You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কথা (পর্ব ১)

বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কথা (পর্ব ১)

মধ্য ত্রিশের দশক থেকে একেবারে মধ্য আশির দশক (১৯৩৮ থেকে ১৯৮৩) ছিল আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। যেমন গানের লিরিক, তেমনি তার মনোহরি সুর, তেমনি তার দরদী ভোকালিস্ট। গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী মিলে সর্বক্ষেত্রে এই সময় বাংলা গানের ছিল জয়জয়কার। এই সময়টা ছিল অনেকটা মিডাস টাসের মত। যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে তা প্রায় সবই সোনা। সবকিছুতেই কেমন একটা আকাশছোঁয়া সাফল্য। ডিভোশনাল সঙ, ফিল্ম সঙ, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, অতুল প্রসাদের গান, দ্বীজেন্দ্রগীতির বাইরেও তখন বিরাট একটা গানের জগতের সূচনা হয়েছিল।

১৯৩৪ সালে গ্রামোফোন থেকে যে ৭৮আরপিএম এর রেকর্ডটি বের হয়েছিল, সেটাই ছিল প্রথম আধুনিক বাংলা গান। তার একপিঠে ছিল ‘আমি ভোরের যূথিকা’। আর অপর পিঠে ছিল ‘সাঁজের তারকা আমি’। গীতিকার – প্রণব রায়। সুরকার – কমল দাশগুপ্ত। আর শিল্পী – কুমারী যূথিকা রায়। প্রথম গানটির কথা এরকম- ‘আমি ভোরের যূথিকা।/রাতের শেষে সাজিয়ে রাখি,/কানন বীথিকা।/কে যেন গো হাওয়ার সনে,/ডাক দিয়েছে আমার মনে।/আকাশে আজ কে পাঠাল,/আলোর গীতিকা।/বন্ধু আমার আসবে জানি,/সোনার অরুণ রথে।/বরণ তারে করতে,/ফুলের আলপনারি পথে।/শিশিরজলে গাহন করি,/শুভ্রশুচি বসন পরি,/জ্বালিয়ে রাখি সারা সকাল,/গন্ধধূপের শিখা।।’

আর দ্বিতীয় গানটির কথা ছিল এরকম- ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে,/এসেছি ভুলে।/মাটীর প্রদীপ হয়ে তুলসীমূলে,/এসেছি ভুলে।/পল্লীবধূ আমি স্নিগ্ধআঁখি,/অস্তরবিরে নিতি পিছনে ডাকি।/আলোর কুসুম আমি অন্ধকারে,/আকুল চুলে এসেছি ভুলে।/আমি নীল আকাশের গোপন কথা,/সন্ধ্যরাণীর কানে শুনায়েছি,/চুপে চুপে সেই বারতা।/দেবতার পদতলে আমি প্রণতি,/শঙ্কিত মরমের ভিরু মিনতি।/চঞ্চল সমীরন আষাঢ়সম,/উঠি গো দুলে এসেছি ভুলে।।’

উমা বসু সেই সময়ের একজন শিল্পী। মাত্র একুশ বছর বেঁচেছিলেন। কিন্তু গেয়েছেন অনেক কালজয়ী গান। অনেক মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন এত অল্প সময়ের পৃথিবীতে। হিমাংশু দত্তের সুরে উমা বসু গেয়েছিলেন বেশ কিছু কালজয়ী গান। ‘চাঁদ কহে, চামেলি গো, হে নিরূপমা,/ফিরালে গো যদি চলে যাই—/যে কালিমা তুমি মোর করনি ক্ষমা/যাবার বেলায় বলে যাই।।/নীলিমার নিবিড় মমতা, মোর লাগি ছিল ধ্যানরতা/বিফল করিলু তারে নিঠুর ঘাতে/বহি আমি সে ব্যথা ছাড়াই।।/তোমার সুরভি মাখা কুঞ্জছায়ে পান্থ আমি যে এসেছিনু,/ভুলে যেয়ো যে রাগিণী ভাসানু বায়ে, ভুলে যেয়ো ভালো বেসেছিনু/পাতায় পাতায় বাজে মানা/‘যাও ফিরে হে পথিক না না’/অকারণে যদি প্রাণ সহসা কাঁদে/ফিরিয়া দেখিবে সে তো নাই।।’ এটি তার একটি কালজয়ী গান। গানটির গীতিকার সুবোধ পুরকায়স্ত, সুরকার হিমাংশু দত্ত আর শিল্পী উমা বসু।

শৈলেশ দত্ত গুপ্তের সুরে সন্তোষ সেন গুপ্তের কণ্ঠে একটি কালজয়ী গান আছে। সুরকার শৈলেশ দ্ত্ত গুপ্ত ও শিল্পী সন্তোষ সেন গুপ্ত ট্রাম ধরার জন্য একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় চলতে চলতে ‘দরবারে কানারায়’ গানটির সুর করলেন শৈলেশ বাবু। গানের মধ্যে ‘মিলন-বিরহ’ একটি শব্দ ছিল। সন্তোষবাবু বললেন, শব্দটা যদি একটু বদল করে ‘জীবন-মরণ’ করা যায় বেশ ভালো হয়। শৈলেশ বাবু তাই করলেন। তারপর ১৯৪২ সালে এই গানটি একটি রেকর্ড তৈরি করলো।

‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা,/মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল/মুখপানে যার কভু চাওনি ফিরে,/কেন তারি লাগি আঁখি অশ্রু সজল।/চিরদিন যারে তুমি দিয়েছো হেলা,/হৃদয় লয়ে শুধু খেলেছো খেলা/বিরহে তারি আজি বলো গো কেন,/শূন্য লাগে এই ধরণী বিপুল।।/আমি তো ছিলাম প্রিয় তোমারই কাছে,/সেই বকুল তলে সেই চাঁদিনী রাতে/সেদিন কেন দিলে না তো হায়/যে মালাখানি ছিল তোমারই হাতে/মোর যত প্রেম, মোর যত গান,/চাইনি তো কভু কোনো প্রতিদান/চিরতরে হায় যবে নিলাম বিদায়, (আমি)/তুমি বুঝিলে কিগো তব হৃদয়ের ভুল।।” কালজয়ী এই গানটির গীতিকার প্রণব রায়, সুরকার শৈলেশ দত্ত গুপ্ত। আর শিল্পী সন্তোষ সেন গুপ্ত।

সত্যরঞ্জন চৌধুরী যিনি সত্য চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছোটবেলায় গ্রামোফোনে গান শুনে গান তুলতেন। কিন্তু এতে পড়াশুনায় ভীষণ ক্ষতি হতো। তাই সত্য’র বাবা গ্রামোফোন শোনাই একেবারে বন্ধ করে দিলেন। অথচ পরবর্তীকালে সেই সত্য চৌধুরীর গান গ্রামোফোনে শোনার জন্য শ্রোতারা গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।

‘পৃথিবী আমারে চায়,/রেখো না বেঁধে আমায়,/খুলে দাও প্রিয়া,/খুলে দাও বাহুডোর।/প্রণয় তোমার মিছে নয় মিছে নয়,/ভালবাসি তাই মনে জাগে এত ভয়।/চাঁদ ডুবে যাবে, ফুল ঝরে যাবে,/মধুরাতি হবে ভোর।/খুলে দাও প্রিয়া,/খুলে দাও বাহুডোর।/সবার মনের দিপালী জ্বালাতে/যে দীপ আপনি জ্বলে,/কেন আর তারে ঢেকে রাখ বলো/তোমার আঁচল তলে।/শোন না কি ওই আজ দিকে দিকে হায়,/কত বঁধু কাঁদে, কাঁদে কত অসহায়,/পথ ছেড়ে দাও, নয় সাথে চলো,/মুছে নাও আঁখিরোল,/খুলে দাও প্রিয়া,/খুলে দাও বাহুডোর।।” কালজয়ী এই বাংলা গানটি লিখেছেন মোহিনী চৌধুরী। সুর করেছেন কমল দাশগুপ্ত। আর গানটি প্রথম গেয়েছেন সত্য চৌধুরী।

সত্য চৌধুরী গান গাওয়ার পাশাপাশি আরো অনেক কাজ করতেন। খুব ভালো বিমান চালাতে পারতেন। ফিল্মে অভিনয় করতেন। আকাশবাণীতে ঘোষকের চাকরি করতেন। ১৯৪৫ সালে পুজার সময় সত্য চৌধুরীর ‘পৃথিবী আমারে চায়’ গানটি রিলিজ করলো গ্রামোফোন। এই গানটি তখন থেকেই কালজয়ী বাংলা গান।

এই দশকের আরেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন কমল দাশগুপ্ত। গায়ক, গীতিকার, সুরকার এই তিনটি কাজেই তিনি সমান দক্ষ ছিলেন। ১৯৩২ সালে গ্রামোফোন প্রথম তার সুর করা গান প্রকাশ করে। ওই একই বছরে মাত্র ২০ বছর বয়সে তার প্রথম গানের অ্যালবামও বের হয়েছিল ‘মাস্টার কমল’ নামে। স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানের খাতা কমল দাশগুপ্তকে দিয়ে বলতেন, ‘যে গানে ইচ্ছে হবে, সেই গানে সুর করবে’। ১৯৪৬ সালে প্রণব রায়ের কথায় গান গেয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত। সুরও করেছিলেন নিজেই। আর ওটা ছিল সে বছরের সেরা গান। কালজয়ী সেই গানটি হলো- ‘কতদিন দেখিনি তোমায়/তবু মনে পড়ে তব মুখখানি/স্মৃতির মুকুরে মম আজ/তবু ছায়া পড়ে রানী/কতদিন দেখিনি তোমায়/কত দিন তুমি নাই কাছে,/তবু হৃদয়ের তৃষা জেগে আছে/প্রিয় যবে দূরে চলে যায়/সে যে আরও প্রিয় হয় জানি/কতদিন দেখিনি তোমায়/তবু মনে পড়ে তব মুখখানি/হয়ত তোমার দেশে আজ/এসেছে মাধবী রাতি/তুমি জোছনায় জাগিছো নিশি/সাথে লয়ে নতুন সাথী/হেথা মোর দীপ নেভা রাতে/নিদ নাহি দুটি আঁখি পাতে/প্রেম সে যে মরিচীকা হায়/এ জীবনে এই শুধু মানি/কতদিন দেখিনি তোমায়/তবু মনে পড়ে তব মুখখানি/স্মৃতির মুকুরে মম আজ/তবু ছায়া পড়ে রানী/কতদিন দেখিনি তোমায়।।’ পরবর্তীকালে এই গানটি মান্না দে’র কণ্ঠে আরো জনপ্রিয় হয়েছিল।

কমল দাশগুপ্তের ভাই সুবল দাশগুপ্তও খুব বিখ্যাত ছিলেন। তখন এই দুই ভাই ‘চাঁদ-সুরাজ’ নামে গানের অনুষ্ঠান করতেন। একবার সুবল দাশগুপ্ত এক নতুন শিল্পীকে দিয়ে গান তোলাচ্ছেন। কিন্তু সেই শিল্পী বারবার একই জায়গায় ভুল করছেন। মেজাজ হারিয়ে ফেললেন তিনি। আর চড় মেরে ফেললেন সেই শিল্পীকে। শিল্পী মাথা নিচু করে সেই সুর তুললেন। রেকর্ডিং শুনে সুবলবাবু জড়িয়ে ধরলেন সেই শিল্পীকে। জন্ম হলো এক নতুন গায়কের। তিনি ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। গানটি ছিল- ‘যদি ভুলে যাও মোরে জানাব না অভিমান/আমি এসেছিনু তোমার সভায় দু’দিন শোনাতে গান।/আমি এসেছিনু অবসর ক্ষণে/মুকুল ফোঁটাতে তব মনবনে/তার বিনিময়ে আমি কোনদিন চাইনি তো প্রতিদান।/আমি এসেছিনু—শোনাতে গান।।/প্রভাতে কে আর মনে রাখে বল রজনী শেষের চাঁদে/ শুধু দু’দিনের সাথী রেখে আর মালার বাঁধনে বাঁধে/ গান সারা হলো আমি যাই সরে/কোনো ক্ষতি নাই ভুলে যেও মোরে/তোমার আকাশে ফুটুক জোছনা আমার দিন অবসান।/আমি এসেছিনু—শোনাতে গান।।’ গানটির গীতিকার প্রণব রায়, সুরকার কমল দাশগুপ্ত। আর শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।

একবার প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের জন্য বিরাট অনুষ্ঠান হবে কলকাতায়। বাংলার প্রায় সব নামী শিল্পী থাকবেন। সেখানে যেতে ডাক পড়লো ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের। কিন্তু উদ্যোক্তাদের সটান তিনি বলে দিলেন- ‘‘প্রধানমন্ত্রীর চিঠি না পেলে আমি গাইতে যাব না।’’ অনুষ্ঠান যখন প্রধানমন্ত্রীর নামে, তাঁকেই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠাতে হবে। উদ্যোক্তাদের তো মাথায় হাত। তখন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বলতে গেলে বাংলা গানের জগতে উল্কা। তাঁকে ছাড়া কোনও অনুষ্ঠান তখন ভাবা যায় না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চিঠি? সেটা পাওয়াও তো দুঃসাধ্য ব্যাপার! তখন উপায়?

এই খবর শেষপর্যন্ত গেল মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। ধনঞ্জয়ের গানের ভক্ত তিনিও। দেখা হলেই বলতেন, ‘‘তোমার গয়াগঙ্গা প্রভাসাদি গানটা গাও তো।’’ ধনঞ্জয় প্রধানমন্ত্রীর চিঠি চেয়েছেন শুনে বিধান রায় বললেন, ‘‘এ ছেলের গাট্স আছে! বাঙালির এই চরিত্রটারই বড় অভাব। ওকে বলো গান গাইতে। আমি জওহরলালের চিঠি আনিয়ে দেব।’’ পরে তাই হয়েছিল। কথা রেখেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। গানও গেয়েছিলেন ধনঞ্জয়।

শেষ জীবনে বিধানবাবু একবার ধনঞ্জয়কে গাইতে ডেকে ছিলেন বাড়িতে। ছেলের অসুখের জন্য যেতে পারেননি ধনঞ্জয়। আর তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো। সে দিনই তিনি খবর পেলেন, ডা. বিধানচন্দ্র রায় আর নেই! এই আফশোস ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

চলবে…

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা

Similar Articles

Leave a Reply