You are here
নীড়পাতা > অন্য মাধ্যমে প্রকাশিত > সংবাদপত্র > ফিদেলকে লিখেছিলেন চে ‘তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম!’

ফিদেলকে লিখেছিলেন চে ‘তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম!’

সুজয় চক্রবর্তী
ফিদেল, সেই চিঠিটার কথা আপনার মনে আছে? বলিভিয়ার ভয়ঙ্কর জঙ্গল থেকে ’৬৫-র পয়লা এপ্রিলে লেখা।
আপনি তখন হাভানায়। আপনাকে সবুজ কালিতে লেখা বন্ধু চে গেভারার সেই চিঠিটি কি এখনও রাখা আছে আপনার জলপাই রঙা উর্দির বুক পকেটেই?
যেখানে চে লিখেছিলেন, ‘ইফ মাই ফাইনাল আওয়ার ফাইন্ডস মি আন্ডার আদার স্কাইজ, মাই লাস্ট থট উইল বি অফ দিস পিপ্ল অ্যান্ড এস্পেশ্যালি অফ ইউ।’ (আমার মৃত্যুটা যদি হয় অন্য কোনও দেশে, তা হলেও আমার শেষ চিন্তাটা থাকবে এই মানুষগুলিকে (কিউবার জনগণ) নিয়ে, বিশেষ করে তোমাকে নিয়েই।’
তখন কিন্তু সরকারি ভাষায়, যাকে বলে, ‘বন্ধুবিচ্ছেদ’টা হয়েই গিয়েছে ফিদেল কাস্ত্রো আর চে গেভারার! আর বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে লেখা সেই চিঠিতেই বন্ধু ফিদেলকে সরাসরি চে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’! মানে, তিনি আর থাকতে চান না কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির কোনও ‘সরকারি’ পদে। থাকতে চান না অত্যাচারী বাতিস্তা সরকারকে হটিয়ে গড়া বিপ্লবী সরকারের জাতীয় ভূমি সংস্কার প্রতিষ্ঠানের শিল্প দফতরের প্রধানের পদে। থাকতে চান না জাতীয় ব্যাংকের সভাপতি, শিল্প দফতরের মন্ত্রী।
একজনের বয়স ৪০। অন্য জনের ২৮। বিত্তশালী পরিবারে জন্ম নিয়ে এক জন হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়তে পড়তেই চলে আসেন কঠিন লড়াকু রাজনৈতিক জীবনে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অন্য জন পুরোদস্তুর মেধাবী ডাক্তার হয়েও লোভনীয় জীবনের যাবতীয় হাতছানিকে উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছিলেন জল-জঙ্গলের গেরিলা জীবন।
ফিদেল কাস্ত্রো আর চে গেভারা। বয়সের ব্যবধান ছিল যথেষ্টই। সামাজিক স্তরেও দু’জনের পরিবারের অবস্থানটা ছিল না এক জায়গায়। কিন্তু রণক্ষেত্রের বন্ধুত্বে চিড় ধরাতে পারেনি সে সব কিছুই।
ফিদেলকে সেই চিঠিতে সব কিছু (চে’র ভাষায়, মোহ!) ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে, চে লিখেছিলেন, ‘আজ তোমার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। মারিয়া আন্তোনিয়ার বাড়িতে তোমার সঙ্গে দেখা হল। আলাপ-পরিচয় হল। তুমি বললে, এসো, এক সঙ্গে লড়ি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ি। হাত বাড়িয়ে দিলে আমার দিকে। তারপর আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা হয়ে উঠল গাঢ় থেকে গাঢ়তর। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারি না। যেন আত্মার আত্মীয়! তখন আমাদের কোনও না কোনও কমরেডকে প্রায় প্রতিদিনই যেতে হচ্ছে লাস্ট ফ্রন্টিয়ারে (যুদ্ধে মৃত্যুই যেখানে অনিবার্য)! কে একজন যেন এসে বলল, আমাদের দু’জনের মধ্যে কাকে বেছে নেওয়া হবে, সেই বলির জন্য? আমি আগ বাড়িয়ে বলেছিলাম, আমার নামটাই লিখতে। চেয়েছিলাম, তুমি থাকো। এখন আমাদের সেই আবেগটা একটু কমেছে, কারণ আমরা আরও পরিণত হয়েছি। কিন্তু আবার সেই একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, নিজের ভূখ-ে কিউবার বিপ্লবে আমার যতটুকু করণীয় ছিল, আমি করেছি। করতে পেরেছি। এখন তোমার কাছ থেকে আমার বিদায় নেওয়ার পালা।…’

বন্ধুকে ছেড়ে ‘বিশ্ববিপ্লবে’র প্রয়োজনে অন্য ভূখ-ে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার মুখে ফিদেলকে লেখা সেই চিঠিতে চে লিখেছিলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে যা যা করার আমি তা করেছি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আমার সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি। মন্ত্রিত্ব ছেড়েছি। সেনাবাহিনীর কমান্ডার পদে ইস্তফা দিয়েছি। কিউবার নাগরিকত্ব ছেড়েছি। কোনও আইনই আর আমাকে কিউবায় বেঁধে রাখতে পারবে না। শুধু অদৃশ্য একটা বন্ধন… তোমার সঙ্গে আমাকে বোধহয় চিরদিনের জন্যই বেঁধে দিয়েছে। যা কখনও ভাঙা যায় না। ভাঙা যাবে না। কোনও দলীয় পদ বা সরকারি নিয়োগ দিয়ে যে বন্ধন টিঁকিয়ে রাখা কোনও দিনই সম্ভব নয়।’
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে করতে বন্ধু ফিদেল কতটা হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন সহযোদ্ধাদের, তাঁর সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ পৌঁছে গিয়েছিল কতটা গভীরে, তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার মুখে লেখা চিঠিতেও তা স্বীকার করতে কার্পণ্য ছিল না চে গেভারার। তাই ফিদেলের নেতৃত্ব সম্পর্কে যে তাঁর যে কিছুটা সন্দেহ, সংশয় ছিল, ছিল কিছু মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বও, সে কথাও ওই চিঠিতে অকপটেই বন্ধুকে জানিয়েছিলেন চে। লিখেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় ভুলটা ছিল সিয়েরা মায়েস্ত্রার জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধ চালানোর দিনগুলি থেকেই তোমার ওপর আমি তেমন করে ভরসাটা ধরে রাখতে পারিনি। খুব তাড়াতাড়ি বুঝে উঠতে পারিনি, নেতা ও বিপ্লবী হিসেবে তোমার গুণগুলিও। এখানে আমার কিছু গুরুতর খামতি ছিল।… বলতে লজ্জা নেই, তবে আমি সব সময়েই তোমাকে অনুসরণ করেছি। আর সেটা করার জন্য গর্ববোধ করেছি। আমি সেই অর্থে তোমার পথেরই পথিক ছিলাম।’
তবে কেন ফিদেলকে ছেড়ে গিয়েছিলেন চে গেভারা?
তার জবাবটাও আছে ’৬৫-র পয়লা এপ্রিল সবুজ কালিতে লেখা চে গেভারার সেই চিঠিতে। চে লিখেছিলেন, ‘আমাকে এখন অন্য দেশগুলি চাইছে (বিপ্লব সংগঠনের জন্য)। সেটা আমি কিউবায় থেকেই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তুমি তা মানতে চাইলে না! তাই আজ আমার তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। একমাত্র তুমিই ভাল করে জান, তাতে আমার যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনই দুঃখটাও কম হচ্ছে না। আমি অন্য দেশে বিপ্লব সংগঠনে যাচ্ছি বলে আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু এই কিউবার মানুষগুলিকে ছেড়ে যাচ্ছি বলে আমার দুঃখটাও কম হচ্ছে না। তবে নতুন যে যুদ্ধক্ষেত্রে (অন্য দেশে বিপ্লব সংগঠনে) যাচ্ছি, সেখানেও আমি সেই মতাদর্শকেই কাজে লাগাব, যা আমাকে তুমি শিখিয়েছিলে। আর সেখানেও আমি তোমার কথাই তুলে ধরব।’
আর তার পরেই বন্ধু ফিদেল সম্পর্কে চিঠিতে চে লিখে ফেলেছিলেন সেই লাইনগুলি, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে-ফেরে, ‘ইফ মাই ফাইনাল আওয়ার ফাইন্ডস মি আন্ডার আদার স্কাইজ, মাই লাস্ট থট উইল বি অফ দিস পিপ্ল অ্যান্ড এস্পেশ্যালি অফ ইউ।’ লিখেছিলেন, ‘তুমি আমাকে যা শিখিয়েছো, তার জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। আর সেটা আমি আমার শেষ সময় পর্যন্ত মনে রাখব। সেগুলিকে প্রয়োগ করব কার্যক্ষেত্রে।’
চে মার্কিন সেনাদের হাতে বলিভিয়ার জঙ্গলে প্রাণ হারিয়েছিলেন ’৬৭-র ৯ অক্টোবর। তার ৫০ বছরের মাথায় চলে গেলেন কাস্ত্রো। ২০১৬-র ২৬ নভেম্বর।
চে বলেছিলেন, কাস্ত্রোকে তিনি অনুসরণ করে চলবেন, আজীবন।
মৃত্যুতে সেই চে গেভারাকেই অনুসরণ করলেন কাস্ত্রো, ৫০ বছরের মাথায়!

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

Similar Articles

Leave a Reply