You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন তরী (পর্ব: একাকী শেষ খন্ড)

জীবন তরী (পর্ব: একাকী শেষ খন্ড)

অনন্যা হক

মিলি পর দিন সকালে তার ঘরের আলমারি টা খুললো। বারান্দায় সুন্দর রোদ পড়েছে । রিফাতের শার্ট গুলো রোদে দেবে। আলমারির পাল্লা টা খুলেই মিলির চোখ গিয়ে পড়লো এক কোণায় পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো বিয়ের শাড়িটার উপর। স্হির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আবার আলমারিটা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসে থাকলো ।

মনের ভেতরে সেই বিশ বছরের মিলি ঢুকে পড়লো। এই বিছানায়ই এসে বসেছিল প্রথম রিফাতের পাশে। রিফাত বলেছিল, কেমন আছ, আরো কাছে এসে বস।

হাতের আংটি টা ছুঁয়ে দেখলো। সেই যে রিফাত পরিয়ে দিয়েছিল বিয়ের রাতে, আর কখনও খোলেনি আজ অবধি ।

ঘরে রিফাতের যে জিনিসটা যেখানে ছিল, ঘড়ি, চশমা, চিরুনি, জুতা, কিছুই মিলি একচুলও নড়চড় করেনি এখনও পর্যন্ত।

বিছানায় পাশের বালিশ টা একাই পড়ে থাকে,আজ তিন মাস ধরে।শূন্য জায়গা টা হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখে।

পায়ের কাছে একটা কাথা থাকতো, সেটাও মিলি যত্ন করে তেমনি ভাবে ভাজ করে রেখে দেয়।

চোখের পানি আটকাতে পারে না। মিলি শূন্যতা ঘিরে বসে থাকে আর ভাবে, কত ঝগড়া করেছি, বিরক্ত হয়েছি,

অভিমান করে দূরে থেকেছি। তুমি বুঝতে পারনি আমাকে, তাই অভিমান হয়ে গিয়েছিল পাহাড় সমান। আমি আর ডিঙোতে পারিনি সে পাহাড়।

বিশাল বটগাছের ছায়া মাথার উপর থেকে সরে গিয়েছে।

এ কেমন বিষাদ? কাকে দিয়ে পূরণ করবে সে এই শূন্যতা? দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বন্ধন, একই ছাদের নীচে বসবাস। না থেকেছে বাবা মা এর সাথে এতদিন, না থেকেছে সন্তানের সাথে। যখনই কোন কষ্ট পেয়েছে, মিলি ভেবেছে, থাক সহ্য করে যাই, সামনে বোধহয় ভাল দিন আসবে। এমন করে করেই এতদূর পাড়ি দিয়ে আজ এখানে । এখন বিরাণ একটা পথে একাকী হেঁটে যাচ্ছে মিলি । জুটি ভেঙে গিয়েছে।

এমনই হয় জুটি ভাঙ্গার গল্প । কখনও রিফাত আগে যায়, কখনও বা মিলি আগে যায় । সহযাত্রীর বিদায় হয়ে যায়।জীবন তরী একা বয়ে নিয়ে যেতে হয় । কিন্তু কতজন মিলি বলে যেতে পারে তার এই জীবনের গল্প?

এমনই তো জীবন । প্রেম, ভালবাসা, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, আর মায়া, আরও কত কি একসাথে বহন করে মানুষ হেঁটে চলে ।এক এক পরিস্থিতিতে এক একটা প্রকট হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ।

দূরে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত শক্তিশালী বন্ধন মায়া, জীবন চলার পথে শক্তি জোগাতে থাকে।যখন কাছের মানুষ চিরতরে চলে যায়, ঐ মায়া জ্জ্বলজ্বল করতে করতে মনের ভেতরে এসে গেঁথে যায়। সব খারাপ যেন একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় এসে ধুয়ে মুছে নিয়ে মন টা কে শুধু মায়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে।

তখন কি মিলিরা দিন গুনতে থাকে, আমিও কবে যাব ঐ সহযাত্রীর পথ ধরে? কিন্তু আবার সেই মায়া এসে পথ রুখে দাঁড়ায়। এই বিশাল পৃথিবীতে জীবনের অমূল্য সন্তানদের রেখে, তুমি যাবে কিভাবে?

সন্তান দের মায়া ভরা মুখ গুলো ভেসে ওঠে চোখে।

শেষ

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

জীবন তরী (পর্ব একাকী ২)

 

 

Similar Articles

Leave a Reply