপ্টেম্বর, ৫ অক্টোবর, ১৫ অক্টোবর, ২২ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। সাংগঠনিক সভাগুলো ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথম সভায় ‘আমাদের কর্তব্য’ শিরোনামে গৃহীত হয় ৬টি সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে-মুক্ত এলাকায় একজন ধাত্রী নিয়োগ এবং নিয়োগকৃত ধাত্রীকে বেতন প্রদানের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করা, কুটির শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাশতলা এলাকায় অভিজ্ঞ মেয়েদেরকে নিয়োগ, সার্বিক ব্যয় পরিশোধের সুবিধার্থে সম্পাদিকার বিল পেশ, মুক্ত এলাকার গ্রামের মেয়েদের কুটির শিল্প কাজের জন্য সুতা ক্রয়, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রষার প্রয়োজনে সেবিকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু ও এর ব্যয় হিসেবে প্রবাসী সরকারের নিকট এককালীন ৫শ’টাকা সাহায্য কামনা এবং কাজের সুবিধার্থে নিবেদিতা দাশকে সাধারণ সম্পাদিকা ও গীতা রানী নাথকে প্রচার ও সাংগঠনিক সম্পাদিকার দায়িত্ব অর্পন। এছাড়াও অঞ্জলি লাহিড়ী প্রেরিত পুরনো কাপড় ৩০ জুলাই বণ্টন ও পরদিন সভা করে নতুন সদস্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

নতুন সদস্য গ্রহন করা হয় দ্বিতীয় সভায়। এর ফলে ৪২-এ পৌছে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা।

তৃতীয় সভায় ৫টি সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এডভোকেট আবদুল হক, দেবদাস রায়, প্রভাত চক্রবর্তী ও হেমেন্দ্র দাশ পুরকায়স্থকে সর্বসম্মতিক্রমে উপদেষ্টা নির্বাচন করা হয়। এছাড়াও সংগঠনকে সহায়তা করায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান, জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট আবদুল হক, খাসিয়া নেতা দেবদাস রায় ও অঞ্জলি লাহিড়ীকে ধন্যবাদ জানানোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেই সাথে ভারত থেকে সেলাইর জন্যে বিভিন্ন সামগ্রী আনতে দেবদাস রায়কে একটি তালিকা প্রদান করা হয়।

আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার লক্ষ্যে সেবিকা তৈরির প্রস্তাবের পাশাপাশি একটি প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা, হাসপাতাল ও কার্যালয়ের জন্যে ৩টি কক্ষ, সপ্তাহে ৩দিন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সহায়তা ও মুক্ত এলকায় সাংগঠনিক কাজ পরিচালনার প্রয়োজনে কার্যকরী পরিষদের ৯ জন সদস্যের জন্যে পাস চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

চেরাপুঞ্জি রামকৃষ্ণ মিশন সম্পাদক স্বামী ভূতেশানন্দ-এর চেলা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের কর্মসূচি গ্রহন করা হয় চতুর্থ সভায়।

তথ্যসূত্র

১. আল-আজাদ, একাত্তরের সিলেট: অন্যরকম যুদ্ধ, আদৃতা প্রকাশনী, সিলেট ১৯৯৮

২. মালেকা বেগম, একাত্তরের নারী, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা ২০০৪

আগের অংশ পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:২)

 

 

Similar Articles

Leave a Reply