You are here
নীড়পাতা > মুক্তমত > প্রতিক্রিয়া > বেদনা মধুর হয়ে যায়

বেদনা মধুর হয়ে যায়

Your ads will be inserted here by

Easy Plugin for AdSense.

Please go to the plugin admin page to
Paste your ad code OR
Suppress this ad slot.

জেসমিন চৌধুরী

নিউহাম হসপিটালের সাধারণ একটা লেবার ওয়ার্ড অসাধারণ হয়ে উঠেছিল বাইশ বছর আগের এক ভোরে একটি প্রতীক্ষিত শিশুর অভিনব আবির্ভাবে। অল্প বয়েসী মেয়েটির সাথে আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। তার চার বছরের ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্য বাচ্চার বাবাকেও বাসায়ই থাকতে হয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ব্যথার সাথে লড়তে লড়তে সে প্রতীক্ষা করতে থাকে কখন তার কোল আলো করে নতুন শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে।

ছেলে হবে, না মেয়ে? ডাক্তার বলতে চাইলেও সে জানতে চায়নি। এই অনিশ্চয়তার উত্তেজনাটুকু তার প্রতীক্ষার ‘বেদনাময়’ প্রহরগুলোকে কিছুটা হলেও মধুর করে তোলে। সমস্ত রাত ধরে একটু পরপর অসহনীয় ব্যথা হলেও সে নার্সকে ডাকাডাকি করে না। ব্যথা তো হবেই, অন্যদেরকে বিরক্ত করে কী লাভ?

সকাল বেলা নার্স এসে বলে,
‘তোমার তো সারারাত ব্যথাই হলো না। বাচ্চা হবে কী করে? কৃত্রিম ব্যথা উঠানোর জন্য জেলি ইনডিউস করতে হবে মনে হচ্ছে।’
‘না, না সমস্ত রাত একটু পরপর অনেক ব্যথা হয়েছে, আমি তোমাকে ডাকিনি’।
শুনে নার্স অবিশ্বাসের হাসি হাসে, ‘ব্যথা হবে আর ডাকবে না, তা কি সম্ভব? তোমাকে তো টু শব্দ করতেও শুনলাম না।’
‘অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে চুপ করে সহ্য করেছি।’

নার্স আবার হাসে, ‘এতো সহ্য ক্ষমতা কারো নেই বুঝলে ডার্লিং? তোমার কোনো ব্যথা হয়নি, তুমি নিশ্চয়ই সব কল্পনা করেছ’।

পেটের সাথে লাগানো মনিটর চেক করে নার্স, মনিটরেও ব্যথার কোন আলামত দেখা যায় না। মেয়েটাকে বিশ্বাস করার এখন আর কোনো প্রশ্নই আসে না।

মেয়েটার কোন কথা কেউ কানে তোলে না। আগের দিন ভোরে পানি ভেংগেছে, শীগগিরই ডেলিভারি না হলে ইনফেকশনের সম্ভাবনা। নার্স আর ডাক্তার মিলে সিদ্ধান্ত নেয় কৃত্রিমভাবেই ব্যথা উঠাতে হবে। কৃত্রিম ব্যথার জন্য জেলি ইনডিউস করতে না করতেই নার্স ঘোষণা দেয় বাচ্চার মাথার তালু দেখা যাচ্ছে। এক্ষুনি ডেলিভারি রুমে নিতে হবে। হুড়াহুড়ি পড়ে যায় চারদিকে। ডেলিভারি রুমের দিকে বিছানা ঠেলতে ঠেলতে নার্স বলে, ‘তুমি তাহলে সত্যি কথাই বলছিলে? মনিটরের সেন্সরটা হয়তো সরে গিয়েছিল তাই কিছু দেখা যায়নি’।

প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে মেয়েটা। আগেও প্রসবের অভিজ্ঞতা হয়েছে তার, কিন্তু এবারের ব্যথাটা একেবারেই অকল্পনীয়, অবর্ণনীয়। হয়তো স্বাভাবিক ব্যথা থাকা সত্ত্বেও জেলি ইনডিউস করার কারণে ব্যথার তীব্রতা এতোটা বেশি। যে মেয়েটা সারারাত টু শব্দ না করে ব্যথা সহ্য করেছে সে এখন গলা ফাটিয়ে কাঁদতে থাকে, ‘প্লিজ ডু সামথিং নার্স, প্লিজ। আই কান্ট টেক দিস এনি মোর।’

মেয়েটার মুখে গ্যাস মাস্ক ঠেসে দিতে দিতে নার্স তাকে হাতের ব্রেসলেট আর ঘড়ি খুলতে তাড়া দেয়। ঘড়ির বাকলটায় হাত দিতে গিয়ে মেয়েটা টের পায় তার হাতে কোনো শক্তিই নেই। জ্ঞান হারাতে হারাতে মেয়েটা শুনতে পায় নার্স বিড়বিড় করে বকছে, ‘এইসব বাচ্চা মেয়েগুলা মা হয়ে যায় কিন্তু কিচ্ছু বোঝে টোঝে না।’

‘বাচ্চা’ মেয়েটার যে চার বছরের আরো একটা বাচ্চা আছে নার্সের বোধ হয় হুড়াহুড়িতে সে কথা মনে থাকে না।

বাচ্চা মেয়েটা তখন গ্যাসের প্রভাবে পুরাই আচ্ছন্ন অবস্থায় একটা অন্ধকার টানেল ধরে ছুটছে। কে যেন তাড়া করছে তাকে পেছন থেকে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টানেলের অন্য মাথায় উজ্জ্বল আলো দেখা যায়, মেয়েটা প্রাণপণে ছুটতে থাকে। তাকে আলোর দিকে যেতে হবে যেভাবেই হোক। আলোর কাছাকাছি পৌঁছুতেই দুইদিক থেকে সাদা পোষাক পরা মানুষেরা তাকে ঘিরে ধরে। সবার মুখে মাস্ক, মেয়েটা ভয়ে আবার উল্টোদিকে দৌড়াতে শুরু করে। পেছন থেকে সাদা কাপড় পরা মানুষগুলো তার নাম ধরে ডাকতে থাকে, ‘জেসমিন, শুনছো? শুনতে পাচ্ছ জেসমিন?’ টানেলের দেয়ালে দেয়ালে তার নাম অনুরণিত হয়ে ফিরে আসতে থাকে ‘জেস জেস জেস… মিন মিন মিন…’

মেয়েটার মনে হয় হয়ত সে মরে গেছে। এই অন্ধকার টানেলটাই কি তার কবর? সাদা পোশাক পরা লোকগুলো ফেরেশতা? এইবার কি তার শাস্তি শুরু হবে?

এমন সময় সম্বিত ফিরে পেলে সে দেখে সাদা এপ্রন পরা নার্স আর ডাক্তার তার উপর ঝুঁকে আছে। নার্স ক্রমাগত বলে যাচ্ছে, ‘উই মাস্ট পুশ জেসমিন। ক্যান উই হিয়ার মি জেসমিন? জেসমিন, ইউ মাস্ট পুশ হার্ড!’

একটু পরেই সব ব্যথার ইতি ঘটিয়ে মেয়েটার কোল আলো করে এলো ছোট্ট হালকা এক বান্ডিল ভালবাসা। ওজন বড় জোর পাঁচ/ছয় পাউন্ড। একজন মা আর একটি শিশু। দু’জনে দু’জনার। কোথাও আর কেউ নেই।

শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত কাঁদছে মেয়েটা। ডাক্তার বা নার্সরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার এগিয়ে এসে বলল, Are you upset because it’s a girl? She is healthy and beautiful, nothing else matters.’

জবাবে মেয়েটি আরো জোরে কেঁদে উঠলো, ‘You don’t understand, I’m so happy!’

নবজাতক মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে অল্পবয়েসী মা টি ভাবে, ‘এই পৃথিবীটা তোর হবে, শুধু আনন্দের, শুধু সাফল্যের আর সার্থকতার। আমি এরই মধ্যে অনেক সয়েছি কিন্তু তোর গায়ে যেন ফুলের টোকাও না লাগে।’

সেই ছোট্ট আদরের বান্ডিলটি আজ বাইশ বছরের হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই ইউকে সিভিল সার্ভিসে পলিসি অফিসার হিসাবে জয়েন করবে। তার পাগল আবেগ প্রবণ মায়ের চোখ আজো যখন তখন ভিজে উঠে। একটি অসম্ভব রকমের ভালো মেয়ের, ভালো মানুষের মা হবার আনন্দ কোথায় রাখবে, সে ভেবে পায় না।

 

Similar Articles

Leave a Reply