You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ‘নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা…’

‘নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা…’

ফেরদৌসি বিকন

নজরুল তাঁর ‘নারী’ কবিতায় ছন্দে ছন্দে নরনারীর মিলনে নারীর উষ্ণ, বর্ধিষ্ণু প্রেমের উদ্দীপ্ত, মোহনিয়া ভাবটি ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে-

নারীর বিরহে, নারীর মিলনে,
নর পেল কবি-প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা,
শব্দ হইল গান।
দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস,
নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে,
নারী যোগায়েছে মধু।
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা,
সুধায় ক্ষুধায় মিলে,
জন্ম লভিছে মহামানবের
মহাশিশু তিলে তিলে!’

বিদ্রোহী কবির ভাবে এই সুরই স্পষ্ট হয়ে বেজে উঠে যে, সাংসারিক প্রেম এবং ভালোবাসার বন্ধন পরিত্যাগ করে বৈরাগ্যের সাধনায় ব্রতী হওয়ায় নরনারীর মুক্তি নয়। অন্যথায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতা, গান এবং লেখনীর মধ্য দিয়ে নানাভাবে এই সত্যকেই স্পষ্টতর করে তুলতে চেয়েছিলেন যে, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য এবং মায়া মমতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে জীবনের একাকীত্বের মধ্যে মানুষের মুক্তি নেই। নারী এবং পুরুষ একে অপরের জন্যই তৈরি সম্পুর্ণ ভিন্ন দুই সত্ত্বা। এই দুই ভিন্ন সত্ত্বার একক বন্ধনের মধ্যে দিয়েই মানুষের মুক্তি, জগতের সমৃদ্ধি লাভ। রবীন্দ্রনাথের সেই আধ্যাত্মলোক প্রেমে ঘুরেফিরে এই একই আভাসই পাই আমরা-
এক কহে আরেকটি একা কই?
শুভযোগে কবে হব দুহুঁ হায়!!

এই দুই মহাপুরুষ কি অসাধারণ মহিমায় মহিমাময় করেছিলেন নরনারীরর এই যোগাযোগকে!

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি যে, আধুনিক সমাজে আজ ‘নারী স্বাধীনতা এবং সম-অধিকার’ এই বিষয় দুটোর নকশাটা এমনভাবে মানুষের মগজে আঁকা হয়েছে যে, শব্দ দুটো শোনার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পুরুষের অত্যাচারের এবং আধিপত্যের একটা দৃশ্য মনের পর্দায় ঝলসে ওঠে। ফলে বেশীরভাগ স্বাধীনচেতা নারীই যখন নিজের স্বাধীনতার খোঁজে তাঁর স্বাভাবিক জীবন-যাপন এবং সামাজিক রীতিনীতির বাইরে পা রাখেন, কারণে অকারণে পুরুষই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম এবং প্রধান ঘৃণার পাত্র এবং দ্বিতীয় লক্ষ্য হয়ে ওঠে সেই সব নারীরা যারা পুরুষদের অধীনে থাকেন। এতে কেবল তাঁদের নিজের ভিতরটাই তিলে তিলে বিষিয়ে ওঠে। কোন কোন অতি সাধারণ নারী হয়তো স্বামীকে ভালোবেসেই তাঁর পছন্দমত চলেন। এতে যদি তাঁর জীবনে সুখ, শান্তি এবং নিরাপত্তা আসে তাতে ক্ষতি কী? স্বাধীনতার সাথে দায়িত্ববোধ জড়িত আর খুব কম মেয়েরাই সে দায়িত্বের ভার বহন করতে জানেন। শুধু নারী বলেই যে সে দুর্বল তা নয়। একজন পুরুষকেও যদি একা ঘর সংসার, সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয় তিনিও হয়ে পড়বেন দুর্বল, মনের দিক থেকে অসহায়। সংসারের মুল সূত্রইতো এই হওয়া চাই যে, দুজন মানুষ নিঃসঙ্গতার প্রাচীর ডিঙিয়ে, সংসারে দুজনের অস্তিত্ব বজায় রেখেই একে অপরের কাছের মানুষ হয়ে থাকবেন। নারী তাঁর প্রেম, ভালোবাসা আর মানবিকতাকে লালন করেন আপন গর্ভে। তাই কোন পুরুষের চোখ যদি নারীর ওড়না ভেদ করে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে, তাতে অস্থিরতা তাঁর নিজেরই, নারীর তাতে কিছু যায় আসে না। নারীর শরীর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এটাই স্বাভাবিক। সে আকর্ষণ থেকে কোন পুরুষ লিখে কবিতা, আবার কেউ লিখে চটি। তাই বলে এই দুই জাতের পুরুষকে কি এক করা যায়? নাকি দ্বিতীয় শ্রেণীর ওইসব রুচিহীন, বিকৃত পুরুষদের জন্য প্রথম শ্রেণীর পুরুষদের উপেক্ষা করা যায়?
এসময়ের নারীকে ঘরে এবং বাইরে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয় যে, পুরুষ মানেই নির্যাতক, শোষক। পুরুষ মানেই অবিশ্বস্ত, নিয়ন্ত্রক, ব্যবহারকারী ইত্যাদি, ইত্যাদি। আজকাল এই বিশেষণগুলো পুরুষের ক্ষেত্রেই বোধহয় নির্বিচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক ভোগবাদী সমাজে তথা সমস্ত পৃথিবীজোড়া নারী পুরুষের সম্পর্কের কাঠামোটাই যেন এমনভাবে গড়ে উঠছে যে নারী মানেই নির্যাতিতা আর পুরুষ মানেই নির্যাতক। অথচ নির্যাতক পুরুষ যেমন আছে, নির্যাতক নারীও আছে। আমরা মনে করি নির্যাতন মানে কেবল শারীরিক নির্যাতন। কারণ শারীরিক নির্যাতন দেখা যায়। পুরুষ তাঁর পুরুষত্বের অহংবোধ রক্ষার্থে নীরবে সব সহ্য করে, আড়াল করে যায় বলেই হয়তো তাঁর সকল কষ্ট-ক্ষরণ অব্যক্ত, তাঁর সব ব্যথা অসহনীয় থেকে যায়। তাই বোধহয় ‘হিরো’ শব্দটা কেবল পুরুষকেই সাজে।

প্রত্যেক নারীর জীবনেই যে পুরুষ কেন্দ্রিক সব অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হবে তা কিন্তু মোটেও না। কিন্তু প্রত্যেক নারী যদি তাঁর এক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে গোটা পুরুষ জাতিকে সংজ্ঞায়িত করে তাহলে সে বিচার কেবল ভুলই নয়, অন্যায়, পুরুষের প্রতি অবিচার হবে। আমাদের সমাজের স্ত্রী পুরুষের সম্পর্ক যতটা না ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁর চাইতে বেশী পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ধর্মীয় পর্যায়ে। পশ্চিমা সমাজে একজন নারীর সাথে একজন পুরুষের শরীরের বা বিছানার যে যোগাযোগ আমাদের সমাজে সে যোগাযোগ পারিবারিক বন্ধনের, মুল্যবোধের, সংস্কারের। সুতরাং আমাদের সমাজের পুরুষ যদি মেয়েদের দমন করেই থাকে তাহলে বুঝতে হবে তা কেবল তাঁর পুরুষালী স্বভাবের কারণে নয়। বাঙালি পুরুষের দ্বিধান্বিত এ কারণে যে, যোগ্যতার এবং স্বাধীনতার সঠিক মূল্যায়ন এবং শব্দ ব্যবহার করার মতো মানসিক অবস্থা আমাদের সমাজের এবং আমাদের মেয়েদের, এই দু’য়ের কারোর মধ্যেই এখনো গড়ে ওঠেনি। আর যেসব নারীর সে মানসিকতা হয়েছে অথবা সে যোগ্যতা আছে তাঁরা কখনোই অধিকারের জন্য অভিযোগ করে না। তাঁরা জানেন যোগ্যতাকে যোগ্যতা দিয়েই অধিকার করে নিতে হয়। এমন অনেক নারী কেবল পুরুষকে কেন, খোদ দেশ শাসনে নিয়োজিত আছেন। আর এও সত্যি যে, এদের প্রায় কাউকেই এই কঠিন দায়িত্বভার বহন করতে স্বামী সন্তান হিল্লা করে দিতে হয়নি। হোক সে সংসারে অথবা কর্মক্ষেত্রে- অস্থিরতা, রাগ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ দিয়ে আধিপত্য স্থাপন করা যায় না। তাঁর জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম, ধৈর্য, ত্যাগ, নিষ্ঠা, যোগ্যতাবল আর আত্মসম্মানবোধের। সবকিছুর উর্ধ্বে সাহস আর শিক্ষাতো আছেই। এর কোনটাই বাহ্যিক কোন শক্তি দিয়ে আহরণযোগ্য নয়। কেবল ভিতরের শক্তি দিয়ে অর্জন করে নিতে হয়। এই শক্তি থাকলে নিজের সংস্কার এবং মুল্যবোধকে বাঁচিয়ে রেখেই আমাদের সমাজের তথা সমগ্র পৃথিবীর নারীর পক্ষেই স্বাধীনতার বিভ্রান্তিকর পথ পরিত্যাগ করে উচ্চতর স্বাধীন জীবনের পথে উন্নিত হওয়া খুব একটা কঠিন কোন ব্যাপার নয়।

আধুনিক তথা পশ্চিমা নারীবাদ বা ফ্যামিনিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, বিভ্রান্তিকর স্বাধীনতায় বিভ্রান্ত এই পশ্চিমা সমাজ খুব সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আমরা যদি এমন ভাবি, তাহলে অনেকটা ভুল ভাবাই হবে। বৃটেনের জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী ব্রিটিশ পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীর চাইতে চার শতাংশক বেশী। নারী না হয় তাদের জীবনের বিফলতা, অশান্তির জন্য পুরুষকে দায়ী করে। কিন্তু পুরুষ নিজেকে সিংহ ভাবে। সিংহ যেমন বনের রাজা, পুরুষও নিজেকে রাজাই ভাবে। হেরে গেলে রাজা কাকে দায়ী করবে? এই কথাই বললেন প্রফেসর গ্রীণ নামে একজন ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী, ‘বিফল হলে ছেলেরা খুব একা। পুরুষত্ব সহজ ব্যাপার নয়।’ উন্নত দেশ হলেও ব্রিটেনে পুরুষদের আত্মহত্যার হার গত এক দশকে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ, অসহায় অবস্থায় পড়ে পুরুষেরা কারো সহযোগিতা নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে তারা আত্মহননের পথ বেছে নেন। বিশেষজ্ঞরা আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার জন্য অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেকারত্বকে দায়ী করলেও গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তরঙ্গ সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের অভাব এবং তালাক আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে কিছু বিকৃত পশ্চিমা নারীবাদী আজ পৃথিবীব্যাপী নারীর মস্তিষ্কে মিডিয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা এই ধারণা বদ্ধমূল করে দিয়েছে যে তারা অর্থাৎ বর্তমান যুগের নারী পুরুষের দ্বারা প্রতারিত এবং অবহেলিত। নারী তাঁর নিজের এবং তাঁর সন্তানের সফল ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবার জন্য একাই যথেষ্ট। সুক্ষ্মভাবে দেখলে মনে হবে এই সমাজের মুল উদ্দেশ্য যেন পরিবার থেকে বাবার অস্তিত্ব নির্মুল করে মাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রলোভন দেখিয়ে ভোগবিলাসের দাসী করে তোলা। গবেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে নারীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষন্নতাজনিত মানসিক সমস্যার হার ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। ক্যারিয়ার সচেতনতা, অসংখ্য সঙ্গীর সাথে অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি কারণে ইদানিং মেয়েরা সন্তান এবং সংসারের বন্ধনে জড়াতে চায় না। ফলে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর তাদের জীবনে একাকিত্ব গ্রাস করে তুলছে, জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ছে। নারী পুরুষের জীবনে একের প্রতি অন্যের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। পুরুষ নির্মূল হয়ে আসছে নারীর জীবন থেকে। নারীকে বারবার স্বরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে পুরুষের কারণেই আজ তারা জীবন সংগ্রামে পিছিয়ে পড়ছে। এমনকি চাকরির বাজারে ও তাঁর আয় পুরুষের তুলনায় কম। অথচ বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা গেছে পৃথিবীব্যাপী পুরুষ নারীর চাইতে অধিক ঘন্টা কাজ করে বলেই বেশি আয় করে। শুধু তাই নয়, মেয়েরা সাধারণত কম ঝুঁকিপূর্ণ, হোয়াইট কালার কাজের সাথেই জড়িত থাকে, অন্যদিকে ছেলেরা কঠিন, দক্ষতাসম্পন্ন, ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সাথে জড়িত। বাস্তবভাবে পরিলক্ষিত হয় কেন আইটি, কন্সট্রাকশন, মিলিটারি, ট্রাক/ লরি ড্রাইভার, প্লামার, কার্পেন্টার, মাইনিং, লগিং, সেনিটেশন ইত্যাদি পেশাগুলোতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশী। কারণ এটা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে মেয়েরা যেখানে পুরুষের চাইতে কম ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে এবং ঝুঁকিহীন, এম্পাথিক পেশা বেছে নে,য় ছেলেরা সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এবং টেকনিক্যাল পেশা বেছে নেয়। বিজ্ঞানীরা নারী এবং পুরুষের আই কিউ পরীক্ষা করে প্রমাণ করেন যে, মেয়েদের আই কিউ সবসময় নরমাল ডিস্ট্রিবিউশনের ‘মিন’ অর্থাৎ এভারেজ এর কাছাকাছি অবস্থান করে। আর পুরুষের আই কিউ নরমাল ডিস্ট্রিবিউশন এর প্রথম অথবা শেষ প্রান্তে অবস্থান করে। আমরা যারা পরিসংখ্যান বুঝি তাদের কারো পক্ষেই বোঝা তেমন কঠিন নয় যে কেন যুগ যুগ ধরে উচ্চ মেধা সম্পন্ন দার্শনিক, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, আর্টিস্ট সব পুরুষের মধ্যে থেকেই বেড়িয়ে এসেছিলো। এরাই নরমাল ডিস্ট্রিবিউশনের ডান দিকে অবস্থানরত (সিলিং এফেক্ট) পুরুষেরা। অন্যদিকে ডিস্ট্রিবিউশনের বাঁ দিকের অবস্থানরত (ফ্লোর এফেক্ট) পুরুষদের অবস্থান ব্যখ্যা করতে সংক্ষেপে জেলের কয়েদীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বিবেচনা করাই যথেষ্ট।

সমস্ত পৃথিবীজোড়া পুরুষরা যে তাদের দক্ষতাবলে যুগ যুগ ধরে একটি দেশের এবং সমাজের নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সকলের জন্য মৌলিক এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো নির্দ্বিধায় করে আসছে তাঁর জন্য তাঁকে মূল্যায়ন বা প্রশংসা করাতো দূরের কথা বরং তাঁকে দোষান্বিত করা হচ্ছে। আধুনিক নারীকে শেখানো হচ্ছে পুরুষের এমন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। অতএব তাঁর জীবনে পুরুষের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এতে করে স্পষ্ট হয় আজকের পশ্চিমা পুরুষ কেন নিজেকে নারীর এবং পারিবারিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে সম্পুর্ণ একা করে নিয়েছে। এই সমাজে একজন পুরুষের জীবনে আর কিবা বাকি আছে যেখানে তাদের শ্রদ্ধা করাতো দুরের কথা সবসময় হেয় করতে প্রস্তুত? নিজের অক্ষমতা আর হীনমন্যতার কথা শুনে শুনে পশ্চিমা পুরুষ আজ ক্লান্ত। ফলে নারীর সন্নিধ্য পাওয়ার চাইতে অনলাইন গেইমিং এবং পর্ণগ্রাফিতেই সে ডুব দিচ্ছে। নারী পুরুষের স্বাভাবিক পারিবারিক বন্ধন এবং হৃদ্ব্যতার সম্পর্ক আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। গোটা পৃথিবীই আজ প্রতিটি পরিবারের স্বাভাবিক কাঠামো রক্ষার্থে দক্ষ, কঠিন, সাহসী, দায়িত্ববান পুরুষদের হারাতে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপার্টম্যান্ট অফ হেলথ সায়েন্স রিপোর্ট’ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারী যুবক এবং যুবতী পিতৃহীন পরিবারের সন্তান। ৯০ শতাংশ অনিকেত, ছন্নছাড়া পিতৃহীন পরিবার থেকে আগত। ৮৫ শতাংশ আচরণগত সমস্যায় ব্যাধিগ্রস্ত, ৮০ শতাংশ ক্রুদ্ধ স্বভাবগ্রস্ত ধর্ষক, ৭১ শতাংশ হাইস্কুল পলাতক, ৮৬ শতাংশ জেল ফেরত কয়েদি পিতৃহীন পরিবারের সন্তান। সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট হয় যে একটি দেশের আগামী প্রজন্মের স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থার কাঠামোকে ধ্বংস করতে সে দেশের সমাজ এবং পরিবার থেকে দক্ষ এবং শক্তিশালী পুরুষকে নির্মূল করাই যথেষ্ট। পশ্চিমা সমাজের এই অবক্ষয়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের নায়ক গোরার দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথ উপমেয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘দিন আর রাত্রি সময়ের যেমন দুটো ভাগ- পুরুষ এবং নারী তেমনি সমাজেরই দুই অংশ। সমাজের স্বাভাবিক অবস্থায় স্ত্রীলোক রাত্রির মতোই প্রচ্ছন্ন, তাঁর সমস্ত কাজ নিগূঢ় এবং নিভৃত। আমাদের কর্মের হিসাব থেকে আমরা রাতকে বাদ দিই। কিন্তু বাদ দিই বলে তাঁর যে গভীর কর্ম তাঁর কিছুই বাদ পড়ে না। সে গোপন বিশ্রামের অন্তরালে আমাদের ক্ষতিপূরণ করে। যেখানে সমাজের অস্বাভাবিক অবস্থা সেখানে রাতকে জোড় করে দিন করে তোলে। তাতে ফল এই হয় যে রাত্রির যে নিভৃত কাজ তা নষ্ট হয়, বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে, ক্লান্তি বাড়তে থাকে, মানুষ মত্ত হয়ে উঠে। সে মত্ততাকে হঠাৎ শক্তি বললে ভ্রম হয়। কারণ সে শক্তি বিনাশ করবার শক্তি।’ রবীন্দ্রনাথের এই বিনাশের শক্তিই আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সমস্ত পশ্চিমা সমাজে।

শুধু পশ্চিমা বিশ্বে নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দু’টি এলাকায় ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে তালাকের পরিমান বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ৷ সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের সচেতনতাও বাড়ছে। বাড়ছে স্বনির্ভরতা। নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে। এখন দু’জনই কাজ করছেন, বাইরে যাচ্ছেন। তাদের সহকর্মি, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিতিজনের সঙ্গে মিশছেন কথা বলছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচিতি এবং সম্পর্কের বহুমুখী ধারা তৈরি করেছে। এখানে স্বচ্ছতা নেই বলেই বিপর্যয় নেমে আসছে সম্পর্কে। এই বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান শিকার হন সন্তানরা। তারা বেড়ে ওঠে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির’ সন্তান হিসেবে। যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে। তারা এক ধরনের, ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে’ ভোগে। মনোচিকিৎসকরা মনে করেন, ‘সন্তানরা যদি বাবা মায়ের স্বাভাবিক সঙ্গ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। তারা সমাজকে, পরিবারকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখে। তাদের মধ্যে জীবনবিমুখতা তৈরি হয়। যা ভয়াবহ।’

পৃথিবীব্যাপী আধুনিক নারী, এমনকি প্রাচ্য নারী যারা কিনা ছিলেন মাতৃত্বের কর্ণধার তারাও আজ নিজেদের গৃহিণী বলে পরিচয় দিতে লজ্জিতবোধ করেন, হীণমন্যতায় ভোগেন। অথচ মানব সভ্যতায় সবচেয়ে গুরুত্ববাহী ভূমিকা যদি কেউ রাখতেই পারে তা একজন নারীর পরিপূর্ণ মাতৃত্বের দ্বারাই সম্ভব। একজন নারীই পারে একটি জাতিকে সম্পুর্ণ সুখী, সুস্থ্য, শিক্ষিত একটি আগামী প্রজন্ম উপহার দিতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সভ্যতার নামে আজ আধুনিকা নারীকে স্বাধীনতার বিভ্রান্তিকর পথে ঠেলে দিয়ে ঘর, স্বামী, সন্তান, সংসার সবকিছু থেকে বঞ্চিত করছে। যা কিনা নিঃশর্তে একজন নারীর স্বাভাবিক সুখ ও স্বাচ্ছন্দের জায়গা ছিলো অনাদিকাল ধরে।

সমাজের পরিবর্তন, ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের হাত ধরে, সমস্ত বিশ্ব জুড়ে পরিবার প্রথারও বার বার পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক বাঙালি সমাজ ব্যবস্থা বর্তমানে পুরুষ শাসিত সমাজ তথা পুরুষাধিপত্যের বিষয় নিয়েই মাতামাতি করেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের বিধ্বস্ত পারিবারিক রূপটির অন্তর্নিহিত এবং মৌলিক গঠনের সামাজিক বিচার বিশ্লেষণে যান না। পরিবারের ভিতরের মৌলিক আন্তঃ সম্পর্কের ধ্বংসবিশেষ নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেন না। আমাদের বুঝতে হবে যে, পরিবার একটি সর্বজনীন পদ্ধতি এবং সামাজিক জীবনের মৌলিক ভিত্তি। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে পরিবারের ভূমিকাও ভিন্ন ভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়। পরিবারের কোনো একক রূপ নেই, নেই কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, আর সমাজ থেকে একটি দেশ বা রাষ্ট্র। একটি সুন্দর পরিবার, পারিবারিক বন্ধন, সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর একজন ভালো মা হলে পরিবার ভালো হবে। আজ বাঙালী হিসাবে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব আমাদের সংস্কারের মাহাত্ম্যকে অনুভব করা। আমাদের সংস্কৃতির গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে, টিকিয়ে রাখতে, মায়ের মান-সম্মান, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নিশ্চয়তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আমাদের সেই ‘মা’ কে সঠিক পথে পরিচালিত করা।

লেখক : ডাবলিন ট্রিনিটি কলেজে অধ্যায়নরত

Similar Articles

Leave a Reply