You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কথা (পর্ব ২)

বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কথা (পর্ব ২)

১৯৪৯ সালের রেকর্ড করা গান ‘তুমি গো বহ্ণিশিখা’। এই গানটির গায়ক ও সুরকার ছিলেন শিল্পী কৃষ্ণ চন্দ্র দে। ভাইপো মান্না দে তাঁকে ‘বাবুকাকা’ বলে ডাকতেন। মান্না দে একবার বলেছিলেন, ‘আজও আমি আবর্তিত হয়ে চলেছি বাবুকাকাকে কেন্দ্র করেই। বাবুকাকা সূর্য, আমি তাঁর আলোতে আলোকিত। আমার ভূমিকা চাঁদের চেয়ে বেশি কিছু নয়’। সে যুগে অন্যতম শক্তিশালী গায়ক ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। যিনি কেষ্ট দে নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। চোখে দেখতে পেতেন না কিন্তু কণ্ঠে যেন গানের ছবি আঁকতেন। একজন ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ঘরানার শিল্পী হওয়া স্বত্ত্বেও সব ধরনের গান গেয়েছেন যথেষ্ঠ প্রতিভার সাথেই। সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় তাঁর ধারে কাছে কেউ ছিলেন না।

বাবা শিব চন্দ্র দে ও মা রত্নমালা দেবী ছেলের নাম রাখেন শ্রীকৃষ্ণের নামে কৃষ্ণ চন্দ্র দে। কৈশোর বয়সে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি অন্ধত্ব বরণ করেন। কৃষ্ণ চন্দ্র দে দৃষ্টিহীন ছিলেন কিন্তু তাঁর চলাফেরা, কাজকর্ম ছিল স্বাভাবিক। পঞ্চ ইন্দ্রিয় যেমন সজাগ ও সচেতন ছিল তেমনি স্মৃতি শক্তিও ছিল প্রখর। যিনি তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাকে পরাজিত করেছিলেন অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা দিয়ে। দৃষ্টিহীন হয়েও নিজের মেধা ও দক্ষতার গুণে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভালবাসা এবং নিষ্ঠা দেখে শশীভূষণ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে গান শেখাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই থেকে শুরু সঙ্গীত শিক্ষার।

এরপর তিনি উস্তাদ বদল খানের কাছে খেয়াল, দানী বাবুর কাছে ধ্রুপদ, রাধারমণের কাছে কীর্তন ও কণ্ঠে মহারাজের কাছে তবলা শেখেন। ১৯১৭ সালে গ্রামোফোন কোম্পানী তাঁর প্রথম রেকর্ড বের করে। সঙ্গীতের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। মূলত ক্লাসিক্যাল শিল্পী হলেও তিনি জনপ্রিয় কীর্তনিয়া ছিলেন। সেই সময় অসংখ্য কীর্তন বা কীর্তন অঙ্গের গান গেয়েছেন, লিখেছেন এবং সুরও করেছেন। “স্বপন যদি মধুর হয়”, “তোমার কাজল আঁখি”, “তুমি গো বহ্নি শিখা,” “মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান” এমন বহু কালজয়ী গান আজও লোকমুখে শোনা যায়। কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালী গানগুলোর পাশাপাশি তাঁর গাওয়া হিন্দী, উর্দু, গজলও ছিল বেশ জনপ্রিয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গানে ঠুমরী, দাদরা ও গজলের প্রচলন হয়। গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বেশ যত্নশীল ছিলেন। কবি হেমেন্দ্র কুমার রায়, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গান তিনি গেয়েছেন ও নিজেই সুর করেছেন। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের লেখা গানও তিনি গাইতেন।

সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি সুনিপুনভাবে মঞ্চ ও সিনেমাতে সমান দাপটে অভিনয় করেছেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিহীনতা কখনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। অপর প্রবাদপুরুষ শিশির ভাদুরির থিয়েটারে একের পর এক নাটক সফল হতে থাকে এই কৃষ্ণ চন্দ্রের সঙ্গীত ও অভিনয় গুণে। বাংলা থিয়েটারের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে ১৯৩১ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র নিজেই থিয়েটার কোম্পানি খোলেন। শিশির ভাদুরিও অভিনয় করেছিলেন তাঁর নতুন থিয়েটারে। সেই সময়ে থিয়েটার নিয়ে দারুণ ব্যস্ত তিনি। তার মাঝেই প্রস্তাব আসে সিনেমা জগত থেকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ১৯৩১ সালে প্রথম ‘টকি সিনেমা’য় দুটি গানে কণ্ঠ দেন। পরের বছর ১৯৩২ সালে নির্মিত ‘চণ্ডীদাস’ সিনেমায় নাম ভুমিকায় অভিনয় ও কণ্ঠদান করেন।

কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকাকালীন কৃষ্ণ চন্দ্র দে ১৯৪২ সালে মুম্বাই পাড়ি জমান। দৃষ্টিহীন ছিলেন তাই সহযোগী হিসাবে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল তার ভ্রাতুস্পুত্র পরবর্তীকালের আরেক কিংবদন্তী হয়ে উঠা সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে। যিনি ছিলেন কাকার যোগ্য সহযোগী শিষ্য। কাকাই তার সঙ্গীত গুরু ও প্রেরণার উৎস। এ কারণেই সঙ্গীত জীবনের শুরু থেকেই উপমহাদেশের খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞদের সান্নিধ্য এবং তাদের কাছে তালিম নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল মান্না দে’র। কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সম্মান জানাতেই নিজের পৌত্রিক নাম বাদ দিয়ে কাকার দেয়া ডাক নাম মান্নাতেই পরিচিত হন তিনি। কাকার হাত ধরেই প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মান্না দে। অপর কিংবদন্তী শচীন দেব বর্মন এর সঙ্গীতে হাতে খড়িও কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাতেই।

মুম্বাইতে অভিনয়ের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের হিন্দি ছবির অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরারোপ, সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ রফি, মুকেশ এবং কিশোর কুমার সহ অনেকেই গেয়েছেন সেসব গান। তবে সবচেয়ে বেশি গেয়েছেন মোহাম্মদ রফি। মুম্বাইয়ের সিনেমা জগতে তিনি পরিচিত কেসি দে নামে। ১৯৪৭ সালে বাংলা সিনেমা জগতে ফিরে এসে শুরু করেন সিনেমা প্রযোজনা। পরপর বেশ কয়েকটি সফল সিনেমার পর, ১৯৫৭ সালে ‘একতারা’ সিনেমায় অতিথি শিল্পী হিসাবে জীবনে শেষবারের মতো পর্দায় আবির্ভূত হন তিনি।

এই সময়ের আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী হলেন গৌরীকেদার ভট্টাচার্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে আকাশবাণীতে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। তাঁর কণ্ঠ ছিল সুরেলা, সুমিষ্ট। তাঁর বিষাদময় গায়কী আবেদন ছিল মনকাড়া ও মর্মভেদী। গৌরীকেদার জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পড়ইকড়া গ্রামে। তাঁর জন্মের কিছুকাল পরেই তাঁর পরিবার চিরস্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য বেনারস চলে যায়। শিশু গৌরীকেদার বেনারসেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন ধ্রুপদাচার্য হরিনারায়ন মুখপাধ্যায়ের কাছে। ১৯২০ এর দশকে গৌরীকেদারকে কোলকাতায় পাঠানো হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে গানে, পড়াশুনায় ছিলেন চরম অমনোযোগী। একদিন নিয়ম ভেঙ্গে স্কুলের মধ্যেই উচ্চস্বরে গান গাওয়ার জন্য তাঁকে রাজটিকেট করে দেয়া হয়। যে কারণে কিছুকালের জন্য তাঁর পক্ষে আর কোনও স্কুলে ভর্তি হওয়া সম্ভব ছিল না। গৌরীকেদার মনে মনে হয়তো তাই চাচ্ছিলেন। এরপর তিনি পুরো উদ্যমে গান বাজনায় মেতে ওঠেন। পাশাপাশি পেট চালানোর জন্য গানের টিউশনি করতেন। ১৯৩৩ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তিনি প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন। ১৯৩৭ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয়। এরপর থেকে একের পর এক রেকর্ড বের হতে থাকে। আর তাঁর জনপ্রিয়তাও বেড়েই চলে। তখন তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে, সেসময় তিনটি ভিন্ন নামে রেকর্ড বের করতেন। ‘গৌরীকেদার ভট্টাচার্য’ নামে আধুনিক গান, ‘সুকুমার ভট্টাচার্য’ নামে লোকগীতি ও ‘গোলাম কাদের’ নামে ইসলামী গান।

১৯৩৯ সালে গৌরীকেদার কলাম্বিয়া রেকর্ডসের সাথে ও পরে গ্রামোফোন কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। ১৯৪০ সালে তিনি ‘নিমাই সন্যাসি’ সিনেমায় অভিনয় ও কণ্ঠদান করেন। ১৯৪৯ সালে ২৬ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন। তারপর আরও ছয় বছর তিনি অনেক কালজয়ী বাংলা গান রেকর্ড করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি আচমকা গ্রামোফোন কোম্পানীর সাথে চুক্তি বাতিল করেন। মুলত এরপর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হন এবং হাতেগোনা ধর্মীয় সঙ্গীত ছাড়া বাকি জীবনে আর কিছু গাননি। ১৯৭৪ সালে তিনি সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন ও ‘মোহন্ত চন্দ্রশেখর গিরি’ নাম নেন।

গৌরীকেদার ভট্টাচার্যের গাওয়া কালজয়ী বাংলা গানগুলো হলো– ‘এনেছি আমার শত জনমের প্রেম’ (১৯৪৯), ‘সমাধিতে মোর ফুল ছড়াতে কে গো এলে’ (১৯৫১), ‘নাইবা হ’লো মিলন মোদের’ (১৯৪৫), ‘চাঁপা ভাবে বসি’ (১৯৪৯), ‘মোর হাতে ছিল বাঁশি’ (১৯৪৪), ‘নিও না গো অপরাধ’ (১৯৪৪), ‘কেন পিয়া পিয়া’ (১৯৪৯), ‘মোর ফেলে আসা পথে’ (১৯৫০), ‘মিলন-বিরহ হৃদি যমুনার’ (১৯৪৯), ‘কত মধুর রাতি এলো’ (১৯৫১), ‘তোমার এ মালা’ (১৯৫০), ‘আজি মিলন নিশি ভোরে’ (১৯৪৫), ‘সেই মধুরাতে আধখানা চাঁদ’ (১৯৪৮), ‘ভালবাসি আলেয়ারে’ (১৯৪৫), ‘কত গানের কুসুম ফুটে ওঠে গো’ (১৯৪৫), ‘নাইবা রাঙ্গিলো এ দুটি জীবন’ (১৯৫২), ‘যদি পথ চেয়ে’ (১৯৫১), ‘আমি আর প্রেম জেগে আছি’ (১৯৪৮), ‘এলো বাদল রিম ঝিম ঝিম’ (১৯৫৪), ‘পরদেশী গো যেওনা ফিরে’ (১৯৫১), ‘মোর জীবনের প্রেম ও প্রনাম’ (১৯৫২)।

চলবে

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা

আরও পড়ুন

বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কথা (পর্ব ১)

 

Similar Articles