You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন তরী (পর্ব: বৈপরীত্য )

জীবন তরী (পর্ব: বৈপরীত্য )

অনন্যা হক

জাভেদ কলেজে যাওয়ার আগে বারান্দায় বসে পেপার পড়ে, এখানে বসেই নাস্তা করে।আজও তেমনি পেপার পড়ছিল। তাঁর বউ রুমানা নাস্তা নিয়ে এল।

নাস্তা টা টেবিলে রেখে বলে, রিফাত বাজার পাঠিয়ে দিয়েছে, আজ বাজারে যাওয়া লাগবে না তোমার।

রুমানা চলে যাচ্ছিল, জাভেদ বলে বস এখানে একটু।

রুমানা বলে, বাজার  এসেছে, রান্না ঘরে অনেক কাজ ,মা রাগ করবে,বলে চলে যায়।

জাভেদ তাকিয়ে থাকে বউ এর চলে যাওয়ার দিকে।

এই হলো তার বউ রুমানা।আজ পাঁচ বছর হলো, তাদের বিয়ে হয়েছে, দুই বাচ্চার বাবা হয়েছে, কিন্তু তাকে সে ঠিক মত বুঝতেই পারে না।বউ এর সঙ্গ সে যেভাবে আশা করে, রুমানা সেটা  অনুভব করতে পারে না।

বউ এর সাথে তার  এত দূরত্ব ভাল লাগে না। জাভেদ দেখে তার বউ ঘুরে ঘুরে কাজ করে বেড়াচ্ছে, যেন শুধু কাজ করার জন্যেই  এ সংসারে  এসেছে।

সুন্দরী বউ, জাভেদ যে তাকে লক্ষ্য করে, সে সেটাও অনুভব করে না।নিজের ঘোরে সংসার করে যায় মন দিয়ে।

বিয়েটা মায়ের পছন্দে হয়েছে। তার মা বেশ কতৃত্ব পরায়ণ রাগী, নিজের কথার নড়চড় পছন্দ করেন না।

তিনি সৈয়দ বংশের মেয়ে,বংশ নিয়ে তার একটা অহমিকা  আছে। তাই তার এই মেধাবী, শিক্ষিত ছেলের জন্য, তার ইচ্ছের তোয়াক্কা না করে, এই অল্প শিক্ষিত,সুন্দরী, স্ববংশীয় মেয়ে কে, ছেলের বউ করে আনেন।

রুমানা দেখতে সুন্দর হলেও মেধা আর ব্যক্তিত্বের অভাবে চেহারায় চটক কম। কথা বার্তা, চলনেও জাভেদের মন কাড়েনি।একটু বেশি আটপৌরে, একেবারে আষ্টেপৃষ্টে সংসারী নারী। যেমন টা জাভেদের কল্পনা তে ছিল না কখনও।জাভেদ কিছু টা  অন্তর্মুখী, চরিত্রে সাহসের অভাব  আছে, তাই স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে, মায়ের  উপর নিজের মত কে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি ।

ছোট ভাই রিফাত একেবারে উল্টো, সাহসী, কথা মুখের উপর খোলা মনে বলতে পারে, তাই মা ঠিকই তার পছন্দ কে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছে।

বিয়ের পর থেকেই, রুমানার সাথে জাভেদের মানসিক লেনদেন ঠিক মেলেনি।সংসারে নিবেদিত প্রান, তাই মায়ের কাছে সে খুব প্রিয়।

শাশুড়ি  এবং  স্বামী দুজন কেই সমীহ করে চলে।কিন্তু  এই সমীহ তো জাভেদ চায়নি। জীবন সঙ্গী নিয়ে জাভেদের  আকাঙ্ক্ষা ছিল বহুমাত্রিক।

আজ হঠাৎ করে নিপার কথা মনে পড়লো। পাশের বাড়ির মেয়ে, কলেজে এক ক্লাস জুনিয়র ছিল। একটু লম্বা, শ্যামলা, চোখ দুটো খুব সুন্দর ছিল। সামনে পড়ে গেলে, তার দিকে একটু কেমন করে যেন তাকাতো । উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত মেয়ে টা বন্ধুদের সাথে খলবলিয়ে কথা বলতে বলতে যেত । কারণে, অকারণে হেসে উঠতো ।

জাভেদ তার প্রেমে পড়ে গেল, নিপাও সাড়া দিল।খুব নীরবে, লুকিয়ে প্রেম চললো দুই বছর। জাভেদ কলেজের চাকর তে ঢুকে মাকে বলে নিপার কথা।কারণ নিপার তখন বিয়ের কথা হচ্ছিল।

মা নিপা কে ভাল করেই চিনতো।

কিন্তু মায়ের বোধহয়  আলাদা হিসাব ছিল, ছেলের বউ কে নিয়ে।কিছুতেই মত দিল না।

জাভেদ বেপরোয়া হতে জানে না, তাই মায়ের ইচ্ছের কাছে নত হয়ে গেল।

এখন জাভেদ বুঝতে পারে, কেন মা স্বার্থপরের মত খুঁজে পেতে, ছেলের দিকে না তাকিয়ে, এই বিয়ে দিয়েছিল। শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছে মত দাসী-বৃত্তি করানোর জন্য, গ্রাম থেকে শান্ত, অল্প শিক্ষিত এই মেয়ে কে বউ করে এনেছে।

রুমানার সাথে তার মনের যোজন যোজন ফারাক । যতটুকু কথা হয়, সেটা শুধু মাত্র প্রয়োজন ঘিরে।

আজ কলেজে ক্লাস নেই, তেমন কোন ব্যস্ততা নেই।একটা শূন্যতা বোধ নিয়ে বসে থাকে। মেজাজ টা নিজের উপরই খিটখিটে হয়ে থাকে।

ভাবে, কেন আগে বুঝতে পারলাম না, একটু না হয় অবাধ্যই হতাম। মানুষ কি মা কে খুশি করার জন্যই বিয়ে করে, এর নাম কি সংসার? আমি কি জীবন সঙ্গী না সহযাত্রী পেলাম?

নিপা কে বিয়ে করলে তাও তো জীবনটায় সংসারটায় একটা প্রাণের ছোঁয়া থাকতো।

এই অতৃপ্তিই তার সারাজীবনের সাথী হয়ে গেল।সে একজন প্রেমিক পুরুষ, রুমানার রূপ, সৌন্দর্যে দূর থেকে অবগাহন করে যতটুকু সুখ অনুভব করে।

তার মনের গহীনে বিশাল এক শক্ত প্রাচীর, কি আছে তার ভেতরে, বেচারী নিজেও কি জানে!

চলবে …

গল্পের পূর্বের অংশ পড়ুন

জীবন তরী (পর্ব: দ্বিধা)

জীবন তরী (পর্ব: বিয়ে)

 

Similar Articles

Leave a Reply