You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:২)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:২)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

প্রতিবাদী নারী মিছিল

মিটিং, গানে

সিলেটের নারীরা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সব সময়ই প্রতিবাদী। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেভাবে তারা লড়াই করেছেন ঠিক সেভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বাধীকারের দাবীতেও ছিলেন সোচ্চার। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউবা ছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়।

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো নানাভাবে, নানা মাত্রায়। সিলেটের বিপুল সংখ্যক নারী মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন তা ছিল দুঃসাহসিক। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি না থেকে সুরমা পাড়ের নারীরা রাজপথে নেমেছিলেন মুক্তির অন্বেষনে। স্বাধীকারের দাবীতে শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলেছিলেন উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় শহর। শুধু মিছিলেই নয় নারীরা গেয়েছেন মুক্তির গান।

মার্চ মাসে যখন সারাদেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে, সেই ঢেউ এসে সিলেটেও আঘাত হানে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষজন স্বাধীনতার দাবীতে রাজপথে নামেন। সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থার অগ্রনী ভূমিকায় এক প্লাটফর্মে দাঁড়ান সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ। ১৭ মার্চ সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থার জল্লারপাড়স্থ কার্যালয়ে গঠন করা হয় ‘কলম-তুলি-কন্ঠ-সংগ্রাম পরিষদ। এই সভায় ৪০ জন কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, শিল্পী অংশগ্রহন করেন। উপস্থিত সদস্যের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল ১০ জন। সেদিন যে সকল নারী ঐ সভায় অংশগ্রহন করেছিলেন তারা হলেন, ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, আরতি ধর, রুমা ঘোষ, আমিরুন্নেছা খাতুন, কেয়া চৌধুরী, মুক্তা চৌধুরী, জয়া দত্ত, রাখি চক্রবর্তী, শামসুন্নাহার করিম ও ফাহমীনা নাহস।

সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কলম-তুলি-কন্ঠ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে কবি দিলওয়ার সভাপতি, সিরাজ উদ্দিন আহমদ আহ্বায়ক এবং আরতি ধর ও শামসুন্নাহার করিম যুগ্ম আহ্বায়িকা নির্বাচিত হন।

সভায় ২২শে মার্চ বিকেল ৪টায় রেজিষ্ট্রারি মাঠে গণসঙ্গীতের আসর করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। গণসঙ্গীতের অনুষ্ঠান সফল করার লক্ষ্যে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যকে আহ্বায়ক, রুমা ঘোষকে যুগ্ম আহ্বায়িকা, আরতি ধরকে সঙ্গীত পরিচালিকা, হিমাংশু বিশ্বাস ও দুলাল ভৌমিককে সহযোগী করে সঙ্গীত উপ-পরিষদ গঠন করা হয়।

 

১৯শে মার্চ কলম-তুলি-কন্ঠ সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অসহযোগ আন্দোলনকালে শহীদদের পরিবারকে সাহায্যের জন্য সাহায্য মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই মিছিলে অগণিত নারী অংশগ্রন করেন। ২২শে মার্চ রেজিষ্ট্রারি মাঠে কবি দিলওয়ার রচিত ‘দুর্জয় বাংলা’ শীর্ষক গণসঙ্গীতের আসর বসে। এতে রাম কানাই দাস, রাখী চক্রবর্তী, শামসুন্নাহার করিম, রুমা শ্যাম, মুক্তা চৌধুরী, আরতি ধর, সুতপা ভট্টাচার্য, যতীন দাস, দুলাল ভৌমিক, নিশীথ পুরকায়স্থ, হিমাংশু বিশ্বাস, আলী আকবর খান, ছন্দা পুরকায়স্থ, জয়া দত্ত, নাসরিন বেগম রোজী, আমিরুন্নেছা খাতুন, নীহার রঞ্জন পুরকায়স্থ, সজল পাল প্রমুখ অংশগ্রহন করেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য ও কেয়া চৌধুরী। প্রতিটি অনুষ্ঠানে পুরুষের পাশাপাশি নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহন স্বাধীনতা আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা সংযোজিত করে।

মার্চ মাসে সিলেটে অসংখ্য মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামীলীগ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মহিলা পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এসব মিছিল সমাবেশে পুরুষের তুলনায় কোনো অংশে কম ছিলনা নারীদের উপস্থিতিতি। এইসব মিছিল সমাবেশে নারীদের সম্পৃক্ত করতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তাদের মধ্যে আলম রওশন চৌধুরী, ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, আবেদা চৌধুরী, ফাতেমা চৌধুরী, জেবুন্নেসা হক, সুফিয়া তাহের অন্যতম। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে রাজপথে নামতে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন অগনিত নারী।

বিশেষ করে মহিলা পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একাধিক মিছিল মুক্তিকামী সাধারন মানুষের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়। ১০ মার্চ ও ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত মহিলা পরিষদের দুটি মিছিলে নানা বয়সের বিপুল সংখ্যক নারী অংশগ্রহন করেন। দুটি মিছিলে সর্বস্তরের নারীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন ঊষা দাশ পুরকায়স্থ, খোদেজা কিবরিয়া, নীনা চৌধুরীসহ মহিলা পরিষদের নেত্রীস্থানীয়রা। মিছিল সফল করতে সিলেট শহরের অলিগলিতে মাইক দিয়ে প্রচারনা চালান ষোড়শী চক্রবর্তী। ঐ দুটি মিছিলে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হচ্ছেন, ললিতা বালা দত্ত, নলিনী প্রভা দাস, বিলকিস সরদার, অর্চনা দেব, রঞ্জুলেখা দত্ত, শিপ্রা পাল, রাহেল বেগম, কেয়া চৌধুরী, মুক্তা চৌধুরী, অর্পণা পাল, খুশী চৌধুরী ও শতদল বাসিনী পাল, ইরা ভট্টাচার্য্য, স্নেহলতা দেবী, সরোজ বালা দেবী, ললিতা দত্ত, কিশোরী যুথিকা দে, প্রীতি দে, তাপসী চক্রবর্তী লিপি, মৌসুমী দাশ পুরকায়স্থ প্রমুখ।

২৫শে মার্চ কালো রাতে মুক্তিকামী বাঙালিদের উপর পাকহানাদাররা ঝাপিয়ে পড়লে অবস্থা বিবেচনায় অগণিত নারী নিরাপাদ আশ্রয়ের জন্য প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে পাড়ি জমান। তারা দেশ ত্যাগ করলেও পরাধীনতার শৃংখল মুক্তির লড়াইয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখেন ভিন্নভাবে। বিভিন্ন শিল্পী সংস্থার সাথে জড়িত থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে থাকেন।

শিলচরে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য বাংলাদেশ গণমুক্তি শিল্পী সংস্থা গড়ে তুলেন। এই সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন আরতি ধর, ভারতী ভৌমিক ও নাসরিন বেগম রোজী।

নাট্যশিল্পী শিবু ভট্টাচার্য ও সুরকার সুজেয় শ্যামের নেতৃত্বে হাইলাকান্দিতে গড়ে উঠে আরেকটি সাংস্কৃতিক দল। এর সাথে অনিতা সিনহা, ছবি দত্ত, প্রণতি শ্যাম, মুনমুন সোম, মধুমিতা দেব, মহুয়া দেব, তিন্নি দেব যুক্ত ছিলেন। এই সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা গীতিনাট্য পরিবেশন করতেন। এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ যুদ্ধের ব্যয় হিসেবে দান করা হতো। শিল্পীরা শরণার্থী শিবিরে গিয়ে যুবকদেরকে মুক্তির লড়াইয়ে অংশ নিতে প্রেরণা যোগাতেন।

শিলচরে আলোকচিত্রী ও কন্ঠশিল্পী নিশীথ পুরকায়স্থ, সহোদর নীহার রঞ্জন পুরকায়স্থ ও সহোদরা সুদত্তা পুরকায়স্থ সহযোগে প্রতিষ্ঠা করেন আলাদা একটি সাংস্কৃতিক দল। বাংলাদেশ-ভারত লিয়াজোঁ কমিটির সকল অনুষ্ঠানে এবং যুদ্ধযাত্রার আগে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্যে তারা সঙ্গিত পরিবেশন করতেন।

তথ্যসূত্র

১. আল-আজাদ, একাত্তরের সিলেট: অন্যরকম যুদ্ধ, আদৃতা প্রকাশনী, সিলেট ১৯৯৮

২. তাপসী চক্রবর্তী লিপি, বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, বিশ্বনাথ ডিগ্রী কলেজ

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন 

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১)

 

Similar Articles

Leave a Reply