You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > পিশাচ পুরুষ

পিশাচ পুরুষ

আশিক রাহমান

ওকে যখন আমি প্রথম দেখি ও তখন সুইট সিক্সটিন। কেবল স্কুল ড্রেস ছেড়ে সদ্য কিশোরী থেকে যুবতী হওয়ার পথে। মেঘের মত ঘন চুল গুলো মেলে কপালে সানগ্লাস তুলে হাই হিলে হেঁটে চলা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী একটা মেয়ে। ওর আড় চোখে তাকানো, রহস্যময়ী মুচকি হাসি, যেন খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসা সাত আসমানের পরী।

আমি অনেকটা কেবলাকান্তের মত ওর পেছনে ছুটে বেড়াতাম। রোজ দুপুরে ওর ছাদে ওঠার অপেক্ষা করতাম, ভেজা চুলে ও কাপড় নাড়ত আর আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম।

ওকে প্রপোজ করা,আমাকে ফিরিয়ে দেয়ার পর আবার রাজি হওয়া, ফোনে ফিসফাস করে কথা বলা সব কিছুই ছিল আমার কাছে এভারেস্ট জয়ী হওয়ার মতন। সেই জয়টাই আমাকে একদম বদলে দিল। আমায় জয়ের নেশায় পেয়ে বসলো। বার বার আমি জয়ী হতে চাইলাম।

ও ভাল গান গাইত। আমার মনে হলো ও গান গাইলে সবাই ওকে পছন্দ করবে। ওর চারপাশে এত মানুষ পেয়ে যদি ও আমায় ভুলে যায়? তাই আমার ভালবাসার প্রথম শর্ত ছিল তুমি আর গান গাইবা না। ও খুব সহজেই হেরে গিয়েছিল। আমাকে জয়ী করতে ও গান গাওয়া ছেড়ে দেয়।

ওর সাঁজতে খুব ভাল লাগতো। সবাইকে সাঁজ মানায় না, ওকে মানাত! সামান্য চোখের কাজলটাও ও এত যত্ন করে দিত, দু চোখের পুরো মায়াটা যেন ওর কাজলে দেখা যেত। আমার মনে হলো ও এত সাঁজবে কেন! ও সেঁজে গুজে বাইরে যাবে আর সবাই হা করে তাকিয়ে থাকবে! আমার সহ্য হলোনা আমি ওকে বোরখা পড়ালাম। নিশ্চিত হলাম আমি ছাড়া ওকে আর কেউ দেখবেনা।

জানেন এই ব্যাপার গুলায় ও কখনোই কষ্ট পেতনা বরং খুশি হত এই ভেবে আমি অধিকার খাটাচ্ছি, ওর যত্ন নিচ্ছি।

ও প্রথম কষ্ট পেয়েছিল আমাদের বিয়ের পর। ও সায়েন্সের ছাত্রী ছিল। ইচ্ছা ছিল বড় ডাক্তার হবে। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম বিয়ের পর ওড় পড়া বন্ধ হবেনা। আমি, আমার পুরো পরিবার ওকে সাপোর্ট দিব। কিন্তু কি করে দেই বলেন? ও যদি ডাক্তার হয়ে আমায় ছেড়ে চলে যায়! অথবা আমাকে মূল্য না দেয়? আমি ওর পড়া শোনা বন্ধ করে দেই।

ও সারাদিন ঘরে থাকে আর আমি অফিসে। আমার দুশ্চিন্তা হত ও যদি এই সময়ে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক করে অথবা কথা বলে!

ওর বয়স তখন একুশ। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় স্বাস্থ্য তেমন ভাল ছিলনা। তাছাড়া নতুন সংসার নতুন পরিবেশে ওর মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল তাই ডাক্তার বলেছিল এখন বাচ্চা নেয়াটা উচিত হবেনা। কিন্তু আমার মনে যে ভয়! একটা বাচ্চা হয়ে গেলে ওর সময় ভাল কাটবে। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় পাবেনা।

আমরা বাচ্চা নেই। ঝুঁকি পূর্ন স্বাস্থ্যে বাচ্চা নেয়ায় ওর শরীর ভেঙে পড়ে। এখন ওকে দেখলে আমি আর চিনতে পারিনা। সাত আসমানের পরী সেই মেয়েটার মুখটা এখন ফ্যাকাসে লাগে। রোগা পাতলা শরীরে যেন বয়সের ছাপ পড়ে গেছে!

আজ আমার নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। মনে হয় মুক্ত আকাশে ভেসে বেড়ানো একটা পাখি আমার ঘরে বাসা বেঁধেছিল আর আমি নিজ হাতে সেই পাখিটার ডানা টেনে ছিড়ে ফেলেছি। চোখের সামনে পাখিটার ছটফটানি দেখেছি আত্মচিৎকার শুনে মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছি। নিজেকে আমার এখন পিশাচ মনে হয়। আমি একটা পিশাচ পুরুষ, যে নিজেকে ভাল রাখতে একটা মেয়েকে আমার খেলার পুতুল বানিয়েছি।

শেষ করার আগে বরাবরের মত কিছু কথা…

ছেলেটার ঘরে মন নেই।
একটা বিয়ে করিয়ে দাও সব ঠিক হয়ে যাবে।
ছেলেটা বিয়ের পরেও তো বদলালো না।
একটা বাচ্চা নিয়ে নাও ঠিক হয়ে যাবে।

একটা ছেলেকে ঠিক করতে একটা পরিবার, একটা সমাজ একটা মেয়েকে একটু একটু করে নিঃশেষ করে দেয়। তোমরা মেয়েরা ঠিক করো তোমাদের জন্ম কি সমাজের বলি হওয়ার জন্য?

যদি তা না হও আগে পড়াশুনাটা শেষ করো নিজের ক্যারিয়ারটা গোছাও। তারপর বিয়ে করো সংসার করো। গ্যারান্টি দিচ্ছি কারো দাসী হয়ে থাকতে হবেনা। আজীবনেও স্বামী বা শ্বশুর-শাশুড়ির কদরের কমতি হবেনা। বরং যদি নিজেকে শেষ করে তাদের সুখী করতে যাও, একদিন দেখবা তুমি আছ কিন্তু তোমার কোন মূল্য এই সংসারে নাই…এ সমাজে নাই…এই পৃথিবীতে নাই।

 

Similar Articles

Leave a Reply