You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন এক বহতা নদী (৯)

জীবন এক বহতা নদী (৯)

Your ads will be inserted here by

Easy Plugin for AdSense.

Please go to the plugin admin page to
Paste your ad code OR
Suppress this ad slot.

রোমেনা লেইস

রূপাদের ছিলো একান্নবর্তী পরিবার। তিন চাচা-চাচী, চাচাত ভাই,বোন সবাই মিলে একসাথে বড় হয়েছে। জায়নামাজে নামাজ শেষে তসবিহ টিপতে টিপতে রূপার মা ওদের ডাকতেন। দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। তারপর ওদের অনেক উপদেশ দিতেন। মা চুলে বিলি কেটে আদর করে করে বলতেন -ছেলেরা মেয়েদের কাছে আসতে চায় সবসময়।নিজের চারপাশে একটা সুরক্ষা দেয়াল তৈরি করে নিয়ে চলতে শিখতে হবে। বাবা চাচারা শহরের ঐতিহ্যবাহী পরিবার।পরিবারের ঐতিহ্য মান মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে এমন কিছু কথনো করা যাবে না। মা বিএ এম এ পাশ ছিলেন না।কিন্তু মা সবসময় এভাবেই ওদের বলতেন ভাল মন্দের পার্থক্য। ওদের বাবা ছিলেন বিরাট ব্যবসায়ি। আদমজী জুট মিল আর ইস্পাহানীর শেয়ার ছিলো। হোসিয়ারি মিল ছিলো। জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের চা বাগানেও শেয়ার ছিলো। বাবার ব্যস্ত জীবন ছিলো। কিন্তু মা ছিলেন সকল সন্তানদের পরম আশ্রয়। নির্ভরতার স্থান। জলপাইগুড়ি ছেড়ে ওরা মাইগ্রেশন করে চলে আসে সেই পার্টিশন এর পরপর। একটা দেশ দ্বিজাতি ত্বত্তের ভিত্তিতে দুইভাগ হলো। পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পাকিস্তান আর হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিন্দুস্থান। ওরা মুসলিম তাই পাকিস্তানে পাড়ি জমালো। তিন্নি, তিয়ার বিয়ে দিয়ে একা চলাচলে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো রূপা।জীবন তাকে শিখিয়েছে একা চলার মন্ত্র।নিজের চারপাশে গাম্ভীর্যের এক বলয় তৈরি করে কীভাবে নিজেকে সেফ রাখতে হয় রূপা শিখেছে রূপার মায়ের কাছে। কর্নেল আজিজুল হককে রূপা দৃঢ় অথচ নম্র ভাবেই প্রত্যাখ্যান করল। রূপা উনাকে বুঝিয়ে বলে যে বিবাহিত জীবনে রূপা এতো সুখী ছিলো যে সে জীবনের দৈর্ঘ্য বেশী না হলেও সে পরম সুখী। আর সেই সুখস্মৃতি তাকে বাকীটা জীবন বেঁচে থাকতে প্রেরণা আর সাহস জোগাবে।তার মেয়েদের রূপা সব কিছুই শেয়ার করে।মেয়ে আর মেয়ে জামাইরা যদিও চায় রূপা ভাল থাক। সে চাইলে নতুন সঙ্গী নিয়ে সুখী হতে পারে।ওরাও তাতে সুখী হবে। কিন্তু রূপার ভাবনা ভিন্ন।একবার রূপার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় ওর বোনের মেয়ে বেড়াতে এসেছিলো। কয়েকদিন থাকার পর বললো -খালামনি তোমার সংসার দেখে আমার না পড়ালেখা বাদ দিয়ে বিয়ে করতে মন চাচ্ছে। এমন বিবাহিত জীবন আর এমন সাজানো গুছানো পরিপাটি ছিলো তার সংসার। হোমইকনোমিক্স কলেজ থেকে বেড়াতে আসতো ভাসুরের মেয়ে। সেও বলতো -চাচী আপনি এতো সুন্দর আর সুখী।কী সুন্দর মিলমিশের জীবন আপনার। আপনার সংসারের মতো একটা সংসার আমি চাই চাচী। কর্নেল আনিসকে নিয়ে রীতিমত অহংকার হয় রূপার। তার কাছেই ভালবাসার প্রথম পাঠ রূপার। জীবনের তাল, লয়, ছন্দ, বর্ন, গন্ধ সব চিনেছে রূপা তার হাত ধরেই। ফোনটা বাজছে। -কে? -আন্টি আমি ..মহুয়া। -কেমন আছ মা মৌ? -আন্টি আপনি ভাল? -আছি মোটামুটি ভালই মা। -আন্টি একটু যদি আমাদের বাসায় আসতেন।বাপীর শরীর আজ খুব খারাপ । -আচ্ছা আমি আসছি। বারিধারা ডিওএইচএস এ চমৎকার সাজানো বাড়ি কর্নেল হকের। মিসেস হক মারা যাবার পর একাই বাবুর্চি, দারোয়ান আর কেয়ারটেকার নিয়ে এই বাসায় আছেন তিনি। ছেলে মাসুম মায়ের মৃত্যুর পর এসেছিলো একবার। আর আসেনি। এবার মেয়ে মহুয়া এসেছে। ঘরে ঢুকলো। মেয়ে আর বাবা ঘরে। -কী ব্যাপার ভাই, আবার কী হলো বলেনতো? -আন্টি আব্বা আমাদের কারো কথাই শোনেন না। ভাইয়ার কাছেও যাবেন না। আমার কাছেও না। এখন আব্বার দায়িত্ব আপনি নিলে আমরা একটু স্বস্তি পাই। রূপা বলে -মৌ মা তুমি বিদেশে থাক। তোমার চিন্তা ভাবনা পাল্টে গেছে। কিন্তু মা আমি দুই মেয়ের মা।আমার জন্য এটা লোভনীয় অফার। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া দুই দেশে যেতে পারবো যখন তখন।দুই টা উচ্চশিক্ষিত ছেলে,মেয়ের মা হয়ে যাব এক ঝটকায়। -কিন্তু মা গো আমি না এতো কিছু চাই না। আমার জীবনে যতটুকু পেয়েছি তত টুকুতে আমি সুখী। আমার মেয়েরা যেন সুখে থাকে সেটাই আমার চাওয়া। কর্নেল হক এবার কথা বলেন -ভাবী আমি আপনার এই এলিগ্যান্ট রূপটার কারণেই আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ছিলাম। আমার হাত ধরলে আমি বাকী পথটুকু আনন্দে কাটাতাম। আমার দীর্ঘ এই কর্মময় জীবনে আমি আপনার মতো এমন ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন নারী দুইটি দেখিনি।এমন ভদ্র মার্জিত অমায়িক মানুষ। আপনাকে পাশে পেলে আমার জীবন ধন্য হতো। রূপা কর্নেল আনিসের ট্রেনিং কালীন ছবি দেখছিলো। পাকিস্তানের কোয়েটায় বরফে আচ্ছাদিত এক পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে সশস্ত্র তিন কোর্সমেট। ফোন বাজলো। মোবাইল।স্ক্রীনে কর্নেল হক ভেসে উঠলো । -হ্যালো।সালাম ভাই? -জী না আন্টি আমি মৌ। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মৌ। আন্টি আব্বু চলে গেলেন। জীবন নিয়ে ভেবে কূল কিনারা পায় না রূপা। আকাশের দিকে চেয়ে ভাবে মরে গেলে তারা হয়ে যায় সবাই, তবুও মানুষে মানুষে কতো হিংসা, রেষারেষি। প্রিয় মানুষের মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ হয়।

শেষ

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

জীবন এক বহতা নদী (৮)

Similar Articles

Leave a Reply