You are here
নীড়পাতা > শিল্প ও সাহিত্য > জীবন তরী (পর্ব একাকী ২)

জীবন তরী (পর্ব একাকী ২)

Your ads will be inserted here by

Easy Plugin for AdSense.

Please go to the plugin admin page to
Paste your ad code OR
Suppress this ad slot.

অনন্যা হক

সংসার টা বিরাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন খাঁ খাঁ মরুভূমি।

দুজন মানুষের সংসার, তেমন কাজ আর রান্না খাওয়া নেই। কাজ শেষে, দুপুরে একটু গড়িয়ে, আসরের নামাজ পড়ে, বারান্দায় চেয়ার পেতে, মিলি রহমান বসে আছে ।

দূরে আম গাছের ঝোপের আড়ালে, সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে, আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে, সূর্য অস্ত যাচ্ছে ।

আশেপাশে শুধু পাখির কিচিরমিচির শব্দ, আর কোন শব্দ নেই ।

নেই কোন কথা, হাকডাক, হাসি, পদচারণার শব্দ ।

মিলি রহমান নিজের মধ্যে আত্মস্থ হয়ে গেল ।

বড় উঠান ঘেরা বাড়ি ।চারিদিকে ঘর।

দূরে রান্না ঘরে, নূরীর মা বসে রান্নার জোগাড় করছে। খাবে এই দুই মহিলাই।সে নিশ্চুপ কাজ করে যাচ্ছে। কি কথা বলবে, কার সাথে বলবে। তারও ভাল লাগে না, এই গমগমে বাড়ি টার এই বিরাণ চেহারা ।

অনেক বছর যাবত কাজ করে সে এই বাড়ি তে ।

মিলি রহমান তাকিয়ে আছে দূরে, আকাশের দিকে।ভাবছে,তবুও তো সূর্য টা লাল আভা ছড়িয়ে, প্রতিদিন ডোবে।

আমিও তো ডুবে যাচ্ছি, একটু একটু করে ।কোন আভা কি ছড়াতে পারি!

এক সময় সকালের সূর্যের আলোর মত, মৃদু থেকে জ্বলজ্বল করতে করতে, তোমার জীবনে, এই ভরা সংসারে এসে ঢুকেছিলাম হাজার তারার স্বপ্ন নিয়ে, মনে মনে তোমার হাত ধরে, এই বড় উঠান পেরিয়ে, তোমার ঘরে ঢুকেছিলাম । ভয়, উৎকণ্ঠা, লজ্জা, এক বুক ভালবাসা, স্বপ্ন মাখা চোখে, এই বাড়িতেই ঢুকেছিলাম ।

প্রথমে একান্ন-বর্তি পরিবার, তারপরে একক পরিবার, এরপরে শুধু তুমি আর আমি। এখন তুমিও আমাকে একা করে, ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে।

আমি এখন একা থেকে আরো একা, যেন নিজের থেকেও মাঝে মাঝে বেরিয়ে কোথায়

হারিয়ে যায়। একটা ভয় এসে দানা বাঁধে মনে। একটা অনিশ্চিত, ভাসমান জীবনের ভয়।

আমি কতদিন এই সংসার আর নিজেকে ,ধরে রাখতে পারবো?

আমি তো অস্ত যাওয়া সূর্যের মত বিলীন হয়ে যাচ্ছি ।

সন্তানেরা চায়, তাদের জন্য, একটা বাড়ির জন্য, আমি যেন শক্ত থাকি, নিজেকে ধরে রাখি, ঠিক থাকি। তাদের আমি কেমন করে বোঝায়, আমার এখন কোন রঙের আভা নেই, আমি কি ছড়াবো, তোদের মাঝে!

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটা নিঝুম পুরি যেন।কোন শব্দ নেই, শুধু ঝি ঝি পোকার ডাক কানে আসছে। আমি তো এমন চাইনি। আমি তোমার, তোমার সন্তানদের কন্ঠ, হাসি, হাঁটার শব্দ শুনতে চাই। তোমাদের জ্বালাতন সহ্য করতে চাই, সবার জন্য খেটে মরতে চাই ।

কোথায় চলে গেলে একা ফেলে? এমন ভেবে তো, তোমার সাথে আসিনি। এমন হবে বলে তো, আমাকে এ বাড়ি তে আননি! কোথাকার অন্য বাড়ির একটা মেয়ে কে, শেকড় উপড়ে তুলে এনে, সবাই মিলে আপন করে দিলে এ বাড়ির।

অনেক কষ্ট বুকে চেপে তোমাদের সবার আপন হয়েছিলাম, এমন করে ফাঁকি দেবে বলে? এখন তো এটাই আমার সংসার, ঠিকানা। তবুও ঠিকানা বুঝতে দিশাহারা লাগছে কেন? আমি কে, কাদের মেয়ে, তারাই বা কোথায়? তুমিই বা কোথায় গেলে? কোথায় তোমার হাকডাক?  মসজিদ থেকে ফিরতে, বাজার করে ফিরতে, নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ফিরতে, তবুও তো ফিরতে ।সন্তানেরা কাছে নেই, তোমাকে ঘিরে বেঁচে ছিলাম ।

বিশ্বাস কর তুমি, তোমার সব খারাপ ভুলে গেছি আমি, ক্ষমা করে দিয়েছি।সংসারের কোন জ্বালা, যন্ত্রণার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে সব মধুর স্মৃতি, সেই প্রথম দিন থেকে কত শত হাজার স্মৃতি, মনে পাহাড় সমান হয়ে জমে ছিল। সেই স্মৃতির পাতা  উল্টে যাওয়াই এখন আমার নিত্যদিনের কাজ।

এখন মনে হয়, আমৃত্যু কষ্ট করতে পারতাম তোমার জন্য, শুধু যদি পাশে থাকতে ।

আমি যে এই সংসার, আমার, তোমার ঘর বড্ড ভালবাসি।

আমি ভাসমান হতে চাই না। সন্তানেরা যেতে বলে তাদের কাছে। আমার তো সংসার, এই দায়িত্বই ভাল ছিল ।

এত স্বাধীনতা, এত আরাম তো, আমি চাইনি । তোমার সংসারের প্রতিটি জিনিসের সাথে, মায়ার বাঁধনে আটকে আছি আমি ।

আমার ঘর, আমার বিছানা ছাড়া ঘুম আসে না আমার।সংসারের কোণে কোণে আমাদের ভালবাসা, মায়া, অভিমান, খুনসুটি, জ্বালা ,যন্ত্রণার ছবি। সন্তান দের বেড়ে ওঠার ছবি। কোন ঠিকানায় গিয়ে আমি এসব পাব?

আমি তো ভাসমান হতে চাই না।আমার ফিকে হয়ে যাওয়া আভা ছড়িয়ে, আমি এখানেই বিলীন হয়ে যেতে চাই ।

একেবারে সন্ধ্যা নেমে গেল। মিলি রহমান কথা বলে উঠলো ।

‘নূরির মা কাজ রাখ তো, এখানে এসে বস। দুটো কথা বলি। দম আটকা লাগছে, এক গ্লাস পানি দাও। কাছে কিছু ক্ষণ বসে থাক’।

তার সাথে সংসারের কিছু পুরোনো কথা বলে, তার কাছে তার বাড়ির খোঁজ খবর নেয়।জিজ্ঞাসা করে, তুমি কেন ছেলে মেয়ে কারো বাসায় গিয়ে থাকতে চাও না ।

নূরীর মা বলে, যত দিন গায়ে শক্তি আছে, কারো বোঝা হতে চাই না ভাবী।যখন  আর পারবো না, সেই কথা ভেবে  বরং ভয় পাই। আছি তো ভাল আপনার কাছে।

মিলি রহমান বলে, যাও তুমি কাজে যাও।

এর নামই কি জীবন? বাকি জীবন কিভাবে মিলি এই জীবন তরী বয়ে নিয়ে যাবে? বয়ে বয়ে কোন ঠিকানায় পাড়ি জমাবে? জীবন তরীর শেষ ঠিকানা, মিলি রহমানের জানা নেই ।

খুবই বিষন্ন মনে সে ঘরের দিকে উঠে চলে যায়।

চলবে

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

জীবন তরী (পর্ব: আমার আমি )

 

 

Similar Articles

Leave a Reply