You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > নিজ দেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করা সবচেয়ে দুঃখজনক

নিজ দেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করা সবচেয়ে দুঃখজনক

টুম্পা ধর

এদেশের মুসলমানদের তুলনায় সংখ্যায় কম, এমন সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশেষ করে হিন্দুরা এখন সম্পূর্ণভাবে চক্রান্তের বলয়ে আটকা পড়েছে। যদিও সংখ্যায় কম এমন সম্প্রদায় বোঝাতে দেশে একটা শব্দ ভাতের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। শব্দটি হলো, ‘সংখ্যালঘু’। আমার কাছে যেটি জঘন্য গালির মত শোনায়। মানুষের পরিচয় আবার সংখ্যা দিয়ে হয় নাকি! তারপর আছে প্রায় সাত-আট দশক ধরে চলে আসা বিষাক্ত গালিচর্চা। মালাউন, আকাটা, ডেডাইয়ার মতন অশ্রাব্য শব্দগুলো কিভাবে মেনে নেয়া যায়?

বাংলাদেশে হিন্দুদের বাড়িঘর পোড়ানো হচ্ছে, প্রতিমা ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে, গ্রামে হিন্দু পাড়াগুলোতে নানাভাবে ছড়ানো হচ্ছে আতঙ্ক। হিন্দু মেয়েরা পরিকল্পনামাফিক ধর্ষিত হচ্ছে, নির্বিচারে হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে, ফুসলিয়ে বা জোর করে বিয়ের নামে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে হিন্দু ছেলে-মেয়েদের। কারণ তাদের অপরাধ একটাই যে তারা হিন্দু। যে অপরাধে তথাকথিত ‘সংখ্যাগুরু’র প্রশাসনও তাদের মন থেকে সহায়তা দিতে, বাঁচাতে পারছে না। এ দেশ থেকে, দেশের মাটি থেকে হিন্দু তাড়ানোর এগুলো আসলে বিশেষ কিছু কৌশল মাত্র। তবে এই ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে হিন্দুরা নিজেরাও কম দায়ী নয়। বাংলাদেশে এখনও হিন্দুদের মাঝেই যৌতুক প্রথা প্রবল। নিজেদের মধ্যে নেই তেমন কোনো পারস্পরিক ঐক্য। যদিও এটা এখন বাংলাদেশি সব মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। হিন্দু নারীদের নেই কোনো বিবাহ ও উত্তরাধীকার আইন। হিন্দুরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। আক্রমন-চক্রান্তকারী মুসলমানরাতো আছেই, হিন্দুরা নিজেরাই অনেকাংশে তাদের ওপর এই নির্যাতনের জন্য দায়ী। সমাজ সংস্কার ও সম্পৃতির জন্য অঞ্চলে অঞ্চলে, মানুষে মানুষে সংগঠন হয়। কিন্তু মুসলমানদের ভেতরে যেমন মৌলভী-মোল্লাদের দল আছে- ঠিক তেমনি হিন্দুদেরও আছে পুরোহিতের দল। এখন আবার নতুন করে পাখা গজাচ্ছে কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ ইস্কন। কিন্তু এইসব ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো নিছক পূজা-অর্চনা ছাড়া আজ পর্যন্ত সাধারণ হিন্দুদের সামাজিক উন্নয়নের কোনো কাজে এসেছে বলে আমার মনে হয় না। জন্ম থেকেই দেখে আর শুনে আসছি হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের কথা। কিন্তু কখনো শুনিনি কোনো হিন্দুকে দলবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে কাজ করতে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজেদের মধ্যে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। কিংবা সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার সাথে একাত্ম হয়ে প্রত্যাশিত অসাম্প্রদায়িকতা তৈরিতেও তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। আর রাজনৈতিক-মৌলবাদী অপশক্তিরা তো আছেই। বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ২৮ থেকে ৮ ভাগে নেমে এসেছে। কেন? এর কারণ ধরা হয় দেশ ত্যাগ, নির্যাতন, বিবাহ জনিত অভিবাসন, ধর্মান্তর ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যদি সত্যি মেনে থাকি এ দেশ, দেশের মাটি আমাদের মা তাহলে কেন এভাবে দেশ ত্যাগ, কেন মুখ বুজে সব সহ্য করা? মুসলমানদের উস্কানি আর অত্যাচার যতটা বাড়তে থাকে বাড়ুক, নির্যাতন যতটা চলতে থাকে চলুক। কিন্তু কোনো ভাবেই এই দেশ ছেড়ে, নিজের ভিটেমাটি আর শেকড় ছেড়ে যাওয়া যাবে না। অসাম্প্রদায়িক সামাজিকতার এই দেশে একটাই বিষয় সামনে আনতে হবে- এদেশ যতটা মুসলিমদের ততটাই হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের।

এদেশ বাঙালির। হিন্দুদের এরকম ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে বের হতেই হবে। কেন ভয় পাবে হিন্দুরা? দেশভাগের ভয় ও তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে, শত অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে যে সম্প্রদায়ের মানুষ মাটির টানকেই শ্রেয় মনে করে এ মাটিতে থেকে গেছে, তারা তো ছোট নয়! তাদের দেশপ্রেম তো ফেলনা নয়! অনেকেরই ধারণা হিন্দুরা ভারতের দালাল। এখানে প্রশ্ন ছুঁড়তে হয়, তাহলে রোহিঙ্গারা কি বাংলাদেশের দালাল? রোহিঙ্গারা যে কারণে আশ্রয়ের খোঁজে এই বাংলায় প্রবেশ করেছে, ঠিক একই কারনে হিন্দুরাও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বা এখনো নিচ্ছে। কোনো রোহিঙ্গা যেমন বলবেন না তারা মায়ানমার থেকে এই বাংলাদেশকে ভালোবেসে চলে এসেছেন, তেমনি দেশ ত্যাগ করা হিন্দুরাও ভারতকে ভালোবেসে এই দেশ ত্যাগ করেন না। তারা তাদের নাড়ি ছিঁড়ে, আত্মার শেকড়কে ছিন্ন করে তবেই দেশ ছেড়ে পালান বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। সেই ৪৭ এর দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে যে হানাহানি শুরু হয়েছিল সেই বিভীষিকা থেকে বাংলাদেশের হিন্দুরা আজও বেরিয়ে আসতে পারেনি। হিন্দুদের বোঝা উচিত অধিকার কেউ কাউকে এমনি এমনি দিয়ে দেয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ না মাত্র পাঁচ বছরেই হিন্দু বলে এই বাংলায় কিছু থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। মন্ত্রী পরিষদে কি হিন্দু নেতা একজনও নেই? থাকলে তারা কোথায়? সারা দেশে যত হিন্দু সংগঠন আছে সেগুলোকে শুধুমাত্র দেখা যায় পূজার সময়। আর হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে এসব সংগঠনের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। সারা বছর এরা থাকে কোথায়? কেনো তারা হিন্দুদের সুস্থ্য সুন্দর জীবন আর জোরদার নিরাপত্তার অধিকার আদায়ের বিষয়টি মাথায় রেখে কোনো আন্দোলনে নামে না! এদের অনেকে নিজেরাই তো নিজেদের ছেলে মেয়েদেরকে এখনও পন দিয়ে এবং নিয়ে বিয়ের কাজ সারেন, তাহলে তারা কী কল্যান করবে? তারা নিজেরাই দুই দেশে দুই পা দিয়ে রাখেন আর লেকচার ছাড়েন এই দেশে আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এটা কোনো যুক্তিই হতে পারে না, এই নিরাপত্তাহীনতাকে মেনে নেয়া যায় না। নিজের দেশে নিজের মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করার চেয়ে দুঃখজনক অার কী হতে পারে? আর পুরোহিতের দল বা ইস্কন নামে যারা আছেন তারা তো কেবল স্বর্গ অার পূন্যলাভের টিকিট বিলি নিয়েই ব্যস্ত। কোনো হিন্দু আমাকে বলেন আমাদের পুরোহিতরা আমাদের বর্ণবাদ ছাড়া আর কি শিখিয়েছেন? আর ভগবান কৃষ্ণভক্ত ইস্কন মাছের পাত্র অার পেঁয়াজ-রসুন থেকে নিজেদেরকে আলাদা করা ছাড়া আর কী শেখাচ্ছে? দুর্বলকে সবাই টুটি চেপে ধরতে চায়। বর্তমানে হিন্দুদের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। এক ডাকে যদি এতো এতো মুসলমান ঘর ছেড়ে একত্রিত হতে পারে তাহলে হিন্দুরা কেন হাজার দুঃখের হাহাকারে ঘরের কোনেই বসে থাকে। একটা কথা শোনেন হিন্দু ভাই ও বোনেরা দেশ ত্যাগ করে দেশ প্রেমিক হওয়া যায় না। দেশপ্রমিক হতে হলে বুকের পাটা লাগে।

Similar Articles

Leave a Reply