You are here
নীড়পাতা > মুক্তমত > প্রতিক্রিয়া > বাবারা থাকেন এভাবেই, নিঃশব্দে…

বাবারা থাকেন এভাবেই, নিঃশব্দে…

ফাহরিয়া ফেরদৌস
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য এবং অধিক আধুনিক না হওয়ার জন্য চিন্তায় কিছু রেসট্রিকশন আছে আমার বাবার। আমার বাবা এখনও সন্তান বলার সময় বলেন ছেলে সন্তান, যদিও আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করি, তখন আব্বু আবার বলে হুম ছেলেমেয়ে!! তারপরও বাবা হলেন মাথার উপর ছায়া! যত বয়স বাড়ছে তত যেন দেখতে বা বুঝতে পারছি বাবার জায়গাটা।

আমার বাবা সারাজীবন ভোরে ওঠে অফিসে যান আর আসেন সন্ধ্যায়। আমার আবার অফিসের ফ্যাক্টরির তাপমাত্রা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি বা তার চেয়ে ও অনেক বেশি। আমরা যখন নারায়নগঞ্জে ছিলাম তখন সন্ধ্যার পর থেকে লোডশেডিং থাকতোই, কখনো কখনো এই বিদ্যুৎ না থাকা চলতো সারারাত; খুব অদ্ভুত হলেও দেখতাম আব্বু সারারাত হাত পাখা দিয়ে আমাদের বাতাস করে যেতেন।

আমার বাবা কোনদিন বাইরে কিছু কিনে খাননি, বাসায় ঢুকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবেন, ফাহরিয়া কোথায়, তারপর আমার ভাইয়ের কথা। আব্বুর অফিসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি দিলে আব্বু কোনদিন খাবে না, আসার সময় আরও কয়েক প্যাকেট কিনে বাসায় এসে তারপর খাবেন। আব্বুকে একদিন বললাম, তুমি এভাবে না খেয়ে থাকো কেন, আসার সময় কিছু কিনে খেলেই তো পারো, অনেকদিন বলার পর একদিন আব্বু বললো “তোমাদের ছাড়া খেতে ভালো লাগে না”। আমার বাবা চকলেট আর আইস্ক্রিম খেতে খুব পছন্দ করেন, প্রতি শুক্রবার আম্মু আব্বুর পছন্দের খাবার রান্না করেন, খাবার পর আব্বু বলবেন “তোমাদের খারাপ লাগছে, আইস্ক্রিম খেলে ভালো লাগবে, যাও আইস্ক্রিম নিয়ে আসো”; তাই কোন চকলেট পেলে আমি বাসায় এনে আব্বুকে নিয়ে খাই।

ছোটবেলায় আমি মুরগির লেগ পিস ছাড়া কিছু খেতাম না, আর আমার বাবা ও কাউকে খেতে দিতেন না, আমার ছোট ভাইকে বুঝালেন। আমার ভাইও কোনদিন আর লেগপিস দাবি করেনি। আব্বু বলেছিল শ্বশুরবাড়ি কেমন না কেমন হয়, আমার মেয়েকে সবচেয়ে ভালো খাবার দিবা।

এই কয়েক বছর আগেও অসুস্থ হলে আব্বু রাতে ঘরে এসে গায়ে হাত দিয়ে দেখতেন আমি ঠিক আছি কিনা! আর এখন আব্বু অসুস্থ হলে আমি মাঝরাতে যেয়ে দেখে আসি আব্বু ঠিক আছেন কিনা, বেশি ভাবি বলে আব্বু আমাকে বলতে চাননা খারাপ লাগলে। আমার ঘুম অনেক গভীর, একবার ঘুম গেলে আর কোন খবর থাকে না, ভূমিকম্প বা কোন দুর্ঘটনা হলে যদি আমাকে ডেকে তোলা না যায় তখন কি হবে এই ভেবে এখনও আমার বাপ আমাকে দরজা লক করতে দেননা!

আমার কাছে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে, আব্বু অসুস্থ হলে এটা ভাবেন যে তিনি মরে যাবেন, ভাবেন আমার বউ ছেলেমেয়ে কিভাবে চলবে? এই বিষয়টা আমি খুব স্পষ্ট দেখতে পাই। কতদিন যে আমাকে ডেকে বুঝিয়ে দেন কোথায় কি আছে, আম্মুকে কি করতে হবে!

মেয়েদের শ্বশুরবাড়ীতে অত্যাচার করলে মেয়ের বাবা মায়েরা বলে মানিয়ে নাও, কিন্তু আমি যখন ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম শ্বশুরবাড়ি তখন আমার আব্বু বলেছিলো, তুমি যদি যাও আর কোনদিন আসতে পারবে না, আমার কাছে তোমার বেঁচে থাকাটাই প্রধান। আমার ডিভোর্সের পর আমার মা শুধু কাঁদত, কিন্তু আমার বাবা সবসময় আমার শক্তি হয়ে ছিলেন, সারাজীবন ১০ টাকা চাইলে ২০ টাকা দিতেন, কোর্টে যাই বলে কোনদিন টাকা দেয়া বন্ধ করেননি। ডিভোর্সের পর একদিন দরজার আড়াল থেকে শুনলাম আম্মুকে বলে দিচ্ছেন, আমাকে যেনো সবসময় জিজ্ঞাসা করে আমার টাকা লাগবে কিনা। আমার যেনো কষ্ট না হয়। আমার পেশাই আমার বেঁচে থাকা- এটা আমার বাবা জানে, তাই আমি কোর্টে না গেলে আমার চেয়ে আব্বু বেশি চিন্তিত হন যে আমার কোন সমস্যা হলো কিনা, মামলা কমলো কিনা! এখনও টাকা ধার নিলে ফেরত দিতে গেলে বলেন লাগবেনা।

আসলে বাবা মায়েরা আমাদের যেভাবে ভালোবাসে, বড় হবার পর আমরা সেভাবে বাবা মাকে ভালোবাসা ফেরত দেই না। বয়সের সাথে সাথে বাবা মা ও এক সময় ছেলেমেয়ের কাছে সন্তানের মতো হয়ে যান। কোন সমস্যায় পড়লে আমার আম্মু কাঁদবেন, কিন্তু আব্বু সমাধান দিবেন।

লেখক- আইনজীবী

Similar Articles

Leave a Reply