You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১১)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১১)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস  এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

সাহসিকতা

মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছেন নারীরা। কেউবা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউবা পালন করেছেন সংগঠকের ভূমিকা। আবার অনেক নারী গ্রহণ করেছেন সেবাব্রত। মুক্তিযোদ্ধাদের সোর্স হিসেবেও কাজ করেছেন কেউ কেউ। পাকহানাদারদের নিধনে অনেক নারী গ্রহণ করেছেন সাহসী ভূমিকা। তাদের কৌশলে অনেক স্থানে প্রাণ হারিয়েছে পাক সেনারা। নারীদের সেইসব ভূমিকার কথা যদিও সেভাবে উঠে আসেনি। তারপরও যে সকল ঘটনা হারিয়ে যায়নি কালের আবর্তে, সেই ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে নারীদের অসম সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

আম্বিয়ার দায়ের কোপে ঢলে পড়ে পাকসেনা

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সীমান্তবর্তী গ্রাম টিলাবাড়ির মেয়ে আম্বিয়া খানম। গাজীপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত এ গ্রামে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই মুক্তিকামী মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পাকহানাদার বাহিনী। অসংখ্য মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। সীমান্ত গ্রাম দুধপাতিল টিলবাড়িতেও চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। নারীদের উপর চালায় পাশবিকতা। মুক্তিযুদ্ধারা পাক সেনাদের হটাতে নানামুখি তৎপরতা চালান। সোর্স হিসেবে নিযুক্ত করেন আম্বিয়া খানমকে। আম্বিয়া পাকসেনাদের গতিবিধি জানাতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এলাকায় অবস্থান করার কারনে দুই পাকসেনার দৃষ্টি পরে আম্বিয়ার ওপর। পাক সেনারা জৈব চাহিদা মেটাতে চায়। কৌশলে আম্বিয়া ফন্দি আটেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরামর্শ করে পাকসেনাদের তার এক আত্মীয় বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। দিনটি ছিলো ১৯৭১ সালের পহেলা মে। সকাল ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ঘটে এ ঘটনা। আম্বিয়ার বয়স তখন ষোল।

আম্বিয়া খানম জানান, ‘পাকসেনারা যখন টিলাবাড়িতে আসে তখনই মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ঘিরে ফেলে। আমি রামদা দিয়ে এক পাকসেনাকে আঘাত করি। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে আহত হয় অপরজন। অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধারা। পরবর্তীতে ঐ সৈন্যটিও প্রাণ হারায়। এই ঘটনার পর পাকসেনারা আর ওই এলাকায় প্রবেশ করেনি।

ওই অপারেশনের সাথে সম্পৃক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ পৃথিবীতে নেই। আর যারা বেঁচে আছেন তারা দুঃসহ জীবন বয়ে চলেছেন। এরা হলেন আব্দুর রহমান, আব্দুর রউফ, আরজু মিয়া, রজব আলী, সিরাজুল ইসলাম, ফিরোজ মিয়া, মহরম আলী চৌধুরী ও কুতুব আলী।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চারদশক অতিবাহিত হয়েছে। রণাঙ্গনের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ বা স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু আম্বিয়ার সেই বীরত্বগাথা আজো স্বীকৃতি পায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত কেউ খোঁজ-খবরও নেয়নি তাঁর।

তরুনীর সহাসিকতায় ধড়া পড়ে পাকসেনা

মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী বড়লেখা থানায় কৌশলী এক তরুণীর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে প্রাণ হারায় এক পাকসেনা। রাজাকারদের নিয়ে প্রায়শই এক পাকসেনা গ্রামে গ্রামে গিয়ে তরুনীদের ধরে আনলেও একদিন সে একাকী গ্রামে প্রবেশ করে। লালসা মেটানোর জন্যই সে গ্রামে আসে।

গ্রামে প্রবেশ করে কিছুক্ষন পায়চারি করার পর একটি বাড়িতে প্রবেশ করে। সশস্ত্র পাক সদস্যের উপস্থিতিতে বাড়ির সকলের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। অনেকেই জীবন বাঁচাতে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু বাড়ির যুবতী মেয়ে স্বপ্না (ছদ্মনাম) সবাইকে চমকে দিয়ে দেখা করে ঐ পাকসেনার সাথে। দীর্ঘক্ষন তার সাথে রসালো কথা বলে। ভাব জমায়। নানান কথায় ঐ সৈন্যকে বশীভূত করে সে। প্রেমের অভিনয় করে তার সাথে। সুন্দরী স্বপ্নার এমন আচরনে বিমোহিত হয়ে যায় পাক সেনা। এভাবে কেটে যায় ঘণ্টা দেড়েক সময়। সৈন্যটিকে পুনরায় আগামীকাল তাদের বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানায় সে। রাজী হয় পাকসেনা। বিদায় বেলায় পাক হানাদার বাহিনীর ঐ সদস্যকে এগিয়ে দেয়।

ঐদিন রাতেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করেন স্বপ্না। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে ঠিক করেন পরিকল্পনা। পরদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই স্বপ্নাদের বাড়িতে এসে হাজির হয় পাকসেনা। স্বপ্নাও সেজেগুজে তৈরী ছিল। তাকে অপরূপ সাজে দেখে পাকসেনা স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। গতদিনের মতো এদিনও স্বপ্না কথায় কথায় ভুলিয়ে রাখে পাকসেনাকে। পাকসেনা তার সাথে অন্তরঙ্গ মুহুর্ত কাটাতে চায়। চতুর স্বপ্না তাকে পরিকল্পনা অনুযায়ি গ্রাম ঘুরে দেখার প্রস্তাব দেয়। পাকসেনাটি তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যায়।

স্বপ্না পাকসেনাকে নিয়ে গ্রামের রাস্তায় বের হয়। এরপর দু’জনে কাছাকাছি হাটতে থাকে গ্রামের মেঠোপথে। বিকেল গড়িয়ে যেতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা না আসায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে তার। সতর্কতার সাথে মুক্তিযুদ্ধাদের জন্য সে অপেক্ষা করতে থাকে। তার এই দুরভিসন্ধি টেরই পায়নি পাকসেনা। সে নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। এই সময় খুবই সন্তর্পনে কুকিতল সাব-সেক্টর থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা চারপাশ থেকে স্বপ্নাসমেত পাকসেনাকে ঘিরে ফেলে। নিজের অস্ত্র বের করার আগেই সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের মুখে নতজানু হতে হয় তাকে। মুক্তিযোদ্ধারা ধৃত পাকিস্তানি সৈন্যটিকে নিয়ে ভারতীয় ভূ-খন্ডে অবস্থিত কুকিতল সাব-সেক্টর সদরে নিয়ে যান। ঐ তরুনীর সাহসীকতার কথা এখনও শোনা যায় লোক মুখে।

সাগলীর তথ্যে প্রাণ হারায় শেরখান

শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের কাছে শের খান ছিল মূর্তিমান আতংকের নাম। মানুষ খেকো পশুর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলনা সে। কমলগঞ্জ থানার কামারছড়া ইউনিয়নের দুটি বধ্যভূমি, শ্রীমঙ্গলের সবকটি বধ্যভূমির সেই ছিল ‘যমদূত’। এছাড়াও ধলাই বাঙ্কারের দায়িত্ব পালন করে এই হিংস্র জানোয়ার। যার উপর শের খানের দৃষ্টি পড়তো সে আর রেহাই পেতনা। সিন্দুরখান চা বাগানের বন্ধু খাড়িয়ার মেয়ে বিধবা সালগী খাড়িয়াকে একদিন শেরখান তুলে নিয়ে যায়। শের খান তাকে জোর করে বিয়েও করে। এরপর থেকে চলতে থাকে তার উপর বিভৎসতা। শেরখানের কতিথ স্ত্রী হলেও সাগলী মনে প্রাণে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। স্বপ্ন দেখতেন দেশ স্বাধীন হবে, তিনিও মুক্তি পাবেন এই ভয়ঙ্কর পশুর হাত থেকে। নিজ স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাগলী শেরখান যখন বাসায় থাকতো না তখন যোগাযোগ করতেন মুক্তিকামীদের সাথে। সাগলীর বদৌলতে বাগানের মুক্তিযোদ্ধা উদয় ভূইয়া ছদ্মবেশে এসে পাকসেনা ও শের খানের অবস্থা, অবস্থান ও গতিবিধি জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌছে দিতেন। শুধু তাই নয় সাগলীর কারণে অনেকে প্রাণে রক্ষা পেয়েছে দুঃসময়ে। পাকসেনাদের হাতে কেউ ধরা পড়লে শের খান সালগীকে জিজ্ঞেস করতো সে তাকে চেনে কি না। কৌশলী সাগলী অপরিচিত লোককেও নিকটাত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন। রাজঘাট চা বাগানের উত্তমকুমার তাঁতীর এখনো মনে আছে ‘সালগী বুড়ির’ সহযোগীতার কথা। এ কৌশলে তিনি শের খানের হাত থেকে বাঁচেন।

সাগলীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধরা শেরখানের প্রাণ সংহার করে। সীমান্ত থেকে সালগীর ঘর ৪শ গজের মধ্যে হওয়ায় শের খান আসার আগেই ছদ্ধবেশে মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে জড়ো হয়। সাগলীর কাছ থেকে শেরখানের অবস্থান জেনে নিয়ে ধলাই অঞ্চলে তাকে হত্যা করে। চারমাসের মাথায় শেরখানের যন্ত্রনা থেকে রেহাই পান সাগলী। তার মৃত্যুতে শোকের পরিবর্তে আনন্দে ভাসে সাগলী। বিজয়ের উন্মাদনায় মেতে উঠে তার প্রাণ।

আগের অংশ পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১০)

 

 

Similar Articles

Leave a Reply