You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন তরী (পর্ব: দ্বিধা)

জীবন তরী (পর্ব: দ্বিধা)

অনন্যা হক

বিয়ের পরে এক মাস গেল আনন্দ হৈচৈ, দু বাড়ি মিলে আসা যাওয়া  এভাবে। মিলির সংসার জীবন শুরু হলো একটা নতুন ঘোর, নতুন মোহে আচ্ছন্ন হয়ে।

রিফাত ঘুম থেকে দেরী করে  ওঠে আগাগোড়াই। এখন তো আরও, নতুন বউ ঘরে। সে যতক্ষণ থাকে, মিলি কে বের হতে দিতে চায় না।কিন্তু প্রথম কয়েক দিন দেরী হলেও মিলি  এ ব্যাপারে সজাগ থাকে। তবুও রিফাতের কারণে এর মধ্যে এক দিন শাশুড়ির কাছে অপ্রস্তুত হতে হয়েছে।

আজও মিলি  উঠে চলে আসবে, রিফাত অহেতুক বাহানা করছিল, আর একটু থাকো, একসাথে খেতে যাব।

মিলি বলে বোঝ না কেন, দেরী করে বের হওয়া মা পছন্দ করে না। সেদিন তো বলেই দিলেন মুখের উপর। আমার লজ্জা লাগে, ওদিকে ভাবী একা কাজ করে।

রিফাত বলে, আরে তুমি জানো না,  মায়ের কাছে  আমার সব মাফ।মাত্র কদিন হলো, এসেছো, ওদিকে মা, ভাবী, কাজের লোক আছে, তোমাকে না গেলেও চলবে।

মিলি যৌথ পরিবারে বড় হয়েছে। মা, দাদি, ভাবীদের দেখে শিখেছে, কিভাবে  খাপ খাইয়ে চলতে হয়। তবুও আজ আবার  রিফাতের পাল্লায় পড়ে দেরী হয়ে গেল। বের হতে হতে ভাবে, তোমার মায়ের কাছে তোমার মাফ হলেও আমার হবে না,  আমি এ কদিনে বুঝেছি কিছুটা ।

ঠিকই রান্না ঘরে যেতেই, শাশুড়ি বেশ কড়া সুরে বলে, ছোট বউমা, বলেছি তোমাকে একদিন, ঘুম থেকে দেরী করে উঠলে তো এদিকে চলব না। দেখ না,  বড় বউমা এদিকে  একা কাজ করে, তার সাথে সব দায়িত্ব তো তোমাকে বুঝে নিতে হবে।

মিলির বয়স কম হলেও  আত্মসম্মান বোধ প্রখর।নিজের বিবেক মত কাজ করতেই তার ভাল লাগে,  কারো আদেশ, নির্দেশ কেমন যেন বিব্রত বোধ করে।আজ তার কোন দোষ ছিল না, এটা তো বলা যায় না।

এভাবেই শুরু হলো সংসারে রুটিন মাফিক দায়িত্ব পালন।বুঝতে শুরু করলো, কাছের মানুষ টা কে, সংসার কে।পার করলো, তিন মাস। একটা ঘোরে আচ্ছন্ন থাকার কারণে, ভাল লাগা, মন্দ লাগার পার্থক্য টা  এত টা কাজ করছিল না। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে টের পেল, তার শাশুড়ি  অত্যন্ত কতৃত্ব পরায়ণ, রাগী, অসহিষ্ণু মহিলা ।

সেদিন দুজনে কি কথায় যেন হাসতে হাসতে রান্না ঘরে ঢোকে কেবলই খাবার নিয়ে খেতে বসবে, শাশুড়ি বলে ওঠে,  বউমা তুমি আগে রিফাত কে খেতে দাও, সে বাইরে চলে যাক, পরে বড় বউ এর সাথে একসাথে খেও তুমি।

মিলি খুব  অপমানিত বোধ করে।একটু রাগও হয়। বুঝতে পারে, বউ দের স্বাধীনতা সে একেবারেই পছন্দ করে না,  এটাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। ছেলে তো কিছুই বুঝতে পারলো না,  দিব্যি  আহ্লাদ করতে করতে, মা আর বউ এর তদারকি তে খেয়ে বের হয়ে গেল।

মিলির মন খারাপ হয়ে যায়। সে লক্ষ্য করে দেখেছে, তার বড় জা সারাক্ষণ শাশুড়ির ভয়ে তটস্থ থাকে।তাকে যেভাবে পরিচালিত করে, সেভাবেই চলে।মিলির সাথেও সেই চেষ্টা চলছে। মিলির ভেতরে একটা দ্বিধা শুরু হয়।

সে ধীর স্থির এক পরিশীলিত রুচির মেয়ে।মানসিক মূল্যবোধ টা পারিবারিক ভাবেই পেয়ে এসেছে।বুঝতে পারে এই শাশুড়ি তার দাদির মত না। মিলিদের বাসার পরিবেশটায় ছিল  উদার,হাসিখুশি,একটা জমজমাট ভাব, এখানে তার একদম উল্টো।

এভাবে ছয় মাস পার হলো, অনেক টা বুঝতে পারলো এই বাড়ির পরিবেশ। শাশুড়ি কে নিয়ে সে খুব  হতাশ এখন।মিলি তার সাধ্যি মত দায়িত্ব পালন করে, নিজের মত করে একটু সময় কাটাতে চায়, সেটাও তার পছন্দ না। তাকেও সে বড় জা  এর মত পরিচালিত করতে চায়।

কিন্তু বড় জা আর মিলির মধ্যে  বিশাল ফারাক, এটা শাশুড়ি বুঝতে পারছে না।সে যখনই  একটু নিজের মত স্বাধীন ভাবে  তার ঘরে একটু  একা থাকতে চায়,  তখনই ডেকে বলবে, ছোট বউ কি কর, দেখ বড় বউ একা কি করে।

কিন্তু  বড় বউ তো সারাদিন সংসার নিয়ে থাকে, কি যে করে তাই মিলি বোঝে না, এভাবে তো সে পারবে না।

মিলি বুঝতে শুরু করলো, পরিবেশ টা  তার অনুকূলে হবে না।মনের মধ্যে একটা  দ্বিধার কাঁটা বেশ রকম করে গেঁথে গেল।

চলবে…

গল্পটির পূর্বের অংশ

জীবন তরী (পর্ব: বিয়ে)

Similar Articles

Leave a Reply