You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান (পর্ব: আট)

ব্যবধান (পর্ব: আট)

অনন্যা হক

সেদিন রাত এগারোটা বেজে গেল মায়ের বাসা থেকে ফিরতে। সাজিদ এলো দেরি করে, এসে আর বসবে কি, একটু দেখা করেই বেরিয়ে গেল সবাইকে নিয়ে।

শিপা মাকে আলাদা করে ডেকে, কিছু টাকা হাতে দিয়ে বললো, এটা রাখো। বলে গেল, আর কিছু  কিছু প্রয়োজন হলে বল।

বাসায় ফিরে বাচ্চারা বেশি সময় নিল না ঘুমিয়ে গেল।সাজিদ এসে ফ্রেশ হয়ে ঘরে ঢুকতেই একটা ফোন এলো। বারান্দায় চলে গেল। শিপা পোশাক পাল্টে রাতের শোয়ার পোশাকটা পরে ঘরে  এসে দেখে সাজিদ ঘরে নেই। বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখে ফোনে কথা বলছে। বেশ বিরক্ত হয় শিপা, একটু বিক্ষিপ্ত মনে ভেতরে চলে আসে। ভাবে এখন এক ঘন্টা চলবে কথা।

এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে। খেয়াল করে নিজের দিকে ভাল করে, দেখে মুখটা কে খুটিয়ে খুটিয়ে, কতটুকু পাল্টেছে এই পনেরো বছরের বিবাহিত জীবনে। খুব কি কোন ছায়া পড়েছে এই অসন্তোষ আর অবহেলার?

খুঁজতে থাকে, আগের সেই সুডৌল, লাবণ্যে ভরা মুখটা, খুঁজে পায় না। অরুণের সেই মুগ্ধ চাহনি  একবারও সাজিদের ভেতরে দেখেনি। সাজিদ যেন এসব দেখতেই জানে না। অরুণ যখন তাকাতো তার দিকে, কোথা থেকে যেন একটা বাড়তি লাবন্য এসে ভর করতো চেহারায়, সে নিজেও বুঝতে পারতো।

কিছুটা লাজুক হতো শিপা, এসব কেন সাজিদের সাথে হয় না?

একই ঘরে একই ছাদের নীচে,কত কাছে একটা লোক, তবুও এত দূরেই রয়ে গেল কেন?

কার দোষে, সেকি কোন ভুল করেছে? আপন করতে পারেনি, নাকি সাজিদের নিরাসক্ত ভাব, আর অবহেলা?

শিপার মুখটা ইদানীং নিজের কাছে কিছুটা অচেনা লাগে কখনও। শিপা চুলটা বেঁধে উঠে পড়ে।

সাজিদ কথা শেষ করে ভেতরে এসে বলে, নিয়াজ একবার ফোন করলে সহজে ছাড়ে না।

কেন রাতে দেখা হয়নি?

না আজ মিটিং ছিল অন্য পার্টির। সে তো খোশ গল্প করে। ওর নিজস্ব কথাই অনেক, জানো তুমি।

সারাদিন পরে রাতে বাসায় আস, এই মাঝরাতেও তাদের এত কথা থাকে তোমার সাথে?

কি এত কথা বল বলো তো! তোমার কি পরিবার, দাম্পত্য জীবন বলে কিছু থাকতে নেই? আমার সাথে কয়টা কথা হয় তোমার দিনে রাতে? নাকি বাসাটা তোমার শুধু বিশ্রামের জায়গা?

শিপা, কি হয়েছে তোমার হঠাৎ? আজকাল বেশ অভিযোগ করছো। এগুলো নতুন কিছু না, সব তুমি জানো। আমার ব্যস্ততা, প্রয়োজন সব ব্যবসা কে ঘিরে।

কি হবে এত টাকা দিয়ে? আমার তো এত চাহিদা ছিল না কখনও। আমার আরও অনেক কিছু চাওয়ার ছিল, যেটা কোনদিন বুঝতে চাওনি তুমি।

তুমি বললে তো হবে না, এটা আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া ব্যবসা, এমন ব্যস্ততা সব সময় ছিল। এখন এটা কমিয়ে আনা সম্ভব না। কেন তোমার সমস্যা কি, কেন আর দশটা নারীর মতো হতে পার না তুমি? অন্যদের মতো তোমার একটা সোসাইটি থাকা উচিত ছিল। তুমি তো নিজেকে গুটিয়ে একা থাকতে পছন্দ কর।

হ্যা করি, সেটা আমার দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তির ফসল।

এখন এত রাতে ঝগড়া করবে নাকি? জানো তো আমি ক্লান্ত। এখন আমি ঘুমোবো, কাল আমার অনেক কাজ আছে।

হ্যা তুমি ঘুমোতে যাও সাজিদ। আমিও বলছি তোমাকে, এই জীবনে আমি একেবারে হাঁপিয়ে  উঠেছি। বলে মোবাইলটা নিয়ে বারান্দায় চলে আসে।এসে চেয়ারে বসে থাকে, খুব জেদ চেপে যায় মনে। ইচ্ছে করে অরুণকে একটা ফোন দিতে।কিন্তু নিজের লাগাম টেনে ধরে। ভাবে এতটা বেসামাল হলে চলবে না।

আজ পনেরো বছর ধরে যেটা মেনে নিয়েছে, এক পলকা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়ার বয়স তার না। ঘরে দুটো মেয়ে আছে, তার অনেক দায়িত্ব, অনেক গুলো মানুষের সুখ দুঃখ তার সাথে জড়িয়ে আছে।

শুধু মাত্র নিজের মনের প্রাপ্তির দিকে তাকাতে গেলেই হুড়মুড় করে ঢুকে যাবে অনেক এলোমেলো হাওয়া, সে কি সামাল দিতে পারবে?

মোবাইলে অরুণের নম্বরটা চোখের সামনে এনে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, সব মেনে নিয়ে চলছিল তো যেমনই হোক। কেন আমার নিভৃতে একাকীত্বে বসবাস না করে, আবার চেপে যাওয়া জলে ঢেউ তুলে দিলে? এ কারণেই না পাওয়া গুলো আজ সামনে এসে উতলা করছে আমাকে। অনেক রাত হয়ে এলো। রাতের আকাশের তারাগুলো বেশ খানিকটা মেঘে ঢেকে গিয়েছে।

খুব মন খারাপ নিয়ে শিপা ভেতরে উঠে এলো, ঘুমোবে বলে। এসে সাজিদের পাশে শুয়ে পড়লো। মনে হলো যেন একই খাটের পাশের লোকটা অনেক দূরের কেউ।

চলবে…

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

ব্যবধান (পর্ব: সাত)

 

 

Similar Articles

Leave a Reply