You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জ্যোতির্ময়ী জ্যোতি এবং তাঁর অভিনয়নন্দন

জ্যোতির্ময়ী জ্যোতি এবং তাঁর অভিনয়নন্দন

শুভাশিস সিনহা

বর্ষবরণ উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ গ্রামের একটি কিশোরী দাপটে সামনে এসে আমাকে বলল, সমীর দা, উৎসবে আমরাও একটা নাটক করব। ‘তোমরা…?’ ‘ অfমি, শুক্লা, অর্পনা…আমরা নিজেরা নিজেরাই।’ বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে, তারা কী নাটক করবে! তারপরও বললাম, ঠিক আছে। আমাদের দলেরও প্রথম কোনো বড় আয়োজন। এত বাছবিছারের কিছু ছিল না। পরে নাটিকাটি যখন মঞ্চায়িত হলো, সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কথায় কথায় জানা গেল, নাটিকাটি সেই কিশোরীরই ডিরেকশনে হয়েছে! সেই কিশোরীর নাম জ্যোতি।
আজকের জ্যোতি সিনহা।
সেই সদ্য-কৈশোর থেকে আজ অব্দি বিশটি বছর যে একটি দিনের জন্যও বিস্মৃত বা বিচ্যুত হয়নি অভিনয় কিবা তার ভাবনা থেকে। প্রচণ্ড স্পৃহায় একের পর এক চরিত্র, কখনো বা কথক/সূত্রধার, কখনো আদুরে রাজকুমারী, কখনো পালাকার, বিদ্রোহী নারী, গ্রামের জীর্ণ কুটিরবাসী হতদরিদ্র গৃহবধূ, কখনো এক পুরুষ দস্যু, কখনো বা নরম ক্ষীণাঙ্গী রাধা, একই সাথে পুরাণের চার নারী, সন্তান বৎসল মা, দজ্জাল রমণী, প্রেমকাতুরে যুবতী, অশীতিপর বৃদ্ধা… অসংখ্য চরিত্র। সব তার অভিনয়ের নতুন নতুন ভাবনায়, কৌশলে, তৎপরতায় জ্যোতির্ময়। পিতার অকাল মৃত্যুর পর গ্রামে ফিরে মা আর ছোট বোনের সাথে কাকাদের আশ্রয়ে জীর্ণ ভাঙা কুটিরেই পার করেছে ১৯টি বছর (এই তো মাত্র এক বছরও হয় নি, তারা নিজেদের নতুন বাড়িতে উঠল)। বর্ষায় চাল চুয়ে পানি পড়ে, গরমে থাকা দায়, নিরাপত্তাহীনতা সবকিছু কোথায় উবে যেত জ্যোতি যখন মঞ্চে দাঁড়ায়। পুরো মঞ্চ আলোকময়। মঞ্চের প্রতিটি স্পেসকে, প্রতিটি কোণ-রেখাকে এত সাবলীলভাবে জীবন্ত, সক্রিয় করে তুলতে ওর মতো আর খুব বেশি শিল্পী পেরেছে কিনা জানি না। অভিনয়ের, সংলাপ থ্রোয়িংয়ের, জেশ্চার-পোশ্চার সবকিছুরই নিজস্ব এক ধরণের স্টাইল তৈরি করে নিয়েছে জ্যোতি, যা আজ অনেকেই জ্ঞাতে অজ্ঞাতে অনুসরণ করছে বলেই মনে হয়। মঞ্চে কিছু বলা বা করা মাত্র যদি কিছু একটা মনে হয়, তাহলে সে পারফরমার, আর মঞ্চে দাঁড়ানো মাত্র যদি মনে হয় সামথিং, তবে সে আর্টিস্ট। এরকম দু’একজনই থাকে দেশকালে, নির্দ্বিধায় বলব জ্যোতি তাদের একজন। মঞ্চাভিনয়ে এক ধরণের এলিগেন্স বা আভিজাত্য নিয়ে এসেছে জ্যোতি। নিজের জীবনের সমস্ত টানাপড়েন, স্ট্রাগল, দায়দায়িত্ব সবকিছুকে একদমই নিজের মতোন করে সবার অাড়ালে রেখে শিল্পের জন্য, একটি দলের জন্য, একটি স্বপ্নের জন্য নিজেকে নিরন্তর সঁপে দেয়া, উজাড় করে দেবার এমন উদাহরণ আমার অভিজ্ঞতায় বিরলই। ডাক্তারের ভুল অস্ত্রোপচারে মৃত্যুর দোরগোড়ায় গিয়ে ফিরে এসে মাত্র অল্পদিনের ব্যবধানে আগের চেয়েও শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল মঞ্চে। পিতৃহীন টানাপড়েনের পরিবারে শাসনের দায় তুচ্ছ করে একমাত্র ছোট বোনটাকেও (স্মৃতি) নিয়ে এল থিয়েটারে, সম্পৃক্ত করল পুরোদস্তুর। শেখালও পথপ্রদর্শকের মতো। গ্রাহ্য করে নি পারিবারিক সামাজিক প্রতিষ্ঠার কোনো ঝুঁকিকে। একটি দলের পারফরমেন্সকে সামষ্টিক সব প্রয়াসের পরও বলব জ্যোতি একাই মিথতুল্য করে দিয়েছে। সবকিছুর পরও আলোকবর্তিকায় ঝলমলে মুখ দেখাতে না পারা একটি নাট্যদলকে সে যে-শিল্পের সমগ্র শক্তিতে নেতৃত্ব দিয়ে দীপ্র করে তুলেছিল, সে-শিল্প অভিনয়। যেখানে সে ক্লাসিক ও আধুনিক। অভিনয়ের মতো ছোটবেলা থেকে নাচও ওর প্যাশন, নাটকের অনেক কোরিওগ্রাফি ওর করা। গানও ভালোই করে। তবে ওর অভিনয়ের যাদুর পসরা দেখার প্রধান জায়গা আমাদের মহড়াকক্ষ। খানিকটা আলসেমি কিবা অনায়েসে হাই তোলার মতো করে স্বভাবসুলভ ধীর পায়ে মহড়াকক্ষে ঢোকা জ্যোতি মঞ্চে উঠেই যে নতুনতর পদক্ষেপ, অভিব্যক্তি, সংলাপ প্রক্ষেপণ, আঙ্গিক অভিক্ষেপে একের পর এক ব্লকিং ভাঙা অভিনয়যাত্রা শুরু করবে সেটা প’লে প’লে উপভোগ করে মহড়াকক্ষের লোকজন কিবা সহকর্মীরা। এবং নির্দেশক হিসেবে আমি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি, কারণ জ্যোতির অভিনয় সম্ভবত আমিই সবচেয়ে বেশি দেখার সুযোগ পেয়েছি! খামখেয়ালিরও শেষ নেই ওর। ‘কহে বীরাঙ্গনা’র ৪৯তম প্রদর্শনী যখন অজ্ঞাত কারণে খুব খারাপ হয়ে গেল, ড্রেসিং রুমে আমি রীতিমতো যাচ্ছে তাই ভাবে গালিগালাজ করলাম, এমনকি পরের দিন ৫০তম শো না করেই বাড়ি ফেরার কথাও বললাম, জ্যোতি নিরুত্তর। দৃঢ়। পরের দিন ভোর থেকে সে নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও একা করে ফেলল। নিজের মতো করেই কাটালো দিন। আর সন্ধ্যায় যা হলো, তা ছাপিয়ে গেল পূর্ববর্তী সব প্রদর্শনীকেই। অনন্য, নিখুঁত, উত্তুঙ্গ এক নাট্যকল্প। প্রতিনিয়ত, প্রতিটি প্রদর্শনীতেই সে নতুন নতুনভাবেই নিজেকে বিন্যস্ত করে মঞ্চে। তারপরও ওর ধারণা, ওর তেমন কিছুই হয় না, অনেক অনেক বাকি, এখনও। রতন থিয়াম তাকে আন্তর্জাতিক মানের অভিনেত্রী বলার পরও, মামুনুর রশীদ কিবা রামেন্দু মজুমদার তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও, আসাদুজ্জামান নূর তাকে তৃপ্তি মিত্র ও শাওঁলী মিত্রের সমতুল্য বললেও, ঠোঁটকাটা সৈয়দ জামিল আহমেদ পর্যন্ত স্পিচ, মুভমেন্ট সব মিলিয়ে তাকে টোটাল একট্রেস বললেও (তিনি এমনকি শিল্পকলা রেপার্টরীর ‘বিদেহ’ দেখে বিরক্ত হলেও টেলিফোনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন জ্যোতির অভিনয়ের), দেখেছি জ্যোতি আদতেই খুব স্বাভাবিক, নিরুচ্ছ্বাস; বরং শংকিত, পরবর্তী শো তার ভালো হবে তো? নতুন কিছু!
ভাষাগত কারণেই ঘুরে ফিরে ‘কহে বীরাঙ্গনা’র কথাই শুধু আসে (এবং আমিও মনে করি, ‘কহে বীরাঙ্গনা’ বাংলার নাট্যমঞ্চে সবচেয়ে দুরূহ, দুঃসম্ভব নাট্য। এর কারণ পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করব আশা রাখি।তবে এও সত্য জ্যোতির জন্যই সেটি আজ অনায়াসসাধ্য বলে ভ্রম হয়।), কিন্তু ওর অভিনয়ের ডাইমেনশনস, ব্যাপকতা অন্য অনেক নাটকেই সমানভাবে আছে। এমনকি ‘লেইমা’তে সে সহচরিত্রের বয়স, সম্পর্ক ভেদে নিজের একটা চরিত্রকেই চার ভাগ করে, চার ভাবে মঞ্চে বিন্যস্ত করে। ‘ইঙাল আধার পালা’য় পদাবলী কীর্তনীয়ার আঙ্গিকে হয়ে উঠল দুর্দান্ত কথক/সূত্রধর। ‘দেবতার গ্রাস’-এ মমতাবিধুর মা, এই তো সেদিন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর সর্বশেষ প্রদর্শনীতে রাধাকে এমনভাবে রূপায়িত করল, গ্রামের ওরই এক বান্ধবী, অকাল বিধবা ওকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল, অশ্রুতে ভাসলো অনেকেই। আবার ‘লক্ষ্মী গিথানক’-এ দুই ভিন্ন রূপে ভিলেন। এমন অনেক নাটকে, যেগুলো শহরের মঞ্চে সেসময় মঞ্চস্থ হতেও পারে নি।
জ্যোতিরও আনন্দের শেষ নেই, হয়তো বা। এত চমৎকার কিছু সহকর্মী সে পেয়েছে, একটি স্বপ্নময় দল, মণিপুরি থিয়েটার। তারুণ্যে, সৃষ্টিশীলতায় মুখর।যাদের পারফরমেন্স-মণ্ডলের মধ্যমণি জ্যোতি।

বড় বড় হলে, শহরে, দেশবিদেশে এত শো করার পরও এক্কেবারে কোনো অজপাড়াগাঁয়ে শো করতে গেলেও এখনও জ্যোতির সমান আগ্রহ, উৎসাহ, উচ্ছ্বাস। এজন্যই বুঝি গ্রামের বুড়িটি বা বাচ্চাটি থেকে শুরু করে নগরের দর্শকমহলে ওর সমান জনপ্রিয়তা। একটি জনপদের মানুষের গর্ব আর ভালোবাসার প্রতিমা সে আজ। আমি, আমরা তা অনুভব করি। তবু সে কখনো অহমে নেই। এখনো এতকাল পরও দলের সবার কাছে সে সেই জ্যোতি কিবা জ্যোতি দি। সবার পাশে, সবার যে কোনো সমস্যার সমাধানে, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের দেখভালে পর্যন্ত অক্লান্ত। জ্যোতির স্টারিজম সে পত্রিকার পাতা কিবা কখনো টিভির পর্দায়, কিন্তু মঞ্চভূমে এবং মহড়াকক্ষে সে সবার আপনার চেয়ে আপন। জ্যোতি আমাকে গুরু মানে। এ আমার প্রাপ্তি। মঞ্চের জ্যোতির কাছ থেকেও আমিও প্রতিনিয়ত শিখি। এখনও, আমি বলি, মাত্র শুরু। খানিকটা শিল্পীসুলভ খেয়ালি স্বভাবের কারণেই জ্যোতি তার সর্বোচ্চ শিল্পক্ষমতার এখনও প্রকাশ ঘটায় নি বলেই মনে করি (যেন ইচ্ছে করেই নিজের সেরাটা দেয় না বা দিতে চায় না! এরকম একটা অদ্ভুত হেঁয়ালি)। তার দু’একটা দোষের মধ্যে খানিক খামখেয়ালিপনা, আপন মনে চলা, অযথা অভিনয় নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ টেনশনে পড়ে যাওয়া, কখনো কখনো একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলা, তাতে করে দু’একবার স্লিপ অফ টাঙ বা উচ্চারণ বিচ্যুতি হয়ে যাওয়া আর সবকিছু ছাপিয়ে আনপ্রেডিক্টেবিলিটি (অবশ্য তার শিল্পীসুলভ এক অনুপম সুন্দরতা আছে বৈকি!) আগামীতে ওর নির্মাণ-চলমান কয়েকটি কাজ ওকে আরও উজ্জ্বল করবে নিশ্চিত। সে আকাঙ্ক্ষায় আপাতত ইস্তফা।

শুভ জন্মদিন, জ্যোতি সিনহা।

 

 

 

 

 

Similar Articles

Leave a Reply