You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন তরী (পর্ব: দ্বন্দ্ব )

জীবন তরী (পর্ব: দ্বন্দ্ব )

অনন্যা হক

বড় ছেলে জাভেদ চাকরি পাওয়ার পর আশরাফী বেগমের স্বামী মারা যান। জমিজমার আয় আর জাভেদের চাকরি দিয়ে সংসার চলতো।পরে রিফাতের ব্যবসা শুরু হয়।সংসারে কোন অভাব নেই। মায়ের ব্যাপারে ছেলেদের ভালবাসার কোন কমতি নেই।

ছেলের বউদের ব্যাপারে মা খুব শক্ত অবস্থান রেখে চলে, যেন নিজের  অবস্থান টা টলে না যায়।বউদের বাবার বাড়ি তে যাওয়ার ব্যাপারে তার খুব অনীহা। বড় বউ এর এ ব্যাপারে উচাটন কম, কালেভদ্রে যায়। কিন্তু মিলির কিছু দিন পার হলেই যেতে ইচ্ছে করে। সে  একটু কোমল মনের মেয়ে।

কয়েক দিন ধরেই মিলির শরীর খারাপ।বাসার সবাই জেনে গিয়েছে মিলির বাচ্চা হবে।যতই রিফাত বলুক, শাশুড়ির অনুমতি নিতে হবে। মিলি শাশুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।শাশুড়ি বলে, কিছু বলবে ছোট বউ? মিলি বলে, আমি বাবার বাড়ি যেতে চাই। কেন বউমা, এত বাবার বাড়ি মনে পড়লে চলবে নাকি? এই তো কিছুদিন আগে ঘুরে এলে, আমাদের সময় আমরা দুই বছরেও এ কথা মনে আনতে পারিনি, কেউ নিতে আসলেও  ফেরত দিয়েছে। আর এখন কিভাবে যাবে, ওখানে গেলে আমার বংশধরের অযত্ন হবে।

মিলিরা শ্বশুর বাড়ির তুলনায় একটু কম অবস্থাপন্ন ঘর, শাশুড়ি এ ব্যাপারে একটা অহমিকা দেখায়। নতুন কাল বলে মিলি সহ্য করে, কি বলবে কে কিভাবে নেবে ভেবে কথা না বাড়িয়ে ঘরে চলে যায়। কিন্তু খুব আত্মসম্মানে লাগে। মিলি ভাবে, বলে কি বংশধরের অযত্ন হবে, এ কি আমার সন্তান না?মিলির  একটা জেদ চেপে যায়।তাই সে ঠিক করে, এবার গিয়ে বেশ কিছু দিন থেকে আসবে।

রিফাত বাসায় এলে, খাওয়ার পর মিলি বলে, আমাকে তোমার আমাদের বাড়িতে রেখে  আসার কথা ছিল। আমি এবার যাবোই।রিফাত যেমন দ্রুত রেগে যায়, তেমন রাগ উবে যেতেও সময় লাগে না।এমনিতেই একটা অনুশোচনা ছিল, কাল রাতেও খারাপ ব্যবহার করেছে, রেগে গেলে মুখে কোন লাগাম থাকে না। বউ এর অভিমান ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে, মন টা গলে গেল । 

মাকে গিয়ে ধরলো, এই ছেলেটার  উপর কোন একটা  অজানা কারণে, মা একটু দূর্বল।মাত্র চার পাঁচ দিনের অনুমতি মিলে গেল।

রিফাত ঘরে  এসে বলে, তুমি গুছিয়ে নাও, ঠিক পাঁচ দিন থাকতে পারবে বলেছে মা। মিলি বলে, মা বলেছে, কেন তোমার বলার কিছু নেই? কিছু দিন বেশি থাকলে তোমাদের সমস্যা কি? ঐটা তো আমার বাড়ি, সেখানে আমার অনেক আপন লোক থাকে।তোমার মত কি আমার তাদের কাছে থাকতে  ইচ্ছে করে না?

রিফাত হেসে বলে, এখন থেকে এই বাড়িই তোমার বাড়ি, আর তোমার সব থেকে আপন।লোক টা মন ভোলাতেও জানে, মিলি কষ্ট পেলেও কিসের যেন একটা মধুর অনুভূতি দোলা দিয়ে যায় মনে।

রিফাত বলে, বাড়ি ফিরে আমার শূন্য ঘর ভাল লাগে না, আচরণে বহির্মুখী হলেও সে বউ এর প্রতি অনুরক্ত।

পরের দিন মিলি কে রিফাত বাবার বাড়ি তে নিয়ে গেল।মিলির মলিন চেহারা আর শারীরিক অবস্থা দেখে সবাই বলে এবার মিলি কে সহজে যেত দেবে না। বিশেষ করে দাদি বললে রিফাত  আর মুখের উপর না বলতে পারে না।

রিফাত দুই দিন থেকে বাড়ি চলে  আসে।মিলি বলে দিয়েছিল, কম পক্ষে দু মাস সে থাকবে।

রিফাত সত্যি দুই মাস পরে মিলি কে নিয়ে আসে। মিলি সন্তান সম্ভবা পাঁচ মাসে পড়েছে।দেখতে আরো সুন্দর হয়েছে, রিফাত বউ কে মুগ্ধ চোখে দেখে, মিলি ব্যাপারটা অনুভব করে।

কিছু দিন হলো, রিফাত বাসায় সন্ধ্যার পরেই চলে আসে।সন্তান আগমনের সুখে, রিফাত একটু সমঝে চলার চেষ্টা করে। মিলি যেন একটু স্বস্তি ফিরে পেতে থাকে।

কিন্তু সুখ বোধহয় সব সময় খুব ক্ষন স্থায়ী হয় । অস্থির চিত্তের স্বামী আবার বহির্মুখী হতে থাকে।আসলে এই বন্ধু মহল আর তাসের আড্ডার ভেতরে সে যে মজার রসদ পেয়েছে, এ ছাড়া জীবন সে  ভাবতেই পারে না। বাড়ির সবার কাছে, এগুলো স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু মিলি একটা দ্বিধার মধ্যে থাকে সবসময়। কখনও বর কে চেনা লাগে, কখনও বা অচেনা লাগে।

তার মনে হয়, এ কেমন দ্বন্দ্ব জীবনের, তার জীবন টা এমন হলো কেন? কখনও বাবা, ভাই দের এমন দেখেনি, তার ভাসুর এমন না, তার বেলায়  এমন হতে হলো?

অথচ এই মানুষ টা কে নিয়ে কতরকম করে কল্পনা ছিল তার মনে, এমন করে তো ভাবেনি কখনও যে সংসারে এসে ভয়, বিশ্বাস, উৎকণ্ঠা এমন করে প্রেম, ভালবাসার সাথে গুলিয়ে যাবে! 

চলবে…

গল্পের পূর্বের অংশ পড়ুন

জীবন তরী (পর্ব: মাতৃত্ব)

 

Similar Articles

Leave a Reply