You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান (পর্ব: নয়)

ব্যবধান (পর্ব: নয়)

অনন্যা হক

সাজিদ সকালে বেরিয়ে গেলে শিপা কিছক্ষণ লনে থাকে। একটু হেঁটে, বাগানের গাছগুলোকে ঘুরে ঘুরে দেখে। সে তার প্রিয় কতগুলো ফুল গাছ মালিকে বলে এখানে এনে লাগিয়েছে। তার মধ্যে আছে বেলী, লিলি, রজনীগন্ধা, মাধবীলতা, এমন কতগুলো গাছ। সে মাধবী লতা গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখে ফুল গুলো একেবারে তরতাজা হয়ে ফুটে গোলাপী, সাদায় মাখামাখি হয়ে আছে।

খুব মিষ্টি একটা গন্ধ এসে নাকে লাগে। মনটা ভাল হয়ে যায়।

মনে পড়ে, এমন কত দিন, অরুণ মাধবীলতা হাতে করে আসতো, শুধু তার পছন্দ বলে। ভাবে, ভাললাগার এত মিল ছিল বলে কি তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটে গেল?

উপরে উঠে আসে শিপা। সকালে সবার সাথে সে নাস্তা করে না। সবাই চলে গেলে, কিছুটা সময় নিজের পরিচর্যা করে, ইচ্ছে করে তার নিজেকে ভালবাসতে। এটা তার আর একটা প্রিয় কাজ। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রাতে বেঁধে রাখা চুলটা খোলে, ছড়িয়ে পড়ে পিঠ ভরে। এখনকার মত কোন ফ্যাশন চুলে কখনও করতে মন টানেনি। নিজের ভাললাগা কেই ধরে রেখেছে।

নিজের ভেতরে বেশ একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছে ইদানীং। যেন সুপ্ত বাসনাগুলো ঠেলে সামনে বের হতে চাইছে।

এই চুলগুলোও অরুণের খুব পছন্দের ছিল। সে ছেড়ে রাখুক, কি আলতো করে খোপা করুক সব কিছু খেয়াল করে দেখতো সে। বলতো, তুমি আমার জন্যেই পৃথিবীতে এসেছো। অরুণের কাছে সাত বছর ধরে এসব বন্দনা শুনে যেন শিপার একটা বাড়তি মোহ তৈরী হয়েছিল মনে। হঠাৎ ভাবে, কেন ভাবছি এসব ছাইপাশ, কি লাভ অযথা? আবার ভাবে, আসবেই তো মনে, সেদিনও তো সাজিদ জুঁই ভাবিকে তার সামনেই বললো, ইউ আর লুকিং সো গরজিয়াস!

তাহলে পেছনে কি বলে? শুধু তার মনে কেন এত দ্বন্দ্ব এসে ভর করবে, তার তো কত কিছুই প্রাপ্য ছিল।

যে স্বামী তার এই মেকি সোসাইটির মেকি সৌন্দর্য কে উপভোগ করে, বন্দনা করতে ভুল করে না,তার জন্য তার কিসের এত দায়!

সে ভাববে, তার ভাবনা তে কারো দখল নেই। সেখানে কারো প্রভাব নেই, যতক্ষণ সে মরিয়া হয়ে ভাবনার পেছনে ছুটে চলে যাচ্ছে না।

শিপা উঠে দাঁড়ায়, মেরী কে ডাকে। মেরী ঘর গোছাতে এসেছিল, বলে, যাও তো আমার নাস্তা নিয়ে এসো।

বারান্দায় গিয়ে বসে। মেরী নাস্তা দিয়ে যায়।

ট্রে তে এক কাপ দুধ, কত গুলো খেজুর, একটা কলা এনে দেয়। বলে ম্যাডাম, আপনার বিস্কুট নেই আর, কিনতে হবে।

রাজু কে কিনতে বলনি কেন, সব আমাকে দেখতে হবে?এ কদিন দেখতে পারিনি বলে সব এলোমেলো করে ফেলছো নাকি? যাও এগারোটা বাজলে উপরে নাস্তা আর চা দিয়ে যেও।

যাও এখন নীচে যাও, ডাকলে আসবে। আসলে এই কদিন শিপা বেশ অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। সংসারের খোঁজ খবর কমই করেছে।

এখন বসে এই হালকা নাস্তাটা করবে। পরে মেনু তে যেটা আছে, একটু ভারী কিছু খাবে। এই সময়টা শিপার খুব প্রিয়। সে ফোন নিয়ে বসে সোসাইটির অন্য ভাবিদের মত গসিপ, পরনিন্দা করে সময় কাটাতে কোন আকর্ষণ বোধ করে না কখনও।

তার নিজস্ব ঘরানার একটা জীবন আছে। আর আছে কিছু আপন আন্তরিক মানুষ, যাদের সঙ্গে সে বেশ অন্তরঙ্গ আলাপ করতে পারে, তাদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করে, যারা জীবনকে গভীর ভাবে বোঝে, যাদের সাথে মন খুলে, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে কথা বলা যায়। তার মধ্যে নিমা তার বন্ধু, এখনও অটুট বন্ধন ধরে রেখেছে।

নাস্তাটা সেরে, উঠে যায় ঘরে। ল্যাপটপে গান ছেড়ে গিয়ে কেবলই বারান্দায় বসবে, এমন সময় বিছানার উপর মোবাইলটা বেজে উঠলো। ফিরে এলো ত্রস্ত পায়ে। খুশির একটা পলকা ঢেউ এসে মনটা দুলে উঠলো, দেখলো অরুণের নম্বর, সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত নম্বরটা বেজে যাচ্ছে।

নিজেকে আর সম্বরণ করতে মন চাইলো না। খুব জানতে ইচ্ছে করলো, সে কি চায়। ওখানে দাঁড়িয়ে গেল, যেন পা টা আটকে গেল। মোবাইলটা ধরে বিছানায় বসে পড়লো।

ফোনটা রিসিভ করলো। খুব নরম কন্ঠে বললো, হ্যালো, যেন একটা আনন্দ আর বিষাদ এক সাথে কাজ করছে মনে। ভেতর থেকে একটা চাপা উত্তেজনা কষ্ট হয়ে দানা বেঁধে বেরিয়ে আসতে চাইছে, যেন বলতে চাইছে, অরুণ, আমি ভাল নেই। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বড় ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু সামলে নিল অনেক কষ্টে, কিছুতেই টের পেতে দেয়া যাবে না। ফিরিয়ে তো শখ করে দেয়নি।

কেমন আছ শিপা?

ভাল, এতদিন পরে যে, কোথায় ছিলে এতদিন?

কেন, আশা করেছিলে আমাকে?

না একবার যখন করেছিলে, ভেবেছিলাম তাই, আর ঐ যে বললে না, কি যেন জানতে বাকি তোমার! এখন কিভাবে আশা করি তোমাকে? খুব সন্তর্পণে কথা বলে শিপা, যেন অলক্ষ্যে কোন দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে না যায়। কেন আশা করাটাও দোষের বুঝি?

একটা সত্যি কথা বল তো শিপা,এই পনেরো বছরে আমাকে তুমি কত কত বার ভেবেছো? জানি বলতে পারবে না, আমি জানি তুমি অগণিত বার ভেবেছো আমাকে, যেমনটা আমিও। এত সহজ না আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে দেবে একেবারে। পেরেছো বল? তাহলে আমি ফোন রেখে দেবো, আর দেখা না করে ফিরে যাব।

অরুণ তুমি কি জানতে চাও? বড্ড বেশি জেরা করছো তুমি। যেন ভেতরটা বই এর পাতার মত করে পড়তে চাইছো। তাতে তোমার কি লাভ, আমার কি লাভ বল তো, নতুন করে যন্ত্রণা যোগ হওয়া ছাড়া? তুমি কবে যাবে বল, আর পাগলামি কর না, আমাদের অনেক বয়স হয়েছে।

হ্যা চলে যাব তাড়াতাড়ি ঠিক করেছি কিন্তু তোমাকে মাত্র একবার দেখতে চাই।

চলবে…

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

ব্যবধান (পর্ব: আট)

 

Similar Articles

Leave a Reply