You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ভীনদেশে ঈদ

ভীনদেশে ঈদ

রোমেনা লেইস

আমরা তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এসেছি। ২০১০ সালের কোরবানীর ঈদ। আমার বরের নতুন চাকরি। বাসা ভাড়া, বিল সব দেয়ার পর খুব বেশী বাড়তি টাকা থাকে না। কোরবানীর টাকা দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রোসারী থেকে গরু খাসী মোরগের পা সব আনা হয়েছে। এমন সময় মনে পড়লো আরে ঈদে বাচ্চারা নতুন কাপড় পরবে না? বাসার পাশেই আমেরিকান প্যালেস। ওখান থেকে মেয়ের দুইটা ড্রেস কিনলাম, আর দুই ছেলের জন্য দুইটা  শার্ট। চল্লিশ ডলার খরচ হল। মনটা অস্থির। দেশে থাকতে দুইজন সহকারী ছিলো। তারা সব রেডি করে রাখত। এখন আমি একা দুহাতে কী সব করতে পারব?

ঈদের আগের রাতে বুটের হালুয়া,পুডিং,দুধসেমাই রান্না করলাম। বিকালে মেরিনেট করা মোরগের রানগুলো রোস্ট করলাম।গরুর ঝাল মাংস আর খাসীর রেজালা রান্না শেষ করতে করতে রাত প্রায় সাড়ে বারটা। ভোরে উঠে সবাই গোসল করে পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে নামাজ পড়তে গেল। আমি ততক্ষণে পোলাও রান্না করে কাবাব গুলো ভাজলাম। তারপর গোসল করে আমরাও নতুন কাপড় পরলাম। নতুন বেডকভার দিয়ে বিছানাগুলো ঢেকে দিলাম। প্রতিটা মুহূর্ত দেশের ঈদ কে, মা, ভাই-বোন, শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ,বন্ধুবান্ধবদের মিস করছি। ঐ সময় ফোন বেজে উঠলো। বরকতউল্লাহ মুনশী আমার পাবলিক এডের বন্ধু ঈদের শুভেচ্ছা জানালো। আটলান্টা থেকে পাবলো ফোন করলো। খুব ভাল লাগল। আত্মীয় পরিজনহীন পরিবেশে দেশ থেকে দূরে এই অচেনা শহরের ব্যস্ত জীবন। দূর শহর থেকে ভেসে আসা বন্ধুর কথা বড় আপন, বড় কাছের। বিয়ে হয়ে মেয়ে বন্ধুরা আর কর্মসংস্থানের জন্য ছেলে বন্ধুরা কে কোথায় চলে গেছে।

যখন কিশোরী ছিলাম, সুনামগঞ্জের সে সময়টা ঈদ আনন্দে ভরপুর ছিলো। শিউলি, ঝুমুর,রোকসানা ঈদের জামাতের পরপরই আসত আমাদের বাসায়। নাশতা খেয়ে চলে যেতাম তামান্নাদের বাসায়।সেখান থেকে শেফাদের বাসায়। ঈদের জামা, জুতা, চুড়ি, দুল, মেহেদি। পায়ে হেঁটে হাসি গল্প কলকল করতে করতে সারাদের বাসায়।তারপর ঘুরে এদিকে রিবনদের বাসায়। রিবনদের বাসা থেকে চমনদের কলেজ হোস্টেলের বাসায়। আব্বার নির্দেশ দেয়া ছিল দুপুরবেলা ফিরে আমাদের বাসায় লাঞ্চ করবে। আমরা সেই অনুযায়ী ফিরে এসে লাঞ্চ করতাম। আহা কোথায় গেলো সেই কিশোরবেলার ঈদ! দেশে ফোন করে ঈদের শুভেচ্ছা জানালাম। যদিও দেশের ঈদ পরের দিন।আম্মার সাথে, শ্বাশুড়ির সাথে কথা বললাম। ঈদের জামাত শেষে ফিরে আসলো ওরা। নামাযের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। খোলা ময়দানে নয়, ঈদের জামাত হলো চারতলা মসজিদের ভেতর। সকল ফ্লোরে এক ইমামের ইমামতিতে জামাত হলো। দ্বিতীয় তলায় মহিলারা একপাশে জামাতে সামিল হন। বাসায় ফিরে ওরা বলল সামনের বছর আমরাও যেতে পারবো। ছোটবেলা থেকে দেখে অভ্যস্ত, তাই মনে হলো না যে আমি যাব ঈদের জামাতে। তবে অনেকেই যায় আজকাল।

আমার ছেলেদের ফ্রেন্ড আর ওদের বাবা সহ ওরা সবাই বাসায় আসলো। সাজানো ডাইনিং টেবিল থেকে পছন্দের খাবার নিয়ে খেলো সবাই। ফেসবুকে তখন নতুন ইউজার আমরা। রাতে ল্যাপটপে আমার ছেলের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে নিজেই অবাক । সে লিখেছে My mom is the best cook in this world. আহা জীবন সার্থক।

এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উল আযহা সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর)। নিউইয়র্কের দুইমাসের সামার ভ্যাকেশন শেষ হয়ে স্কুল কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে। মেয়র ডি ব্লাসিও মুসলিম হলিডে হিসেবে দুই ঈদে স্কুল ছুটি ঘোষণা করায় এবার ঈদ উল আযহা উপলক্ষে সোমবারে ছুটি। অর্থাৎ লং উইক এন্ড পাওয়া গেল। তবে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজে কোন ছুটি ঘোষণা করেনি । আমার ছেলেরা এবার কলেজে চলে যাবে ঈদের সকালে। এবছরই প্রথম মুসলিম হলি ডে হিসাবে দুই ঈদের ছুটি ঘোষনা করেছেন মেয়র বিল ডি ব্লাসিও। এবার ঈদ তাই হবে ভিন্ন। সেজন্য মুসলিম কম্যুনিটির পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ। আশা রাখি অদূর ভবিষ্যতে ঈদের দিনটিতে পাবলিক হলিডে উপভোগ করব ক্রীসমাসের মত।

 

Similar Articles

Leave a Reply