You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান ( পর্ব: তেরো )

ব্যবধান ( পর্ব: তেরো )

অনন্যা হক

অরুণ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি ভেতর থেকে, অনেক ক্ষণ বসে আছি, বলে চলে যায় ভেতরে। শিপা তেমনই বসে থাকে, যেন এখান থেকে উঠার বল নেই শরীরে।

হেঁটে চলে গেল অরুণ চোখের সামনে দিয়ে।

শিপা ভাবে, কতগুলো বছর এই পুরুষটা তার একেবারে নিজের ছিল, একটা ঘটনাতে কতদূর নিয়ে গেল তাকে!

যার ভাগ সে কোনদিন কাউকে দেবে ভাবেনি।তখন এমনও হয়েছে, অন্য কারো সাথে একটু হেসে কথা বললে, বেশি কাছে দাঁড়ালে খুব রাগ হতো ভেতরে।

এখন সে কত কাছে থেকেও কত দূর! ইচ্ছে করলে একটু ছুঁয়ে দেখতে পারবে না, তার কি ইচ্ছে করছে না? নিজেকে কিভাবে মিথ্যে বলবে? কিন্তু ছুঁতে পাবে না, মাঝখানে একটা বিশাল দেয়াল উঠে গিয়েছে।

জীবনের এ কেমন অংক, যা ইচ্ছে তাই করা যায় না। আমি পারছি না, পায়ে পায়ে শত শত বাঁধা, কিন্তু আবার অনেকে তো দেখছি, শুনছি, অবলীলায় করে যায় কত নিষিদ্ধ কিছু !

এই সেই অরুণ, একটু ভারী হয়েছে শরীর, আগের দেখা যুবক নেই।

একজন চল্লিশোর্ধ পুরুষ।

হাঁটা,কথা বলা, চাহনি তে আরো পুরুষালি, বুদ্ধিদীপ্ত লাগছে, তাকে যেন আরো আকর্ষণ করছে। শিপা নিজের মন কে সংযত করে,দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না।

এখান থেকে ঠিক ভাবে ফিরতে হবে তাকে।

হঠাৎ মেয়েদের কথা মনে হয়, মায়া হয় তার। এতক্ষণে মনে এল না কেন তার? এটাকেই বুঝি নিজের প্রতি ভালবাসা আর মোহ বলে?

মোবাইলটা বের করে দেখে একটা বাজে। ঠিক দুটোয় স্কুল শেষ হবে। একটা ফোন করে মেরী কে। বলে,বাচ্চারা এলে গোসল করিয়ে  খাইয়ে দিও, আমার আসতে একটু দেরী হবে।

এমন সময় নিমা এসে ঢোকে ঘরে, পাশে বসে।বলে, ঠিক আছিস তো? মন খারাপ কেন? কোন ভুল করিস না, আজই শেষ। আর দেখা করিস না।

হ্যা, আমিও তাই ঠিক করেছি। তোর রান্না কত দূর? শেষ করে  এখানে এসে বস না।

কেন ভয় পাচ্ছিস নাকি?

না কিসের ভয়?

ছোট থেকেই কিন্তু বড় ভুল শুরু হয় শিপা। ভেতরে যাবি? আমি কিন্তু গোসলে যাব, এরপরে পিয়া কে আনতে যাব।পারবি একা থাকতে, নাকি যাবি আমার সাথে? ধুর এত ভয় পাওয়ার কি আছে। তোকে নিয়ে গেলে আবার অরুণ কি করবে একা? ওর অপমানে লাগবে। ভাববে তাকে বিশ্বাস করছি না। কার কাছ থেকে কাকে পাহারা দিচ্ছি বল।এই বয়সে কি আর আগের মত ভুল করতে পারিস তোরা? এই বাসায়ই কিন্তু ঘটেছিল ভুলটা ভেবে দেখ, আমি যাই।

একা একাই কি সব ভুলভাল বলে গেলি, অরুণ কই, কি করে ভেতরে এতক্ষণ?

গেস্ট রুমে, ফোনে কথা বলছে। তুই বোস বলে, ভেতরে চলে যায় নিমা।

নিমা একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায়।আবার নিমার বাসায় অরুণের সাথে একা? মনে পড়ে গেল সেদিনের স্মৃতি, যে স্মৃতি যখন তখন মনের ভেতরে একা পেলেই জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে, তাকে পোড়ায়। নিমার বিয়ে হয়েছিল তাদের সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই।

এমনই একদিন এ বাসায় তারা একা হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

পাঁচ বছরের সংযম, বা সুযোগের অভাবে যে দূরত্বটা বজায় রেখে চলতো, সেটা এক নিমিষেই একটা ঝড়ো হাওয়া উঠে নিজেদের সংযমের দেয়ালটা কে ভেঙে চুরমার করে দিল।

দুজনকে খুব কাছে এনে একাকার করে দিল।

সে এক বাঁধ ভাঙ্গার জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল দুজনে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই আচমকা অপ্রত্যাশিত ভাবে বিচ্ছেদ ঘটে গেল তাদের। মন এবংশরীর যেন আরও উন্মুখ হয়ে গেল দুজনের প্রতি দুজনে।

কেন এসব ভাবছে শিপা, নিজেকে নিজেই জিজ্ঞাসা করে? এমন কি হচ্ছে, আবার মনের কোন এক কোনে, এমন করে দুজনের নিভৃত সান্নিধ্যের একটা উন্মুখতার দোলাচল উঁকি দিয়ে যাচ্ছে?

অরুণ আসে রুমে। বলে, কি বসেই আছ? কি ভাবছো?

শিপা একটু গাঢ় চোখে তাকায়, যে চোখে কাজ করে একটা মুগ্ধতা।

দেখে অরুণের মুখের আদল, গভীর ভালবাসা জড়ানো চোখ, সে চোখে যেন তারই প্রতিচ্ছবি।

সেই কপাল, যেখানে কতগুলো চুল এসে এলোমেলো পড়ে থাকে, যা ছিল শিপার খুব প্রিয়।

অরুণ বসে। শিপা বলে, তুমি যাচ্ছ কবে? একবার বললে চলে এসেছো একবারে, আবার বলছো চলে যাবে দ্রুত,কোনটা ঠিক?

তুমি কোনটা চাও?

আবার এসব কথা? আমার চাওয়া পাওয়ায় এখন কিছুই আসে যায় না।

জানি। এমন ভেবেছিলাম, কিন্তু এখানকার যা পরিস্থিতি চলেই যাব। এখানে আমার জন্য সব অনিশ্চিত, তুমিও।

আমি কি করলাম?

তোমার কিছুই করার নেই। সব হলো আমার বেসামাল মনের টানাপোড়েন।

এর মধ্যে নিমা রেডি হয়ে আসে। তোরা একটু বোস, আমি মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি। কাছেই বেশি দেরী হবে না বলে বের হয়ে যায়।

পুরো একটা খালি বাসায় ওরা দুজন একা। বাসাটাই যেন পনেরো বছরের আগের স্মৃতিতে চলে গেল।

শিপার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ভয়টা কি অরুণ কে, না নিজেকে বেশি, বুঝে পায় না।

আবার ভেবে আশ্বস্ত করে নিজেকে, অরুণ নিশ্চয় এখন নিজের লাগাম টানতে জানে।

অরুণ উঠে দাঁড়ায়। শিপা একটু কেঁপে ওঠে। সে শিপার কাছে এসে বলে, আমি একটু তোমার পাশে বসি শিপা? শিপা কিছু বলার আগেই অরুণ বসে পড়ে।

অরুণ এমনই !

চলবে…

গল্পের আগের অংশ

ব্যবধান ( পর্ব: বারো )

 

 

Similar Articles

Leave a Reply