You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন তরী (পর্ব: বিয়ে)

জীবন তরী (পর্ব: বিয়ে)

অনন্যা হক

মিলি বাবা মা এর কাছে বসে, মা তাকে ডেকে এনেছে, বাবা কথা বলবে।বাবা বলে, মা তুমিও আস কথা আছে।সবাই  এসে বসে, একটু চিন্তিত মনে।

বাবা বলে, মিলির  একটা খুব ভাল সম্বন্ধ এসেছে শহর থেকে, তারা দেখতে আসতে চায় ।

দাদি বলে, একবারে দেখতে আসতে চায়, আগে কিছু বললি না, এ কেমন কথা? কোথাকার ছেলে, কি কেমন না জেনে, আগেই নাতনি দেখাবো নাকি?

মিলি একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে লইলো, যেন মাথায়  বাজ পড়লো।

বাবার মুখে মুখে কথা বলার পরিবেশ বা অভ্যাস নেই।

মা বলে, আমাকেও তো আগে কিছু বলনি, এত আগে মেয়ে বিয়ে দেব নাকি? কেবলই কলেজে অনার্সে ভর্তি  হলো।

বাবা বলে ওঠে  গম্ভীর মুখে, সবাই থামো, বলতে দাও আমাকে, আমি কি মেয়ে কে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছি, আমার হিসাব নেই কিছু ?

এদের সব খোঁজ নিয়েছি, খুব চেনা পরিবার শহরে, অনেক জমিজমা আছে, ছেলের বড় ব্যবসা, দেখতে খুব সুন্দর, আর কি লাগে? ছেলে নিজে এসে প্রস্তাব দিয়েছে আমার কাছে।

সে নাকি কলেজে আসা যাওয়ার পথে মিলি কে পছন্দ করেছে।

মিলি এতক্ষণে না পেরে কথা বলে ওঠে, বাবা  আমার পড়ার  ইচ্ছে, আমি লেখা পড়ায় ভাল। আমার স্বপ্ন  আমি শিক্ষকতা করবো।

শোন মা, আমি সবই বুঝি । আমার বয়স হয়েছে, অসুস্থ্ থাকি ইদানীং। অবসরে চলে গিয়েছি কবে, তোমার ভাই দুটো ভাল প্রতিষ্ঠিত নয়। ওদের উপর তোমার দায়িত্ব  আমি ফেলতে চাই না, সেটা কারো জন্য ভাল হবে না।

আমাদের আর্থিক সঙ্গতি কম, এটা তোমাদের বুঝতে হবে।

তুমি আমার এক মাত্র মেয়ে, তোমার ভাল  আমাকেই দেখতে হবে। আমি ছেলে কে বলবো, বিয়ের পর তোমাকে পড়াতে।ওদের বাড়ির পাশেই কলেজ আছে।

এই ছেলে দেখলেই তোমাদের সবার পছন্দ হবে একবারে, কথা বার্তাও মন কাড়ে।

তোমরা প্রস্তুতি শুরু কর, ওদের কথা দিয়েছি, ওরা কাল বিকেলেই দেখতে আসতে চায়।

বাবা কথাগুলো বলে আর কারো কথার কোন তোয়াক্কা না করে বাইরে চলে গেল।মিলিও উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।

মা আর দাদি বসে রইলো। দাদি বলে, যে গোয়ার ছেলে, আর কিছু শুনবেই না। আসুক দেখতে, দেখ কপালে কি আছে।

চল বউমা আমরা প্রস্তুতি শুরু করি।

রিফাতদের বাড়ি মফস্বল শহরে, আর পাশের একটা গ্রামে মিলিদের বাড়ি, খুব বেশি দূরে নয় শহর থেকে।

মিলি এমনিতেই দেখতে সুন্দর।তাই বাড়ির লোকের তেমন কোন চিন্তা ছিল না এসব নিয়ে।

দুই দিন ধরে মিলির মন খারাপ। এক মাত্র মেয়ে হওয়া তে অনেক আদরের সে সবার কাছে, এত আগে এ বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে, তার পড়া লেখার স্বপ্ন পূরণ হবে না, সে মেনে নিতে পারছে না।খুব বিমর্ষ হয়ে কেটে গেল দিন টা।

পরদিন বিকেলে  ছেলেপক্ষ এল।বাড়ির লোকদের সাথে রিফাতও আসে।মিলিকে সাজিয়ে সবার সামনে  আনা হলো। আগেই এই মেয়েকে বহু বার দেখে মনের মাঝে ধরেই রেখেছিল রিফাত।ঘরে ঢুকতেই, এমন একটা চঞ্চল, রোমান্টিক চাহনি তে তাকালো মিলির দিকে, মিলির আর বুঝতে বাকি রইলো না পাত্র কে।

রিফাত সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী ছেলে, আছে চোখে পড়ার মত ব্যক্তিত্ব, যেটা মেয়েরা সব থেকে বেশি পছন্দ করে।প্রথম দেখাতেই মিলির প্রেমের রসায়ন টা, একটু ছলকে ওঠে ।সে যেন একটু রোমাঞ্চিত হয়।

সে ঘরে ঢুকে প্রথমে দাঁড়িয়ে ছিল, সবাই কে তাজ্জব বানিয়ে রিফাতই প্রথমে বলে ওঠে, তুমি দাঁড়িয়ে কেন, বস। যেন কত দিনের চেনা। মিলি যেন খেই হারিয়ে ফেলে সবার সামনে।

মিলির বিয়েতে অনীহা, পরিবারের প্রতি রুখে থাকা মন, কি যেন এক উদ্বেলতায়, একটু করে বাস্প হয়ে যেতে থাকে, তার বিষাদ নিমিষেই সাদা মেঘের মত সরে যেতে থাকলো। কি আছে জীবনে জানে না, অন্ধকারেই ঝাপ দিতে মন সায় দিয়ে দিল।

খুব ধুমধাম করে রিফাত মিলি কে বিয়ে করে  আনলো।রিফাতের বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে, রিফাতের পাশে হেঁটে গিয়ে, তার ঘরে প্রবেশ করলো সে।দুজন কে এক বিছানায় বসানো হলো পাশাপাশি।ঘর ভরা লোক, কেউ আসছে, যাচ্ছে, কাউকে পাত্তা না দিয়ে, রিফাত মিলি কে বলে, কেমন আছ, আরে এত দূরে কেন তুমি, কাছে এসে বস।

এই হলো রিফাত।একেবারে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, রসিক ছেলে,যাকে প্রথম সংস্পর্শেই ভাল লেগে যায়।

মিলির মাথার মধ্যে কি যেন একটা তার ঝিন করে বেজে যায়।ভাবে, কি ছেলে রে বাবা,  কোন জড়তা নেই, চক্ষুলজ্জা নেই।

মিলি আবার রোমাঞ্চিত হলো,বিয়ের পর প্রথম বরের প্রেমে পড়লো।

রিফাত ইচ্ছে করে মিলির গায়ে ঘেঁষে, কিছু টা ঠেস দিয়ে বসে রইলো, মিলি যে তার, এটা সে নিঃসংকোচে যেন তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে ।একটা দমকা হাওয়া গায়ে মুখে এসে পড়ছে মিলির। কেমন যেন একটা ঝিম মেরে বসে রইলো।মনের মধ্যে  এক উথালপাতাল ঢেউ বয়ে চলেছে, যেন কিসের  এক অজানা মাতম বেজে যাচ্ছে।

একে বাড়ির সবাই কে ছেড়ে আসার কষ্ট বুকে চেপে বসে আছে,আবার সেই সাথে এক উদ্যম সাহসী, বাঁধ ভাঙা পুরুষের সংস্পর্শে, নতুন জীবনের কৌতুহল  এবং সুখের হাতছানি তে বিভোর মিলি ।

মিলি খুশি মনে এ বাড়ির বউ হয়ে গেল। এভাবেই এক ঠিকানা থেকে আর এক ঠিকানায়, নিজেকে  গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করলো। যেন এক আপন ঠিকানা ছেড়ে  আসার বেদনা, এক অপার সুখের জীবনের  আহবানে চিরতরে ভাসিয়ে দিল।

 

চলবে …

 

Similar Articles

Leave a Reply