You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান ( পর্ব: বারো )

ব্যবধান ( পর্ব: বারো )

অনন্যা হক

নিমা ঢুকেই বললো, কি ব্যাপার, ঘরের পরিবেশ এমন থমথমে হয়ে আছে কেন? এ জন্যেই বলেছিলাম, দেখা করার দরকার নেই। জীবনের সব ইচ্ছে পূরণ করতে নেই।

এই নাও তোমরা চা খাও, ভুলে যাও তো পেছনের সব। এখন বন্ধু হয়ে যাও।

শিপা একটু চাপা স্বরে বলে উঠলো, না।

নিমা বলে, কেন?

এটা তুই বুঝতে পারবি না। থাক না এসব কথা।

নিমা এসে পরিবেশ টা হালকা করে দিল। তিন জন মিলে চা খেলো।

নিমা বলে, তোমরা কথা বল, আমার রান্না চুলায়, আমি যাই ওদিকে। তবে একটা কথা বলি বন্ধুর অধিকারে, নতুন করে কোন কষ্ট টেনে এনো না জীবনে।

চলে গেল চা এর ট্রে হাতে নিয়ে।

অরুণ বলে, এত সিরিয়াস হচ্ছে কেন এরা সবাই মিলে। এখন কি ভুল করবো বল? তোমাকে একটু দেখতে চাওয়ার অধিকারটাও হারালাম আমি? তুমি কি আমার জীবনে একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে গেলে শিপা?

তাই তো হয়, এসবের কোন যুক্তি, কোন ব্যাখ্যা নেই।আজ কেউ জানছে না তাই, কিন্তু ভাবো তো, এক বার সাজিদ জানতে পারলে আমার বাকী জীবনটা কি হবে? আমি বলতে পারবো তাকে মাথা উঁচু করে যে, আমি আমার প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে দেখা করেছি, কিছু সময় কাটিয়েছি এক ঘরে?

আমার সামনে প্রাক্তন শব্দটা উচ্চারণ কোরো না, শুনতে ভাল লাগছে না।

এটাই বাস্তবতা অরুণ।

না, আমি তোমার কাছে শুধু প্রাক্তন নই, আমি এখনও বর্তমান তোমার ভেতরে।

এত টা নিশ্চিত কিভাবে হচ্ছো অরুণ?

শুধু তোমাকে দেখে, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে। সাত বছরে কম কিছু দাওনি তুমি আমাকে, আমিও গচ্ছিত রেখেছি হাজারটা স্মৃতি, চাওয়া পাওয়ার হিসাব। এগুলোর অস্তিত্ব  একেবারে বিলীন হয়ে গেল বলছো? আমার দিকে তাকিয়ে বল তো?

আমি এসবের উত্তর দিতে পারবো না। এবার তোমার বউ এর কথা বল, শুনতে চাই।

শিপার সত্যি জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিল সেই মেয়েটা। সত্যি কি শুধু শিপার কারণে মেনে নিতে পারেনি অরুণ তাকে, নাকি তাদের নিজেদের কোন সমস্যা ছিল? একটু হয়তো বাড়িয়ে বলছে।

এত দূরে চলে গিয়েও, শিপার বাস এতই গভীরে ছিল তার ভেতরে? কেন, কি ছিল শিপার, আর কি ছিল না সেই মেয়ে টার যে এমন হলো? নাকি শুধু স্মৃতির এত জোর? অথবা এটাই সত্যিকারের ভালবাসা, যা কিনা তার জীবনে একবারই প্রাপ্য ছিল।

তাই বোধহয় সাজিদের কাছে সেই প্রাপ্যটা বাকীর খাতায় চলে গেল। নাকি অরুণ যা চেয়েছিল, তাই শিপার মধ্যে ছিল, আর সাজিদ যেটা চায়, সেটা কার ভেতরে আছে সাজিদ সেটা জানে না, বা জানতে চায় না।

অরুণ বলে, আমিও এসব বলতে আসিনি। তুমি কেন বললে তখন, আমার বন্ধু হয়ে থাকতে চাও না? চল বাকী জীবনটা না হয় বন্ধু হয়েই থাকি আমরা!

না, আমি এভাবে ভাবি না অরুণ। একটা সম্পর্ক আর একটা সম্পর্কে রুপান্তর করে ফেলা যায় না, সম্পর্ক টার মাধুর্য্য হারিয়ে যায়। এগুলো সব কথার কথা, তোমার জায়গা আমার কাছে যেমন ছিল, তেমনই থাক। জীবন টা আমার কাছে একটা খেলা না। আমার মনটাও একটা খোলা দরজা নয় যে, যখন তখন যেমন তেমন করে হাওয়া ঢুকবে আর বের হবে।

অরুণ, এই হাওয়া মাতাল হয়, মৃদু হয়, এলোমেলো হয়, দমকা হয়, তখন তার রাস টানতে জানতে হয়। এই রাস টানতে অনেক রুপ পাল্টাতে হয়, আমি এগুলো পারি না। আমি আবার তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বো। এক মনে যেন অনেক টা আত্মস্থ হয়ে কথা গুলো বলে যায় শিপা।

অরুণ মন দিয়ে শুনে যাচ্ছিলো তার মুখেরদিকে তাকিয়ে, ঠিক আগের মত করে, ঠিক যেন তার সেই শিপা। সে ভাবে, শিপা কে সে প্রাক্তন ভাবতে পারবে না, এই শব্দটা যেন তাদের জন্য না।

শিপার কথা গুলো না সূচক হলেও, অরুণ নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে শিপার ভেতরে। ভেতরের সুপ্ত অনুভব গুলো জেগে উঠছে, ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

হঠাৎ বলে ফেলে, একটু কাছে এসে বস না শিপা!

কি বলছো এসব?

শিপা জানে, অরুণের অনেক সাহস, মাঝে মাঝে লাগাম হারিয়ে ফেলতো সে। এখনও তেমনি আছে নাকি?

এ কারণে অরুণের প্রতি তার আসক্তিটা আরো বেশি কাজ করতো। এই একটা কথাতেই শিপা একটু কেঁপে ওঠে। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল অরুণের স্পর্শের ছোঁয়া।

একটা সুপ্ত তৃষ্ণা আছে ভেতরে লুকানো, যেটা মাঝে মাঝে একাকী তাকে কাঁপিয়ে যায়, শিহরিত করে। একটু যেন জেগে গিয়ে দুলে ওঠে শিপা।

নিজেকে সংযত করে শিপা। শিপা জীবনে অনেক বার বুঝেছে, ভালবাসা বিহীন স্পর্শ আর ভালবাসা এবং প্রেমের প্রবল আসক্তির স্পর্শের ভেতরে কত ব্যবধান!

আর নতুন করে এই ব্যবধান টা বুঝতে চায় না।

এই শুকনো চরে সবুজ গাছ আবার হয়তো গজাবে, কিন্তু দমকা ঝড়ে সেই গাছ কিভাবে ভাঙবে, সেটাও তো তাকেই ভাবতে হবে।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ

ব্যবধান ( পর্ব: এগারো )

 

 

 

 

 

 

 

Similar Articles

Leave a Reply