You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > ঘুরে এলাম চকলেট ওয়ার্ল্ড ও একজন চিত্রশিল্পীর নীড়

ঘুরে এলাম চকলেট ওয়ার্ল্ড ও একজন চিত্রশিল্পীর নীড়

রোমেনা লেইস

ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের নিউ ইয়ার হলো রস হাসানা (Rosh Hashanna)। এই উপলক্ষে নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুল দুই দিন ছুটি ।আর শনি রোববারের ছুটি এর সাথে যুক্ত হয়ে বাড়তি পাওনা লং উইক এন্ড পেয়ে গেলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী হারসে চকলেট ওয়ার্ল্ড এ ট্রিপের সাথে সাথে ওয়াশিংটন ডিসি যাওয়ার ছক করা হলো।হ্যারিসবার্গ এ দুইদিনের জন্য হোটেলে রিজার্ভেশন করলাম।আবহাওয়া চমৎকার থাকবে এই সপ্তাহে ।

আম্মা ১৯৯৬ এ যখন এসেছিলেন তখন নাকি ওয়াশিংটন ডিসি দেখতে যেতে পারেননি।তাই বাচ্চাদের হারসে চকলেট ওয়ার্ল্ড এর সাথে সাথে আম্মার জন্য ডিসিও এড করলাম।সাথে সময় থাকলে আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ যাবার ইচ্ছা মনে মনে।

হারসে চকলেট ওয়ার্ল্ড পেনসিলভেনিয়ার হেরিসবার্গে অবস্থিত।কীটকেট,রীসেস, হারসে,কীসেস নানা বর্ণের নানা স্বাদের চকলেট কী সুন্দর তৈরি হচ্ছে। এ এক মজাদার জগৎ।বাচ্চারা তাদের পছন্দমতো চকলেট নিয়ে নিলো।

তারপর আমরা গেলাম ওয়াশিংটন ডি সি। হোয়াইট হাউস আর মনুমেন্ট দেখে অনেক হাঁটতে হয়, তাই ক্যাপিটাল হল দূর থেকে দেখেই চলে গেলাম।

আমার শহর সুনামগঞ্জের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী সুনীল শুক্লা দাদা আর তৃষ্ণা শুক্লাদিদির আমন্ত্রণ ছিলো তাঁদের মেরিল্যান্ড এর বাড়িতে একবার যেন যাই আমার আম্মাকে নিয়ে।আমারও ইচ্ছে একজন শিল্পীর জীবনযাপন দেখে আসি।হেরিসবার্গের হোটেলে থেকে ওয়াশিংটন ডিসি যেতে পথেই তাঁদের বাড়ি।আমরা ফেরার পথে তাঁদের বাড়ি গেলাম।

বহুদিন আগে শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুসের ঝিগাতলার বাসায় গিয়েছিলাম ।আর এতো বছর পর গেলাম আরেকজন চিত্রশিল্পীর বাড়ি।চমৎকার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম। সন্ধ্যার আঁধার ঢেকে দিয়েছে চারিপাশ তবুও তৃতীয়া তিথির চাঁদ কিছুটা আলো ছড়িয়ে ছিলো। সিঁড়ি থেকেই শিল্পিত মানিপ্ল্যান্ট আর দাদার আঁকা নানা ধরনের ছবি।

লিভিং রুমে ঢুকে আমি মুগ্ধ নির্বাক। ভালবাসার এমন স্বপ্ন অনেকেই দেখে।কিন্তু তৃষ্ণা দির সৌভাগ্য ।দাদার আঁকা চমৎকার একটি ছবি পুরো দেয়াল জুড়ে।ভালবাসার মানুষকে নিয়ে মানুষ গল্প কবিতা লেখে। তাজমহলের কথাও আমরা জানি। ছবি আর আঁকতে পারে কজন? মোনালিসার ছবি দেখেছি আর ভেবেছি । কীভাবে প্রিয়তমার ছবি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে শিল্পীরা।আজ চোখের সামনে রক্তমাংসের প্রেমিক দেখলাম। যিনি নিজ হাতে তিলতিল করে ফুটিয়ে তুলেছেন আপন প্রিয়তমার ছবি।অপূর্ব সেই সৃস্টি ।অসাধারণ।

শিল্পী সুনীল শুক্লার জন্ম সুনামগন্জ এ ১৯৫৩ সালে।সোনার চামচ মুখে নিয়ে যাদের জন্ম দাদা তাদের দলে নন।লক্ষ্য স্থির রেখে বহু কাঠ খড় পুড়িয়ে আজ দাদা একজন স্বার্থক মানুষ।রঙ তুলিকে সাথে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পাশ করেছেন ১৯৭৭ সালে।। তারপর চলে আসেন ইউ এসএ।মেরিল্যান্ড এ আছেন দীর্ঘ সাতাশ বছর।ক্রমাগত এঁকে চলেছেন।এখন চলছে তার নিরীক্ষাধর্মী আঁকা।প্রকৃতি,ল্যান্ডস্কেপ, নদীতীর,গ্রামের জীবন, জীবনের নানা ছবি আঁকতে ভালবাসেন।গত পঁচিশ বছরে একক ও যৌথ অনেক গুলো আর্ট এগজিবিশন করেছেন।

তাদের দুই মেয়ে, এক ছেলে।বড়মেয়ে সুদেষ্ণা শুক্লা তিন্নি, পেশায় আর্কিটেক্ট। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত। আঠার বছর বয়সে সাইরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ে মনুমেন্ট এর ডিজাইন করে প্রথম হয়েছিলো ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছিলো তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ সুদেষ্ণার করা ডিজাইনের মনুমেন্ট তৈরি হয় কাইন্টডাউন কাউন্টিতে ।একজন স্থপতি হিসেবে তার এই কাজে বাবা মায়ের সাথে সাথে সে আমাদের দেশের মুখও উজ্জ্বল করেছে।

সুজয় শুক্লা একমাত্র ছেলে।বর্তমানে ভেরাইজন ওয়ারলেস এর কর্পোরেট অফিসে কাজ করছে মেরিল্যান্ড এ। ছোটমেয়ে মাস্টার্স করেছে সাইকোলজীতে দেলোয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে।বর্তমানে নিউজার্সী তে জব করছে।

বেইসমেন্ট এ দাদার নিজস্ব জগৎ।শিল্পীর জগৎ ।আঁকাআকির জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম  আর দেয়াল জুড়ে সব শৈল্পিক সৃষ্টি ।১৯৭৪ সালে সুনামগঞ্জের নতুন রেস্টহাউসে এক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিলো, সে সময় প্রথম দেখেছিলাম দাদার চিত্রকর্ম। সুরমানদী ,নৌকা ,মেঘালয় পাহাড় ,ঢেকি পাড়, রিকশা,রমণী,মাছ ধরা এগুলোই ছিলো বিষয় বস্তু।এখন এবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকেন বেশী।আগে জল রঙ এ কাজ করতেন বেশী।জল রঙ আর তেল রঙের কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।উত্তর আমেরিকার ফলের ছবি,ডিসির চেরীব্লসম, ল্যান্ডস্কেপ, হারবার এগুলো যেন জীবন্ত চিত্রপটে আঁকা।
তৄষ্ণাদি প্রচুর রান্না করেছেন। রাতের ডিনার করে হোটেলে ফিরলাম ।দাদা তাঁর শিল্পজগতে আমাকে যেকোন একটি চিত্র বেছে নেয়ার সুযোগ দিলেন।এক মূহুর্ত মনে হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছবিটি বেছে নেই। না তা হয় না।সুযোগটা দাদার হাতেই ছেড়ে দিলাম । দাদা আমাকে তাঁর আঁকা অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্যের অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকর্মটি দিলেন।আমি কৃতজ্ঞ । একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এই চিত্রকর্মটি আমার খুব পছন্দ হলো।

দেশকে ভালবেসে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন সুনীল শুক্লা দাদা ।তাঁর কাছে যুদ্ধের গল্প শুনবো আরেকদিন।সময় কম থাকায় এবার ছবি নিয়ে অল্প কথা হলো।প্রচারবিমুখ সুনীল  দাদা ও আমাদের প্রাণোচ্ছল তৃষ্ণাদিদির সুখী ও সম্বৃদ্ধ জীবন কামনা করি।

 

 

Similar Articles

Leave a Reply