কবরী বিশ্বাস অপু

বাংলাদেশের উৎসব মানে আমার কাছে আনন্দ, উৎসব মানে সম্প্রীতি, উৎসব মানে সমৃদ্ধি। শারদীয় দূর্গোৎসব তারই অনন্য উদাহরণ। ছোটবেলার পূজা এবং এখনকার পূজা উদযাপন আমার কাছে অনেকাংশেই ভিন্ন। প্রথমে ছোটবেলার পূজা উদযাপন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ না করলে অপূর্ণতা রয়ে যাবে।

আমরা তিনভাইবোন, এককথায় স্কুল পাগলা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আমরা রওয়ানা হতাম স্কুল অভিমুখে। আমাদের কাছে ছুটি বলতে পূজা আর ঈদের ছুটিই বড় ছিল। পূজা আসার মাসখানেক আগে থেকেই বুঝা যেত যে পূজা নিকটে চলে এসেছে, মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা বানানোর ধুম। স্কুল থেকে ফিরে মায়ের কাছে রোজ জিজ্ঞাসা করতাম, “ও মা পূজা কবে? দশমী কবে?” আমাদের দুই বোনের বয়সের ব্যবধান কম, দুইবছরের কম। আর দাদা সবার বড়, বড় ছেলে। আমাদের দুই বোনকে একরকমের জামা কিনে দেয়া হত। ভীষণ আনন্দ লাগত একরকমের জামা পরতে। খুব ভোরে আমরা দুইবোন শিউলি ফুল কুড়াতাম দেবীর জন্য, সাথে তুলসি-বেল পাতা। সকালে আমরা স্নান করে নতুন জামা পরে যেতাম পূজা মন্ডপে। বাবার সাথে আমরা পূজা দেখতে যেতাম, পূজার মেলা থেকে খেলনা, পুতুল ইত্যাদি কিনে আনতাম। তবে আমার পুতুল চাই ই চাই। ছোটবেলার পুতুলগুলো আমার মা এখনো যত্নে তুলে রেখেছেন। পূজার সময় মায়ের ব্যস্ততা ছিল আরও। মা যেহেতু সরকারি চাকরিজীবী, সেহেতু মায়ের ছুটি একদিন, দেবী বিসর্জনের দিন। কিন্তু পূজা মানে অনেক আনুষ্ঠানিকতা, অনেক আয়োজন। ষষ্ঠীর আগেরদিনই মাকে হরেক রকম নাড়ু বানাতে হত, নাড়ু সংরক্ষণ করা হত পূজায় আগত অতিথিদের জন্য, পূজার সময় কেউ এসে নাড়ু লুচি মিষ্টি না খেয়ে চলে যাবে এটা হতেই পারেনা। আমরা মায়ের সাথে অঞ্জলি দিতাম দশমীর দিনে। পূজা শেষে আরো ব্যস্ততা ছিল মায়ের, পূজাকালীন নিরামিষ শেষে আমিষসহ বিভিন্নরকম রান্নার আয়োজন করা হত, আত্মীয় স্বজনদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা যেত। তারপরও জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একসাথে আনন্দ ভাগাভাগিটাই বোধহয় বাংলাদেশের উৎসবের সার্থকতা।

ছোটবেলা বেশ আগে যদিও পেরিয়ে এসেছি, সময় বদলেছে অনেক, বদলেছে প্রেক্ষাপটও, কিন্তু বাঙালি উৎসব আনন্দ কোন অংশে মলিন হয়নি। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি, তার আগে আমার পূজা উদযাপনের কথা বলে নিই। ২০০৭ সালে কলেজ জীবন থেকেই আমি বাড়ির বাইরে, তথা আমার হোস্টেল জীবন শুরু। তখন বড় ছুটি দুটো ঈদ আর পূজা, কখনো কখনো পূজা ঈদ একসময়ে হত, ওটা বেশি মজার ছিল, কারণ বাড়িতে ফিরে ছোটবেলার সকল বন্ধুদের সাথে দেখা হত। হোস্টেলে থাকার পর থেকে পূজার ছুটিটা আমার বেশ আনন্দের ছিল, সত্যি কথা বলতে পূজার ছুটি যতটা না আনন্দের ছিল, তারচে বেশি আনন্দ লাগত দীর্ঘসময় পরে হোস্টেল থেকে বাড়িতে আসতে পারছি তাই। আমার পূজা হোস্টেল থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া থেকে শুরু হত, তার মানে পূজার যে পাঁচদিন, তার থেকে বেশিদিন আমার উচ্ছ্বাস, আনন্দ কাজ করত। তারপর বাড়িতে এসে একই চিত্র আমার মায়ের, সেই নাড়ু বানানো, রান্না-বান্না, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশিদের আগমন, ভাইবোনদের পূজাতে ঘুরতে যাওয়া, বিশাল এক আনন্দযজ্ঞ শেষে আবার আমার হোস্টেলে ফিরে যাওয়া। এরপর একটু একটু করে সময় গড়িয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পণ, আরো একটা নতুন হোস্টেল জীবন শুরু। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন একদমই অন্যরকম। পূজার প্রথম এক দুইদিন বন্ধুরা জুনিয়র সিনিয়ররা মিলে শহরের পূজা দেখতাম, সারাশহর আলোকসজ্জিত, অন্যরকম আবহের সৃষ্টি হত। তারপর আবার সবাই যার যার নিজস্ব শহরে ফিরে যেত বাবা মায়ের সাথে পূজা উদযাপন করতে।

বিশ্ববিদ্যালয় পার করার পরের জীবন আমার একদমই আলাদা। দেশ ছেড়ে আমি নিজেও বেশ একা হয়ে পড়েছি, নতুন পরিবেশ, দেশ বিদেশের নতুন বন্ধু পরিজন, আবারও হোস্টেল জীবন। এখনকার সময় গুলো আমার গতসময়ের থেকে ভিন্ন। শরৎকাল অন্যরকম শুভ্রতা নিয়ে আসে, আকাশে সাদামেঘের ভেলায় মন ভেসে যেতে চায়, রাতের শিশির, শিউলি ফুলের উপর টুপটাপ ঝরে পড়ে, পূজার আগাম সাজসজ্জা মনের মধ্যে দোলা দিতে থাকে কাশফুলের মত করে। দেবীর আগমনকে মনে করিয়ে দেয় শরতের উচ্ছ্বলতা। দেশে ফেরার জন্য মন আনচান করতে থাকে। বলে রাখা ভাল, আমি এখন পড়াশোনা করছি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতনে। আমার কাছে বাংলাদেশে আসাটাই এখন পূজার আনন্দ। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, কলকাতার পূজা দেখতে সকলে ওখানে যায়, আমি কেন বাংলাদেশে ফিরে আসি? আমি বলি বাংলাদেশই আমার কাছে সবচে বড় পূজার নিদর্শন। এখানে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে উৎসব উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম দিক।

গতানুগতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও পূজা শুরু আগে পূজার আনন্দ নিয়ে এসেছি পূণ্যভূমিতে, যেকারণে অতীতের যেকোন সময় থেকে আনন্দ আমার বাঁধভাঙ্গা, পূজাও দেখছি প্রাণভরে। আমাদের উপজেলাতে পূজা হচ্ছে ৭১টি মন্ডপে, সবগুলো দেখা হয়ত সম্ভব হবেনা। তারপরও পূজার আনন্দ সীমাকে ছাড়িয়ে যাবে আশা রাখি। দেখা হচ্ছে, পুরোনো বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি সকলের সাথে, এর থেকে আর আনন্দ কি হতে পারে। দেখা হয়েছে, আমাদের ভাইবোনদের সাথে, সেই ছোটবেলা পেরিয়ে এসেছি ঠিকই কিন্তু আমি যেন সেই ছোট রয়ে গেছি, আমার আর দিদির এখন এক জামা পরা হয়না ঠিকই, কিন্তু এখন দিদিই আমাকে নতুন জামা কিনে দেয়, সাথে যুক্ত হয়েছে শাড়ি। দেবী দুর্গার আরতি শেষে প্রত্যাশা, দুর্গতি দূর হোক সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে। ভ্রাতৃত্ব এবং সম্প্রীতি চির অব্যাহত থাক বাংলাদেশের বুক জুড়ে। দেবী দূর্গার আশীর্বাদ বর্ষিত হোক পৃথিবীতে। শারদীয়া শুভেচ্ছা।

কবরী বিশ্বাস অপু; বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তি নিকেতন।

Similar Articles

Leave a Reply