You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১)

মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী (পর্ব:১)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মুটে-মজুর-কুলি, পেশাজীবি-শ্রমজীবী সবাই। মুক্তির আকাঙ্খায় মুছে গিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অবস্থানভেদ। মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের, ত্যাগের, সহ্যের, সাহসের এক অকৃত্রিম তুলনাহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন আমাদের নারীরা। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের নারীদের ভূমিকা নিয়ে  ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের নারী’ শিরোনামের ধারাবাহিক প্রবন্ধটি উইমেন ওয়ার্ডস এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন–

অপূর্ব শর্মা

পটভূমি

ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে শতাব্দির পর শতাব্দি নারীরা ছিলেন অবরোধবাসিনী। সেই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে নারীদের বের হয়ে আসার প্রচেষ্টা শুরু হয় উনিশ শতকে। বিংশ শতাব্দিতে এসে নারী সমাজের ছোট্ট একটি অংশ আধুনিক শিক্ষা লাভে সচেষ্ট হয়। তারা নিজেদেরকে সার্থকতার সাথে প্রমান করেন। তবে সেই সকল নারীরা সাহিত্য চর্চার প্রতিই অত্যাধিক আগ্রহী ছিলেন। যদিও প্রথম পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে। বাড়িতে গৃহশিক্ষক দ্বারা শিক্ষাগ্রহণে ব্রতী হয়েছিলেন তারা। উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয় বাঙালি নারীদের। সেই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগান বাঙালি রমনীরা। প্রথম ভারতীয় হিসেবে যে দু’জন নারী গ্রাজুয়েট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তারা দুজনই বাঙালি। ১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দে চন্দ্রমুখী বসু ও কাদম্বিনী গঙ্গোপধ্যায় এই কৃতীত্ব অর্জন করেন।

অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা যখন সর্বক্ষেত্রেই অনেক দূর এগিয়ে গেছেন তখন দু’চারজন মুসলিম বাঙালি নারী সাহিত্য, সমাজসেবা ও শিক্ষাবিস্তারে এগিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে অগ্রণী ৩ জন হলেন-কুমিল্লার জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা, সিরাজগঞ্জের খায়রুন্নেসা খাতুন এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। একই সময়ে তাদের মতো উত্তরপূর্বাঞ্চলে কোন মুসলিম নারীকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। তখনও পশ্চাৎপদতার কবল থেকে বের হতে পারেনি এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজ।

তবে, এই অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা ছিলেন প্রগতির পক্ষে। শিক্ষায়-দীক্ষায় তারা অগ্রসর হতে থাকেন। আর আন্দোলন সংগ্রামের সাথে এই অঞ্চলের নারীদের সম্পৃক্ত হওয়ার ভিত্তিমূল রচিত হয় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে। বিট্রিশ বিতারণের আন্দোলনে সিলেটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অংশগ্রহন করেন। সেই সময় সহিংস এবং অহিংস উভয় পন্থায়-ই নারীরা জড়িয়েছিলেন আন্দোলনে। তবে জাগরণের পথে উদ্বুদ্ধ হওয়া নারীদের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেন বিপ্লবী লীলা রায়। এক্ষেত্রে তাঁকে পথ প্রদর্শকও বলা যায়।

লীলা রায় ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন। দুই শতাব্দির মহেন্দ্রক্ষণে জন্ম নেওয়া এই নারী অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসেবে এম.এ পাশ করে তিনি ঝাপিয়ে পড়েন স্বদেশী আন্দোলনে। যোগ দেন গোপন বিপ্লবী দল শ্রীসংঘে। শুধু নিজেই সশস্ত্র বিপ্লববাদের সাথে যুক্ত হননি, অসংখ্য তরুণীকে তিনি উদ্দীপ্ত করেন জাগরণ মন্ত্রে। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন। ভারতবর্ষে বিনাবিচারে কোনো নারীকে আটকের ঘটনা এটাই ছিল প্রথম। ছয় বছর কারাভোগ করে ১৯৩৭ সালের ৮ অক্টোবর তিনি মুক্ত হন। তার মুক্তিতে কবিগুরু আশীর্বাণী পাঠান। রীবন্দ্রনাখ ঠাকুর লিখেন, ‘কল্যাণীয়াসু, কারাবাস থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে তুমি বেরিয়ে এসেছো শুনে আরামবোধ করলুম। মানুষের হিংস্র বর্বরতার অভিজ্ঞতা তুমি পেয়েছ-আশাকরি এর একটা মূল্য আছে, এতে তোমার কল্যাণ সাধনাকে আরও বল দেবে। কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে পাশব বলে মনুষ্যত্বকে চিরকালের মতো পিষ্ট করে দেবে কিন্তু মনুষ্যত্বের মহিমার জোরেই সেটা সত্য না হোক। পশু শক্তির উর্ধ্বে জয়ী হোক তোমার আত্মার শক্তি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশাবাদ বিফলে যায়নি। লীলা রায় যেন আরও শানিত হয়ে উঠলেন। নতুন করে শুরু হলো তাঁর কর্মতৎপরতা। পুনরায় গ্রেপ্তার হলেন। মুক্তি পেয়ে দুর্বার থেকে দুর্বার হতে লাগলেন।

লীলা রায়ের দেখিয়ে দেওয়া পথেই যেনো বিট্রিশ বিতারণের আন্দোলনে এগিয়ে এলেন সিলেটের নারীরা। প্রকাশ্যে প্রথমবারের মতো ১৯৩০ সালে লবন আইন ভাঙার আন্দোলনে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রায় সত্যগ্রহী দলে বিপুল সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ নারী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। নারীদের এই জাগরণকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে একই সালে গঠিত হয় ‘শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ’। এই সংঘের প্রাণ ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সরলাবালা দেব। নারীদের মধ্যে স্বদেশপ্রীতি জাগানোর লক্ষ্যে কাজ করে এই সংঘ। সিলেট জুড়ে এই সংঘের ২৮ টি শাখা ছিল। সেই সময় গান্ধীর মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে আসেন সুহাসিনী দাস, হেনা দাসসহ আরও অনেকে। সত্যিকার অর্থেই যেন সৃষ্টি হয় নারী জাগরণের। যার প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করা যায় ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে। এই আন্দোলনে সিলেটের নারীরা অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট অন্যান্যের সাথে গ্রেপ্তার হন সুহাসিনী দাস। সেই আন্দোলনের তীব্রতা উপলব্ধি করা যায় বিপ্লবী সুহাসিনী দাসের বক্তব্য থেকে। সুহাসিনী দাস লিখেছেন, ‘১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন আমার কাছে আজো স্মরণীয়। আন্দোলন পরিচালনার জন্য পূর্ব থেকে প্রস্তুতি চলে। প্রবীণ কংগ্রেস নেত্রী সরলাবালা দেবকে সঞ্চালক করে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ১১ আগস্ট থেকে আমাদের কর্মসূচি পুরোদমে শুরু হয়ে যায়। প্রতিদিনই মিছিল মিটিং ঘেরাও এবং পুলিশি নির্যাতন ছিল। কিন্তু কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ৩১ আগস্ট পূর্ব পরিকল্পনা মত আমরা আদালত ভবনের সামনে পিকেটিং করি। ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ কাঁপছে। জজ সাহেবের কামরার সামনে স্বেচ্ছাসেবকরা রয়েছে যাতে তিনি আদালতে উঠতে না পারেন। যথা সময়ে জজ সাব কামরার সামনে এলে মেয়েরা বাধা দিয়ে উঠে-তিনি একটি মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে যাবার চেষ্টা করলে অন্য একটি মেয়ে পায়ের সেন্ডেল ছুঁড়ে মারে। নিরাপত্তারক্ষীরা শুরু করে ধস্তাধস্তি-চারিদিকে হৈ-চৈ শুরু হলে দুই শ’ স্বেচ্ছাসেবক বুকে গুলি নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। সেই ফাঁকে স্নেহলতা দেব জজের চেয়ারে বসে পড়েন। অবাক কাণ্ড! পুলিশের ভয়ভীতি উপেক্ষা করেও তিনি অনড় থাকেন। একটা প্রথা নাকি ছিল-জজের চেয়ারে বসলে কাউকে টেনে নামানো যাবে না। স্নেহলতার কথা বলতে হয়-তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী উপেন্দ্র দেবের স্ত্রী ছিলেন। উপেন্দ্র দেব দু’বার জেলে ছিলেন; স্নেহলতা দেবও আইন অমান্য আন্দোলনের সময় স্বদেশী আন্দোলনে ছমাস জেল খাটেন। সত্যাগ্রহী ও পুলিশের মধ্যে কিছুটা বাদানুবাদ হলে পোষ্ট অফিস, টেলিফোন অফিসে হামলা করা হয়। দুপুর গড়িয়ে গেল স্নেহলতা তখনো বসে। কয়েকজন সত্যাগ্রহী একটি গাড়ি নিয়ে দূরে রেখে দেয়; বিকেলবেলা হটাৎ চেয়ার ছেড়ে গাড়িতে উঠে তিনি উধাও হয়ে যান। শুরু হয় শহরে ধড়-পাকড়। আত্মগোপন থাকার পরও স্নেহলতার গ্রেপ্তার হন এবং বিনা বিচারে এক বছর কারাভোগ করেন। আমার সাথে গ্রেপ্তার হলেন সুনীতিবালা দেব, প্রফুল্লকুমারী দত্ত, যামিনীবালা দাস, হিরণবালা দেবী, ঊষারাণী দাস, উমা চক্রবর্তী, লীলাবতী দত্ত, সুখদা পালচৌধুরী, শোভনা দেব, নরেশনন্দিনী দত্ত, চারুশীলা দেব। ৯ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন নেত্রী সরলাবালা দেব।’

একই সময়ে কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে আরও যুক্ত ছিলেন কুসুমকুমারী দাস, সুপ্রভা পুরকায়স্থ, সরোজবালা সেন, কনকলতা নাগ, সুরবালা চক্রবর্তী, স্নেহলতা দেব প্রমুখ।

১৯৪৩ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির মহিলা ফ্রন্ট ও ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ গড়ে উঠে। সিলেট অঞ্চলে এর প্রভাব ছিল বেশি। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তারা হলেন, ডা. কল্যাণী দাস, হেনা দাস, বিলঙ্গময়ী কর, মনি দত্ত, শশীপ্রভা দেব, মাতঙ্গিনী দাস, অঞ্জলী দাস, সুষমা পুরকায়স্থ, অর্পণা ধর, শান্তি ভট্টাচার্য, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, সুমতি নাগ, সুখদা পাল, ষোড়শী চক্রবতী প্রমুখ। সম্মেলনের মাধ্যমে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সভানেত্রী নির্বাচিত হন জোবেদা খাতুন চৌধুরী। আর মহিলা সমিতির কাণ্ডারি ছিলেন নলিনীবালা চৌধুরী। এই দুই সংগঠনের সদস্যরা আত্মরক্ষার কৌশল, দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা এবং নার্সিংয়ের ট্রেনিং গ্রহন করেছিলেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজ অধিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল। বিংশশতাব্দির সূচনালগ্নের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সনাতন ধর্মালম্বী নারীরা সম্পৃক্ত হলেও মুসলিম নারীরা এতে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়। আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে যুক্ত হন মুসলীম নারীরা। তবে, সেই নারীদের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতেগুনা। সেই সময় পর্দা প্রথার প্রভাব এতটাই প্রবল ছিলো যে, গাড়ি বা রিকশাযোগে কোথাও যেতে হলেও নারীদের বহনকারী পরিবহনের চতুর্দিক থাকতো কাপড় দিয়ে মোড়ানো। প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে যোগদান করার কোনো রেওয়াজই ছিলনা মুসলিম নারীদের। ঘরোয়া কোনো সভা সমাবেশে যোগদান করতে হলেও বোরকা পরে, চিকের আড়ালে থেকে তাদেরকে প্রত্যক্ষ করতে হতো অনুষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই গোড়ামির কবল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না ইসলাম ধর্মের অনুসারী নারীরা। অধীর আগ্রহ নিয়েই হয়তো অপেক্ষা করছিলেন তারা। মুসলিম নারীদের বুকে যখন কুসংস্কার পরিহারের আর্তনাদ, তখনই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে ধূমকেতুরূপে আর্বিভূত হন।

১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবির আগমন ঘটে সিলেটে। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সম্মেলনে যোগ দিতে এসে কবি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। চার দেয়ালের বৃত্তে বন্দি থাকা মুসলিম নারীরা এই সম্মেলন থেকেই পর্দার আড়ালমুক্ত হন। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন উদ্বোধনী সঙ্গীত শুরু করেন তখন হলভর্তি লোকজনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় নারী-পুরুষ আসনের মধ্যবর্তী স্থানে। চিকের প্রতিবন্ধকতা আর থাকলো না। জোবায়দা খাতুন চৌধুরী আকস্মিকভাবে নারী-পুরুষের মধ্যকার পর্দা খুলে ফেলেন। তিনি শুধু চিকের আড়ালমুক্ত হলেন না, নিজের বোরখাও পরিহার করলেন সভাস্থলে। এই দুঃসাহসিক অভিযানে জোবায়দা খাতুন চৌধুরীর সাথে ছিলেন আরেক মহিয়সী নারী-তিনি সিরাজুন্নেসা চৌধুরী।

সেদিনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে গবেষক গবেষক নৃপেন্দ্র লাল দাসের ভাষ্য,  ‘‘দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন এক বাধার বিন্ধ্যাচল অতিক্রম করে, সিলেটের অচলায়তনিক পর্দা ভেঙে, আব্দুর রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ও আব্দুর রহীম চৌধুরীর স্ত্রী জোবায়দা খাতুন চৌধুরী সভায় নজরুলের ভাষণ ও গান শুনতে যান। বেগম রহিমতো চিকের আড়ালে না বসে একেবারে হিন্দু নারীদের সারিতে গিয়ে বসেন। তার পিতা সরাফত আলী সভা শেষে সগর্বে বলেন, ‘প্রথম সারিতে এতক্ষণ বসে রয়েছে সে কার মেয়ে, আমারই থার্ড ডটার। আজকে সিলেটের ইতিহাসে এক নতুন চ্যাপ্টার দেখা দিল।’’

সত্যি এক নতুন বিপ্লব ছিল এটা। সিলেটের নারীসমাজে জাগরণ এনে দিল সেদিনের ঘটনা। ‘জাগো নারী বহ্নিশিখা’, বলে নজরুল ডাক দিলেন। প্রাচীন সিংহদ্বারের আগল ভেঙে গেল। যার ফলশ্রুতিতে ধারাবাহিকভাবে ঘুচে যেতে শুরু করে এই অঞ্চলের মুসলিম নারীদের বঞ্চনার ইতিহাস। নারীরাও অংশ নিতে শুরু করলেন আন্দোলন সংগ্রামে। মূল স্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত হতে লাগলো তাদের মেধা ও মননশীলতা।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত গণভোটে সিলেটের পাকিস্তানভূক্তির জন্য অগণিত মুসলীম নারী রাজপথে নামেন। পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় সিলেট। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন সুরমা উপত্যকার নারীরা। পূর্ববাংলার সাথে পাক সরকার বৈরীতা শুরু করলে, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে উঠেন তারা। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে ধর্ম বর্ণ নিবিশেষে নারী-পুরুষ দাঁড়ালেন এক কাতারে। আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। ৭১ এর ৭-ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন স্বাধীকার আন্দোলনের নতুন দিক নির্দেশনা দিল। ‘যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার’ আহ্বানে পুরুষের পাশাপাশি সিলেটের নারীরাও এগিয়ে এলেন। অগ্নিগর্ভ মার্চে মিছিল সভা সমাবেশ, চাঁদা আদায় সবকিছুতেই নারীর অংশগ্রহন স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে হানাদারদের নিধনযজ্ঞে হতবাক হয়ে পড়ে বাঙালিরা। পরিস্থিতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ মুক্তিকামী নারীকে ওপারে পাড়ি জমাতে বাধ্য করে। তবে, ভারতে আশ্রয় নিলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নারীরা ছিলেন সদা তৎপর। তারা শরনার্থী শিবিরে, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে সেবা সুশ্রুষা করেছেন অসুস্থ এবং আহতদের। অনেকে নার্সিংয়ের সাথেও যুক্ত হয়েছিলেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মু্ক্তিকামীদের উদ্ধুদ্ধ করেছেন নারীরা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও প্রচারণা চালিয়েছেন তারা।

দেশের অভ্যন্তরে থেকে অগনিত নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তাদের কেউবা নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র, আবার কেউবা ভাত রেধে খাইয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। দেশে অবস্থানরত অসংখ্য রমণীকে পাশবিকতার শিকার হতে হয়েছে দুঃসময়ে। সেইসাথে স্বাধীনতার বেদীমূলে অগণন নারী উৎসর্গ করেছেন প্রাণ।

দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে উন্মেষ ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। আমরা অর্জন করি একটি নতুন পতাকা।

তথ্যসূত্র

১. সৈয়দ আবুল মকসুদ, পথিকৃত নারীবাদী: খায়রন্নেসা খাতুন, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ১৯৯২

২. দীপংকর মোহান্ত, লীলা রায় ও বাংলার নারী জাগরণ, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ১৯৯৯

৩. সুহাসিনী দাস সংবর্ধনা গ্রন্থ, সম্পাদনা পরিষদ, উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাস, সিলেট ১৯৯৯

৪. তাজুল মোহামম্মদ, জোবায়দা খাতুন চৌধুরী: সংগ্রামী নারীর জীবনালেখ্য, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০০৮

৫. নৃপেন্দ্র লাল দাশ, সিলেটে নজরুল, উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০০৫

 

 

Similar Articles

Leave a Reply