You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ব্যবধান ( পর্ব: এগারো )

ব্যবধান ( পর্ব: এগারো )

অনন্যা হক

শিপা আলমারি খুলে শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলপাই রঙের শাড়িটা বের করলো।এই রংটা অরুণের বেশি পছন্দ ছিল।শাড়িটা পরে নিল বেশ পরিপাটি করে।নিজেকে খুটিয়ে পরখ করে নিচ্ছে, কতটুকু খুঁজে পাবে তার মধ্যে সেই পুরোনো শিপা কে!

একটু হালকা ঘরানার সাজে নিজেকে তৈরি করলো।ইচ্ছে করে কম সাজলো।এখানে এত চপলতা মানাবে না।এ তো এক নিষিদ্ধ অভিসার, একটা আকর্ষণ, ভয়,বিষাদ,অস্থিরতা, একসাথে কাজ করছে।

হিসাবে আনতে পারে না, এই অভিসারের শুরু কিংবা সমাপ্তি তে কি আছে,তবুও কোথা থেকে যেন একটা সাহস এসে ভর করলো মনে।জানে না জীবনে যোগ হবে আরও বেশি কষ্ট, নাকি ক্ষণিকের অসম্ভব সুন্দর কোন ভাল লাগা!

এমনই হাজারটা প্রশ্নে মগ্ন হয়ে সব গুছিয়ে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে, সাজিদকে একটা ফোন দিল, তার সঠিক অবস্থান জানতে।

সাজিদ ধরতেই বললো, খুব ব্যস্ত বুঝি?

হ্যা একটু ব্যস্তই আছি, কি বলবে বল।

না, তেমন কিছু না।আমি একটু নিমার সাথে শপিংএ যাচ্ছি। তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।

ঠিক আছে যাও।

রাখছি বলে শিপা ফোন রেখে দিল।

কত অবলীলায় আজ স্বামীকে এই মিথ্যা কথা টা বলে ফেললো, যা আগে কোন দিন করেনি।ঠিক যেন সেই বাইশ তেইশ বছরের মত, যখন মাকে বলে বের হতো অরুণের সাথে।

শিপা বের হলো বাসা থেকে নিমার বাসার উদ্দেশ্যে।পৌঁছে গেল আধা ঘন্টার মধ্যে।গাড়ি থেকে নামলো, বুকের ভেতরে দামামা বেজে যাচ্ছে, যেন শুনতে পাচ্ছে।

দরজায় বেল দিল, ভাবছে, অরুণ কি আগে এলো, নাকি সে? ঢুকেই দেখবো, নাকি আবার অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে।

আসবে তো অরুণ?

নিমাই দরজা খুলে দাঁড়ালো।করিডোরে দাঁড়িয়ে দুই বান্ধবী, নিমা হেসে দিয়ে বলে, এ কেমন অভিসার তোদের বল তো? আর কত কিছুর সাক্ষী হতে হবে আমাকে? একটু চাপা স্বরে কথা বলে, এ ধকল নিতে পারবি তো শিপা?

জানি না,তুই বল অরুণ এসেছে কিনা? আসেনি আবার, যা ড্রইং রুমে বসে আছে তোর জন্য।আমি যাই ভেতরে, প্রথম দেখাতে শুধু দুজনেই থাক। তোদের জন্য চা নিয়ে আসছি।

নিমা বন্ধুকে একেবারে নিজের মত করে বোঝে, জানে তার জীবনের সব পাওয়া না পাওয়া কে।তাই তো তার উপরে শিপার এত নির্ভরতা।

এদিকে বেল শোনার পর থেকে অরুণ একটা উত্তেজনা নিয়ে বসে থাকে।এখনও নিজের এই দুর্বলতা দেখে ভাবে, ঠিক একদিনই, আর না।যে গল্পের কোন সমাপ্তি নেই, সেটা কে আর বাড়তে দেয়া যাবে না।খুব দ্রুত চলে যাবে আবার বিদেশে।

শিপা ভেতরে ঢোকে।

অরুণ উঠে দাঁড়ায়, বলে, এলে তাহলে? অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছি।একটু দাঁড়িয়ে থাকে দুজনে, একসাথে বলে, বস।

একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে দুজনের শরীর বেয়ে, যেন এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।এমনই হওয়ার কথা।কেননা ঐ সাত বছরে অনেক স্পর্শের আবেশ ছিল দুটো শরীরে, যা এখনও তারা একাকী অনুভব করে।

অরুণ নিজের জায়গায় গিয়ে বসে।শিপা একটু দুরত্ব রেখে অন্য সোফাতে বসে।

অরুণ বলে, এত দূরে বসলে? শিপা একটু লাল হলো।একসাথে দুজনে বলে উঠলো, কেমন আছ?

উত্তর আর দেয়া হয় না।শিপার এমন লাগছে কেন? মুখের সব কথা যেন সব আটকে গেল ভেতরে।আসার সময় যে উচ্ছ্বাস, সাহস ছিল, সব কেমন ঝিমিয়ে আছে।

অরুণেরও যেন বেশি কথা আসছে না।এত বছর পরে, তবুও কেন এত আকর্ষণ, ঠিক আগের মত!

শরীর এবং মনে কেন প্রেমের অনুভূতি গুলো আগের মত করে অনুভব করছে?

এটাই বোধহয় সত্যিকারের প্রেম, তাই দুজনের কেউ অন্য দুটো জীবনের সাথে জড়িয়ে কাউকে আপন করতে পারলো না।

অরুণ বলে, তুমি আগের মতই আছো, তেমনই সুন্দর।দুটো বাচ্চার মা বললে, কিন্তু শরীরটা তো ঠিক বেঁধে রেখেছো।

শিপা আবার লাল হলো, দেখলো, অরুণ ঠিক আগের মত করে এটুকু সময়ের মধ্যে, তার সুক্ষ দৃষ্টিতে তাকে পরখ করে দেখে নিয়েছে।

কই, না, আমি তো দেখি, অনেক পরিবর্তন।

নিজেকে নিজে কতটুকু দেখা যায় শিপা? যাক ভাল লাগলো তোমাকে দেখে, ঐ পুরুষ টা খুব বেশি পাল্টে দিতে পারেনি, আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে।

শিপা আবার দুর্বল হতে লাগলো।এটাই অরুণের প্রেমের মহিমা, যে কারণে অরুণ কে ভোলা যায় না, শিপা ভুলতে চায় না।সাজিদ তাকে কোন দিন এমন করে নিজের করতে পারেনি।তাই মনে হয়, সে এসে ভুল করেনি।

ভালই হলো অরুণ এলো আবার, হোক একদিন কি কটা দিন দেখা, তার ভাবতে ভাল লাগবে, তার জন্য পৃথিবীতে ভেবে যাওয়ার কেউ একজন আছে, থাক না সে দূরে!

শিপা এবার বলে, তুমি একটু ভারি হয়েছো, তোমাকে ভাল লাগছে আগের থেকে বেশি।

কেন আগে কম লাগতো বুঝি?

সে সব কথা তো তখন জানতে, বলিনি বুঝি? অন্য কথা বল।

এড়িয়ে যেতে চাইছো কেন? কোন অন্য কথা বলবো না, আমি শুধু মাত্র তোমার কথা শুনতে এসেছি। একটা কোন তৃতীয় ব্যক্তি নিয়ে আমার কোন কৌতুহল নেই, তোমার বর কে নিয়েও না।

তার উপর অনেক রাগ বুঝি তোমার?

আমি এসব বলতে আসিনি, সময় নষ্ট করার সময় নেই।

শিপা বলে ডেকে, খুব গাঢ় চোখে তাকায় অরুণ।বলে, আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমাকে।আজ টের পাচ্ছি, একেবারে হারিয়ে যাইনি আমি।

শিপার ভেতরের মৃদু ঢেউ গুলো বড় হতে লাগলো, ঢেউ এর ধাক্কায় ভেতরটা বাঁধ ভাঙা পাড়ের মত ভেঙে যেত লাগলো।শিপা ভয় পেলো, এর শেষ কোথায়?

এর মধ্যে নিমা খলবল করতে করতে চা নিয়ে এলো।

চলবে..

গল্পের আগের অংশ

ব্যবধান (পর্ব: দশ)

 

 

 

 

Similar Articles

Leave a Reply