You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান ( পর্ব: পনেরো )

ব্যবধান ( পর্ব: পনেরো )

অনন্যা হক

নিজের কষ্ট কে ছাপিয়ে অরুণের জন্য মায়া হয় শিপার।তার প্রতি আসক্তি দেখতে ভাল লাগলেও, অরুণ কে এমন অসুখী দেখতে ভাল লাগছে না শিপার।বরং অরুণ ভাল থাকলেই ভাল হতো। তার জন্যই তো এসব হলো।

চোখ টা একটু ঝাপসা হয়ে আসে, এতদিনের চেপে রাখা কষ্ট যেন

বাষ্প হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে উঠে দাঁড়ায় শিপা। বলে, তুমি একটু বস, আমি ভেতর থেকে আসছি।

শিপা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।অরুণ তাকিয়ে দেখে পেছন থেকে।

ভাবে, এই নারীটার আজ তার ঘরনী হওয়ার কথা ছিল।থাকার কথা ছিল জীবনের প্রতিটা ধাপে তারই পাশে পাশে।এখনও তেমনি এর শরীরের বাঁকে বাঁকে যেন সেই নেশা অনুভব করে সে।অরুণ খুটিয়ে দেখেছে এটুকু সময়ের মধ্যে, তার চেনা সব কিছু।

তেমন করেই শাড়ি পরেছে, তার প্রিয় রংয়ের শাড়ি।কোমরের

ভাজে আলতো করে পড়ে থাকা পাড়ে, একটা ঝিলিক খেলে যাচ্ছে।ঘাড়ের কাছে আলতো করে খোপা, যা তার ভাল লাগতো।

সব কিছুই তো আগের মত করে তার পছন্দ ধারণ করে রেখেছে নিজের ভেতরে।

ভাবে, ঐ উচ্চবিত্ত সাজিদ সাহেবের পছন্দও কি তার পছন্দের সাথে মিলে গেল নাকি? হতেই পারে না।এই নারীকে সে পরিপূর্ণ ভাবে পেল না, এই আক্ষেপেই অরুণ তুসের আগুনে জ্বলতে থাকে সারাক্ষণ।সেই না দেখা সাজিদকে তার চরম শত্রু মনে হয়।

একই ঘরে, একই ছাদের নীচে, কেমন হতো শিপা? কত সুক্ষ সুক্ষ মধুর ব্যাপার থাকে সংসার ঘিরে,দুজন কে জড়িয়ে, সব না জানাই থেকে যাবে আজীবন।

জানতে পারলো না বলে একটা মোহ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়  অহর্নিশ।

ভাবে, ভালবাসা যতদিন থাকে, জীবনের সবই বোধহয় ভাল লাগে।রাগ, অনুরাগ, অভিমান, খুনসুটি, এমনকি ঝগড়াও বোধহয় এক উপভোগের বিষয় হয়ে যায়। এক অজানা জগত নিয়ে ভেবে তাকে তার বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে।

এমন সময় নিমা এসে বেল দেয়, অরুণ গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

নিমা ঢুকেই বলে, খুব ক্ষুধা লেগেছে না, শিপা কই? বস, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে তোমাদের খাবার দিচ্ছি।

ঢুকে দেখে শিপা ড্রইং রুমে নেই।ভেতরে চলে যায়। শিপা ওয়াশ রুমে ছিল। বুঝতে পারে নিমা।শিপা বাথরুমে একটু বেশী সময় ধরে থাকে ,

চোখে মুখে বেশি করে পানি দেয়।ভেতরের দ্বিধা, সংকোচ, একটা অপরাধ বোধ, মনের এসব টানাপোড়েন দূর করে স্থির হতে চেষ্টা করে।আয়নায় দেখে, চেহারায় একটা বিভ্রান্তির ছাপ, এটা তো নিমাকে বুঝতে দেয়া যাবে না।

নিমার সাথে আজ সে ত্রিশ বছর জড়িয়ে আছে।সব মনের কথা অকপটে নিঃসংকোচে বলে দুজনে।

তবুও কিছু দুর্বলতা থাকে একেবারে নিজস্ব, যা কোথাও শুধু নিজের সাথে ছাড়া শেয়ার করা যায় না।

নিমা তাকে দেখলেই বুঝে যাবে।

নিমার গলা শুনতে পায়, বেরিয়ে আসে।নিমার ঘরেই বসে।

নিমা বলে কোন সমস্যা, চোখ মুখ এমন কেন?

আর বেশি কিছু বুঝতে চায় না।বুদ্ধিমতী নারী, বুঝতে পারে, এ তো যে কোন সম্পর্ক না, একটা দীর্ঘদিনের গভীর প্রেম ছিল।খুব সরল সমীকরণ টানা যাবে না এখানে। যা হোক তাদের মধ্যে, সব তার না জানলেও চলবে।

বস, আমি টেবিলে খাবার দেই।ও ঘরে যা, অরুণ একা বসে আছে।

এই এতক্ষণের ভেতরে তোর সাজিদ সাহেব একবারও ফোন দিল না? ভালই তো, বউ পালিয়ে গেলেও বুঝতে পারবে না।

কি যা তা বলছিস, বউ কোথায় পালাবে? জানে তোর বাসা, মায়ের বাসা আর শপিং।যারা বুঝতে পারে, বউ পালাবে না আর, তারা নিশ্চিন্ত থাকে বলে খোঁজ কম নেয়।

তাহলে আমার খোঁজ যে নেয়, আমি কি পালিয়ে যাওয়ার মত বউ?

তুই তো যাকে চেয়েছিলি তাকেই পেয়েছিস।ভাগ্য ভাল, কোন টাকা ওয়ালার হাতে পড়িসনি।

না তোর ধারনা ঠিক না।কোন মানুষ টা কি করবে বলা কঠিন।অরুণ তোকে পায়নি বলে এখনও যে ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসেছে, একেবারে কাছে পেয়ে গেলে, সে কেমন হতো দিনে দিনে, সেটা কিন্তু তুই এখন বুঝতে পারবি না। সংসারে এসে বাস্তবতার ভেতরে সব কিছুর চেহারা পাল্টে যেতে থাকে।

হতে পারে, আমিও বুঝি, কিন্তু ব্যাকুলতা না থাকলেও ভালবাসার অনুভবটা ফিল করা যায়।সাজিদের মত উপেক্ষা করতে পারতো না।সাজিদ শুধু নিজের জীবনটা এনজয় করতে পছন্দ করে।

এর কি সমাধান করবি তুই? অরুণের সাথে জড়িয়ে নিবি নিজেকে? আসলে কোনটাই পাবি না তখন।

আমি তেমন কিছু ভাবছি না নিমা, তবে মাঝে মাঝে খুব জেদ চেপে যায়।

বুঝি শিপা, জীবনটা তো এমনই, একটা জিনিস চাইতে গেলে  আর একটা হারাতে হয় অনেক সময়। তুই ও ঘরে যা, আমি টেবিল সাজাই।

শিপা বলে, বেশিক্ষণ থাকবো না, খেয়েই চলে যাব কিন্তু।

ঠিক আছে যাস, বলে নিমা খাবার দিতে যায়।

শিপা আবার ড্রইং রুমে যেতে একটা সংকোচ বোধ করে।একটা দুর্বল মুহূর্তের আবেগ কত কিছুই না ঘটিয়ে দিতে পারে,যার পরিণতিটা মাথায় থাকে না সব সময়।সে আরো কিছু সময় নিমার ঘরে বসে থাকে।

অরুণ ও ঘরে টেলিভিশন দেখছিল একা বসে।ভাবে, এতক্ষণ হয়ে গেল শিপা কেন আসে না? খুব কি ভুল করে ফেললো? শিপা কিছু মনে করলো? কিন্তু দেখে তো মনে হলো না।

সেও ঠিক করলো, আর বেশিক্ষণ থাকব না।এ তো মরিচিকার পিছে ছোটা।

তবুও যতক্ষণ আছি এখানে আমার সামনেই থাকতো।আর কবে আসবো, কোনদিন দেখা হবে কিনা, একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারে।

চলবে …

গল্পের আগের অংশ

ব্যবধান ( পর্ব: চৌদ্দ )

 

 

Similar Articles

Leave a Reply