You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ভালোবাসায় বিজ্ঞান কিংবা রস-রসায়ন

ভালোবাসায় বিজ্ঞান কিংবা রস-রসায়ন

পৃথা শারদী

‌‘ওর সামনে গেলে আমার বুকের ধরফরানি বাড়ে, হাত ঘামে, আঙ্গুলগুলো তিড়তিড়িয়ে কাঁপে, অকারণে হাসি পায়, মাঝে মাঝে কান্নাও পায় বৈকী !’
‌‘বাহ ! আর কিছু হয় না ?’
লাজুক স্বরে মেয়েটি বলল, ‘লজ্জা লাগে মাঝেমাঝে আর সবটা মিলিয়ে ভীষণ ভালো লাগে, আমার মনে হয় আমার সবকিছু ঠিক আছে ।’
এপাশ থেকে নির্লিপ্ত স্বরে বলা হলো, ‘তোমার মস্তিষ্কের ডোপামিন বেড়েছে, এটা আমারও হয় যখন আমি চকোলেট খাই তখন কিংবা একটা ভালো মুভি… তাতেও আমার ভীষণ ভালো লাগে, ডোমাপিন আমার রক্তে তখন বল্গা হরিণ হয়ে ছুটে বেড়ায় । এই যে তোমার মাথা, তার ঠিক এখানটায় হাইপোথ্যালামাস নামের জায়গাটা.. ‘
মেয়ে ঘাড় কাত করে চোখ বড় করে বলল, ‘এসব ডাক্তারি কথা ছাড়েন, আমি প্রেমে পড়েছি, এসব প্রেমে পড়ার লক্ষণ, আমি ওকে ভালোবাসি ।।’
এপাশ থেকে তাও যন্ত্রমানবীর মতো করে বললাম, ‘শোন, ডোপামিন বেড়েছে, টেস্টোস্টেরণও বেড়েছে বোধহয় আর সেরিটো কিছুদিন পর… মানে আর দু’তিন বছর যাক, প্রাণরসের বোধ আসবে, ডোপামিন কমে যাবে, টেস্টোস্টেরণ যাবে নিজের ঘরে, এমফিটামিন নিজের জায়গায় ফিরে আসবে আর তুমি বুঝবে সবটাই মোহ।’
মেয়ে রেগে আমাকে বলে, ‘আপনি পাগল’
আমি হাসি ।।
প্রেমে পড়া, ভালবাসাবাসির সংজ্ঞা কি আমার ঠিক জানা নেই তবে জনমত নির্বিশেষে, কারো জন্য যদি হয় মনের ভেতর উথাল পাথাল, একটু দেখা, একটু ছোয়া, একটুখানি পাশে বসে থাকা, কারো ওপর নির্ভর করা, কাউকে চোখ বুজে বিশ্বাস করা এসবই ভালোবাসা।
ভালবেসে ব্যর্থ হলে হৃদয়ে করে চিনচিন ব্যথা! কি অবাক কাণ্ডখানা! অনৈচ্ছিক হৃদপেশীর যে হৃদয় শুধু রক্ত বিশুদ্ধ করা ছাড়া আর কিছুই করেনা সে অনৈচ্ছিক হৃদ পেশীও কারো নাম শুনলে ধড়াস করে খুশি হয়! ভালোবাসার মানুষের ছোঁয়ায় সে হৃদয়ে বাজে ‘সুখের মতো ব্যথা।’
নারী পুরুষের ভলোবাসা, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, পতি পত্নীর ভালোবাসা, সমকামীর ভালোবাসা, অসমবয়সীর উথাল পাথাল প্রেম, সমবয়সীর মাপা মাপা প্রেম । ভালবাসার কি শেষ আছে কোথাও!
মা প্রেমে পড়েন অদেখা সন্তানের, প্রেমিক প্রেমিকা প্রেমে পড়েন হয়তো প্রথম দেখায় কিংবা হয়তো হাজার বার দেখা হবার পর বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে কিংবা বিয়ের বিশ বছর পর পতি পত্নী নতুনভাবে একে অন্যের প্রেমে পড়েন, আবারো ভালোবাসতে শুরু করেন নতুন করে ।
আহা !
চোখের সেই মায়া লাগা ঘোর, সেই নেশার মতো কেটে যাওয়া সময়, ভালবাসার নেশা কাটে কি আদৌ!
প্রেমের পরিণতি বিয়ে হলে দু’চার বছর পর মার মার কাট কাট ! এ যেন বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী! যদি প্রেমে পরিণতি হয় ছাড়াছাড়ি, সবার সামনে হোমরা চোমরা মুখ করে আর হৃদয়ের অনেক নিচে এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আমরা ভাবি, ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে আর তোমারে করেছে শয়তান কিংবা শয়তানী !’
প্রেম ভাঙ্গলে বাসমতীর বিরিয়ানী লাগে পান্তা ভাতের মত ঠান্ডা ভ্যাজভ্যাজা! মনের মানুষ যদি মনের সনে থাকে তো চারপাশে ওড়ে দখিন হাওয়া, এই পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষের মাঝে একজনের জন্য আরেকজনের কি টান! প্রেমিকের চোখে প্রেমিকা, জোলি কি সুচিত্রা! সব ফেল!
আর প্রেমিকার চোখে প্রেমিক! সালমান শাহরুখ কি ব্রাড পিট! সব উড়ে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়!

এতো মুগ্ধতা! কিভাবে আসে!
আমরা বলি, ও তো আমার সখা কিংবা সখীর চোখের চাহনি! আমাদের মনের খুনসুটির মিল।

বিজ্ঞান তা বলে না, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে ভালোবাসা নামক এই যাদু প্রাণ পায় প্রাণরসে কিংবা হরমোনের ওঠানামায়।
ভালবাসার সবটাই আসে নানা প্রাণরসের ছোটাছুটিতে।
কাউকে পছন্দ হলে টেস্টোস্টেরণ নামের প্রাণরসে প্রাণ আসে স্রোতের মতন । সংগীর প্রতি আকর্ষণে টেস্টোস্টেরণ বাড়ে হু হু করে। যদি প্রেম হয়ে যায় সেই পছন্দের মানুষের সাথে তবে আসে ডোপামিন নামের প্রাণরস । ডোপামিনকে বলা হয় ‘সুখদায়ক হরমোন’। সাধারণত প্রেমের বছর খানিক পরে এই প্রাণরসের ঘাটতি শুরু হয় , ভালোলাগা কমতে থাকে ।
ডোপামিন নামের এই প্রাণরসকে আরো এক কাঠি সরেস করতে যোগ হয় অক্সিটোসিন নামক প্রাণরস। অকারণে মনে শিহরণ, হাত ছুঁয়ে বসে থাকা, চোখে চোখে হাজার কথা বলায় প্রাণ এনে দেয় অক্সিটোসিন নামক এই প্রাণরস। এ প্রাণরসের স্থায়ীত্বও বেশিদিন হয়, বড়জোর এক কি দু’বছর!
ভালোবাসা ছাড়া যেমন কেউ বাঁচে না তেমনি ভালোবাসার অভাবে কেউ মরেও না তবে যে বাঁচা তখন আমরা বাঁচি বারবার তখন ভাবি, ‘এ চেয়ে মৃত্যুও কি শ্রেয় নয়’ কেউ কেউ ভালোবাসায় ব্যার্থ হয়ে নিজের আত্মহুতি দেন, এর পেছনেও আছে আরেক প্রাণরস, নাম তার এমফিটামিন। এই প্রাণরসের মেয়াদ প্রায় ৩ বছর নয় মাস ২৬ দিন । একে অন্যের প্রতি দূরত্ব বাড়াতে এ প্রাণরসের জুড়ি মেলা ভার, সম্পর্কে ফাটলও ধরায় এই প্রাণরস। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ প্রেম কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে এই চার পাঁচ বছরের মাথায়।
এই প্রাণরসের খেলার মাঝে আছে আরো খেলা ।
নারী সাধারণত আকর্ষিত হন পুরুষের ব্যাক্তিত্বে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বলশালী বুদ্ধিমান লম্বা চওড়া চেহারার পুরুষের প্রতি নারীকুল বেজায় আকর্ষিত হন। পুরুষ আকর্ষিত হন নারীর রূপে। পুরুষের সঙ্গিনী নির্বাচনে হিসেব খুব সোজা, ‘আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী।’
সঙ্গির প্রতি আকর্ষণে তার গায়ের ঘ্রাণ, ঠোঁটের পুরুত্ব, চোখের চাহনি প্রেমে পড়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রেমের প্রথম ধাপে চুম্বন, হালকা আদরও ভালোবাসা বাড়াতে, প্রেম বাড়াতে সহায়তা করে।
আর এসব কান্ডকারখানার পেছনেও আছে সেই অক্সিটোসিন প্রাণরস।
কি বুঝলেন মশাই!
সব হৃদয়ের কারবার চলে যাচ্ছে মস্তিষ্কে উৎপন্ন প্রাণরসে, ব্যাপারখানা জটিল কুটিল হলেও ইহাই সত্য ও বাস্তব।
আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।
বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিনে প্রাণরসেরা ছোটে বেশি, টগবগিয়ে মাথার ভেতর ভালবাসার ফুল ফোটেও হয়তো বেশি।
এক গল্প লিখে লেখাটার সমাপ্তি টানব।
নানা প্রাণীও মানুষের মতো ভালোবাসার ন্যাওটা।
তিমি মাছেরা জলের নিচে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে কম্পাংকের সাহায্যে। এক দুঃখী তিমি ছিল হাজার তিমি মাছের মাঝে, বেচারা তিমির কম্পাঙ্কের সীমা ছিল আলাদা। তার চারপাশে হাজার তিমি রাগ ভালোবাসা বিলিয়ে বেড়াত বিশাল সাগর জুড়ে আর সেই একলা তিমি ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াত। বিশাল নীল জলরাশির মাঝে আলাদা কম্পাঙ্কে গান গাওয়া এক তিমি। কেউ তাকে বোঝে না, সে কাউকে বোঝেনা, দিন কেটে যায়, ভালবাসাহীন জীবন কেটে জীবন শেষ হয়ে যায়। সেই বিশাল তিমিটা শেষমেষ শোকে আত্নহত্যা করেছিল।
মনের সাথে মনের মিল না হলে প্রাণরসে প্রাণ আসেনা, মায়া না লাগলে প্রাণরসেরা কাজ করেনা, প্রাণের কথা বোঝাবার জন্য প্রাণরসের উপস্থিতি খুব জরুরী। জীবনকে জীবনের মতো করে কাটাবার জন্য ভালোবাসার জুরি নেই।
কত ভালোবাসা হেলায় মরে, কত ভালোবাসা হয়েও হয়না! আবার কতো ভালোবাসা ছক্কা পিটিয়ে দেদারসে দৌড়ে চলছে সব ছাড়িয়ে!
আহারে !
গুণীজনেরা বলেন ,শুধু ভালবাসায় প্রাণরসেরা বাঁচে না, তারা বাঁচে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর সম্মানে, একে অন্যের বোঝাপড়ায়, সব মিলিয়ে যদি দশে আট পাওয়া যায় তো কথাই নেই!

প্রাণরসের হাজার খেলা তাই সই হোক আমাদের জন্য। অনেক মানুষের মাঝে যেন আমরা কেউ সেই তিমি মাছের মতো একা না হয়ে যাই। যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন যেন ডোপামিন বয়ে যায় আমাদের শিরায় শিরায়, বৈজ্ঞানিক কিংবা মনের রোগ দিয়ে যুক্তি অযুক্তিতে মুক্তি হয়ে ভালোবাসা আসুক সবার জীবনে।
জীবনের প্রতিটা ক্ষণ হোক ভালোবাসাময়।
প্রাণরসের উপস্থিতিতে প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ ফেলে যেন রবিবাবুর গান অনুচ্চারিত স্বরে গেয়ে যেতে পারি সারাজীবন-

‘ভালোবাসি, ভালোবাসি
এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি॥
আকাশে কার বুকের মাঝে ব্যথা বাজে,
দিগন্তে কার কালো আঁখি আঁখির জলে যায় ভাসি॥
সেই সুরে সাগরকূলে বাঁধন খুলে
অতল রোদন উঠে দুলে।
সেই সুরে বাজে মনে অকারণে
ভুলে-যাওয়া গানের বাণী, ভোলা দিনের কাঁদন-হাসি॥’

Similar Articles

Leave a Reply