You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > জীবন এক বহতা নদী (৪)

জীবন এক বহতা নদী (৪)

রোমেনা লেইস

রূপাকে একটা গাড়ি কিনে দিয়ে গেছে বড় মেয়ে। আর ড্রাইভারও রেখেছে। কোথাও যাবার দরকার থাকলে যায়। আজ সিএমএইচে যাচ্ছে ।শরীরটা খারাপ লাগছে। খাওয়ার রুচি নাই।ডায়রিয়ার মতো হয়েছে।মাথা ঘুরে পড়েই যাবে মনেহয়। এতো দূর্বল লাগছিলো। কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসার পরপরই অসুস্থ মাকে প্লেনে করে নিয়ে আসলো বড়ভাই।ও ছাড়া ঢাকায় তখন আর কেউ নাই। মাকে নিয়ে ছুটাছুটি। শহীদ মঈনুল রোড আর সিএমএইচ।তারপর একরাতে মা চলে গেলেন। মাকে হিমঘরে রাখা হলো। মা’র একছেলে আর একমেয়ে দেশের বাইরে। বড়মেয়েও দেশে আরেক প্রান্তে। আর বাবার কবরের পাশে কবর দিতে হবে, সেজন্য কফিনে চাপাতা দিয়ে প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া হলো। মনটা মা ,বাবা, তিন্নীর বাবা,ভাই এর মেয়ে তাদের জন্য পুড়ছে। আচ্ছা যারা মারা যান, তাদের সবাই কী আকাশের তারা হয়ে যান? তাদের সবার কী দেখা হয়? তাদের কী কথা হয়? সিএমএইচে সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দিয়ে বাসায় ফিরে সোজা বাথরুমে ঢুকলো। গোসল সেরে বের হলে আছিয়া বলে, আম্মা হক স্যার ফোন দিছলেন। আপনে আসলে কল দিতে বলছে। গোসল করে বের হয়ে অল্প একটু খাবার খেয়ে লেপের ভিতর শুয়ে পড়ে। প্রচন্ড শীত লাগছে।বমি বমি লাগছে। কলিংবেল বাজলো -আছিয়া কে? দরজটা খুলে দে রে। এটুকু বলার শক্তি নাই। মাথার ভিতরে যেন একশটা জেট ফাইটার এসে ঢুকে গেলো। জ্ঞান হারালো রূপা। আছিয়া দরজা খুলে দিলো তিয়া আর ওর বর ইমরান এসে ঢুকলো। আছিয়া বেডরুমের দরজায় এসে বললো, ছোটআফা আসছে আম্মা। লাইট জ্বালাই? কোন উত্তর নাই। তিয়া পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলো। মা, ওমা সিএমএইচ এ গেছ কেন? শরীর কী বেশী খারাপ? আম্মু ঘুমাচ্ছ? বেডসাইড লাইটটা জ্বালিয়ে মুখে ঝুকে দেখে কোন সাড়াশব্দ নাই। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মা মা আম্মু…ইমরান এদিকেআস।পালস এ হাত দিয়ে দেখে স্লো। ইমরান বললো, আম্মু সেন্সলেস হয়ে গেছে। তিয়া এম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিতে বলো হক আঙ্কেলকে। কাঁপতে লাগলো তিয়া।

-আঙ্কেল আম্মু সেন্সলেস হয়ে গেছে।এম্বুলেন্স প্লীজ।কাঁদতে লাগলো।

-মা কেঁদোনা। আমি এম্বুলেন্স পাঠাচ্ছি। আমিও সিএম এইচ এ আসছি।

সি এম এইচের ইমার্জেন্সীতে ভিতরে নেষার সময় একবার কী ওর হাত চেপে ধরে ছিলো আম্মু? কী হয়েছে মা আমার? বিড়বিড় করে বলেছিলো কি? তিয়া বন্ধ দরজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তিন চারটা দিন ঘুম আর আধা জাগরনের মধ্য দিয়ে পার হলো। সব পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। জ্বরে গা পুড়ে যায় কখনো কখনো। এম আর আই, ব্লাড টেস্ট,ইকেজি ইসিজি, ইউরিন টেষ্ট, স্টুল টেস্ট ,এক্স রে সবই করা হলো। তিয়া রাত বারোটায় বাড়ি ফিরে আসে। ওর ছেলে তৈমুর ছোট। ক্লাস টু তে পড়ে। সকালে স্কুলে দিতে হবে। দুদিন থেকে ওর শাশুড়ি নিয়ে যান স্কুলে। -আজ দাদুর সাথে যাব না।মাম্মা আমি তোমার সাথে যাব।

-জেদ করো না বাপী। তুমি আমার কলিজা বাচ্চা। নানুমনির জন্য দোয়া করো।যেন ভাল হয়ে বাসায় চলে আসে। তাহলে আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। প্রতিদিন তোমাকে আমি দিয়ে আসব, আবার নিয়েও আসবো।

তিয়ার মোবাইল বাজলো।

-আপুনী মা এখন কেমন? বড় বোন তিন্নী কাতার থেকে ফোন করেছে।ওর হাজবেন্ড দোহার বড় এক হসপিটালে মেডিসিন স্পেশালিস্ট।

-বুবু দোয়া দরূদ পড়তে থাকো। আজ ডায়াগনোসিস রিপোর্ট দিবেন ডাক্তাররা। মা কেন যেন বেশী দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

-ভয় পাসনে আপুনী। আমাদের এই পৃথিবীতে মাছাড়া আর কেউ নেই। আল্লাহ আম্মাকে ভাল কর দিবেন।

তিয়া গাড়িতে বসে আছে।। গাড়ি সিএমএইচে যাচ্ছে। মা ফিরবে তো? ওরা দুইবোনের মা ছাড়া আর কে আছে। আজ শুক্রবার। মসজিদের সামনে থেমে ড্রাইভারকে দিয়ে একহাজার টাকা পাঠালো। মায়ের জন্য দোয়া করতে। তিয়া জানে ওর নিজের দোয়া কবুল হবে আল্লাহর কাছে। মন যখন ভীষণ দুর্বল, তখন মানুষ মাজার দরগাহ এসবেও বিশ্বাস করে। দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে সিএমএইচে পৌঁছালো।

চলবে…

গল্পের আগের অংশ পড়ুন

জীবন এক বহতা নদী (৩)

 

Similar Articles

Leave a Reply