You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ভালোবাসা কেবলই ‘সব ভালো’-র উদযাপনের মুখোশে দুর্বলতাকে অস্বীকার

ভালোবাসা কেবলই ‘সব ভালো’-র উদযাপনের মুখোশে দুর্বলতাকে অস্বীকার

শবনম সুরিতা ডানা
আমাদের জীবনে সেরকমভাবে দেখতে গেলে ছন্দপতন একটা অস্বাভাবিকতা। যা চলছে, যেমনভাবে চলছে, তা যতই অস্বস্তির, নোংরা বা অন্যায় হোক না কেন, তালে তাল মিলিয়ে চলে যেতে পারলেই, সব ঠিক আছে। মোটামুটি ভদ্রস্থ পড়াশোনা, একটা চাকরি, একটা সংসার, বছর ঘুরলে পুরী-দার্জিলিং-সব মিলিয়ে এই বেশ ভালো আছি। ‘ভালো লাগছে না’ বা ‘এটা অনুচিত’ বলে এই নিয়মে ফাটল ধরানো সমাজের চোখে শুধু নয়, আশেপাশের অনেক মানুষদের কাছেই আলোচ্য বিষয়।
এই যেমন আমি কেন টুয়েলভে সায়েন্স পড়িনি, কেন আর্টস হলেও অংক পড়তে হবে, কেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ে নৃতাত্ত্বিক বিষয়ে আগ্রহী হব, কেনই বা চাকরি না করে আরেকটা মাস্টার্স করব- আমার সকল পছন্দ-অপছন্দ, সিদ্ধান্ত-সিদ্ধান্তহীনতায় দেখতে পাই আমার চেয়ে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব বেশি। যদিও যুক্তি দিয়ে হারাতে পারেনি, তাও আজো অনেকেই প্রশ্ন করেন আমায় কী হবে পিএইচডি করে, কেন আমি পোস্টকার্ডের মত দেশে-বিদেশে থাকা ঝানু পাত্রের সুসজ্জিত গৃহিণী না হয়ে গাধার খাটুনি খেটে নিজের দেশ থেকে ৭০০০ কিলোমিটার দূরে একটা ঠাণ্ডা ঘরে উষ্ণতার স্বপ্ন দেখি।

ঘুম ভাঙলে যে দেওয়ালে চোখ পড়ে, তার গায়ে লেগে থাকা মাকড়সার জাল আমার। পাত্রের তলানির চাল আমার। না-কাচা জামাকাপড়ের পাহাড় আমার। রিসার্চের জন্য মাসোহারা আমার। মাস গেলে জল-গড়ানো মুসুর ডাল আমার। শৌখিন দোকান থেকে কেনা জামা আমার। অযত্নে বেড়ে ওঠা গোড়ালির কাছের লোম, ক্ষুর লেগে কেটে যাওয়ার লাল- সব আমার, আমার একার। কীভাবে জানিনা, কিন্ত আমি আমার সমস্তটাকে বড্ড ভালোবাসি। ভালোবাসি কাছের মানুষকে ঠেস দিয়ে কথা বলতে না পারার অপারগতা, ভালোবাসি দিনশেষে হেরে যাওয়ার ঐকান্তিক স্বীকারোক্তি। কিন্ত যা চূড়ান্ত অপছন্দ করি, তা হচ্ছে আমার নিজেকে ভালোবাসতে পারার প্রক্রিয়ায় আঘাত। আমায় হয়ত অনেকেই ভালোবাসেন, কেউ কম কেউ বেশি। আর ভালোবাসা মানেই অনেকে বুঝতে শেখেন বিপরীতের মানুষটির ভালো-কেই ভালোবাসতে শেখা। অথচ নিক্তির মাপে মানুষের তো আজীবনই ভালোর পাল্লায় ফাঁকি! তাহলে কি আমাদের ভালোবাসা কেবলই ‘সব ভালো’-র উদযাপনের মুখোশে দুর্বলতাকে অস্বীকার করার প্রয়াস?

জাতি হিসেবে আমাদের ভালোবাসার সংস্কৃতি বড্ড নড়বড়ে। কড়া করে শিখিয়ে দেয় কী কী নিষিদ্ধ, অথচ কোনটা নয় তা খোলসা করে বলেনা। আমাদের ভালোবাসার সংজ্ঞা বড় বেশি নালিশপন্থী, তাসের দেশ-মার্কা অনুশাসন মেনে চলে। জাতি হিসেবে আমাদের ভালোবাসা ‘নিয়ম মতে’ চলতে শেখায়। সেখানে হরতনী হতে গেলে ছন্দপতন। এতদিন ভাবতাম, ভালোবাসা অপরদিকের মানুষের খারাপগুলির প্রতি অন্ধ করে দেয়। কিন্ত আজ হঠাত মনে হচ্ছে তা মিথ্যে। যে ভালোবাসাকে আমরা চিনি তা থামিয়ে দেয়, রাগিয়ে দেয়, জুড়ে দেয় না। তাই হয়ত আজকাল গলার স্বরের চেয়ে কীবোর্ডের মুখোশ বেশি ভরসার।

আসলে, ভালোবাসা নিছক ভালোর জয়গান গায় না, গাইতে পারেনা। সে শক্তি যোগায় সমস্ত ছন্দপতনকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্বীকার করতে। সাহসী করে উল্টোদিকের মানুষটাকে বলতে,

‘তবুও ভালোবাসি’

আমরা যারা ভালোবাসার কাঙাল, সকল নিয়ে বসে থাকি নিশ্চিত সর্বনাশ জেনেও। তবুও যে চোখগুলির দিকে ঠায় তাকালে পাতা অনিশ্চল থাকতে পারেনা, তারা একবারও ফিরে তাকায় না। পিঠে হাত রেখে বলেনা,

‘তবুও ভালোবাসি’

শুধু সকালে দাঁত মাজতে গিয়ে যার সাথে দেখা হয় রোজ, সেই আমার মাঝি, জোয়ার, মাদার মেরী। আমার আমিটুকুই।

ল্যাপটপে বাজাই ‘Let It Be’

আমার ঘরের দেওয়ালের মাকড়সাও তালে তাল মেলায়।

Similar Articles

Leave a Reply