You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > কেতকী

কেতকী

রোমেনা লেইস

শপাং শপাং করে কোমরের বেল্ট দিয়ে মারতে থাকে রইস খান।কেয়া নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে  দরজা বন্ধ করে।কিছুক্ষণ দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে ।
-বাহার আও।স্টুপিড গার্ল। আ যাও বাহার। বাঙাল লারকী।হুঙ্কার শুনে থরথর করে কাঁপতে থাকে বাথরুমের ভেতরে কেয়া।

লাথি দিয়ে দিয়ে রইস খান এক সময় থেমে যায় ।সে প্রচুর ড্রিংক করেছিলো । দামী শাড়ি, ডায়মন্ডের গহনা পরা অবস্থায় মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকে কেয়া।মায়ের আদরের কেয়া, বাবার আদরের  কেতকী। বাথরুমেই রাত কাটে কেয়ার।

কেয়া বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।মেট্রিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে।অপূর্ব সুন্দরী।গায়ের রঙ বাদামের মত।কালো চুল প্রায় হাঁটু সমান।ডিম্বাকৃতি মুখাবয়বে কী যে স্নিগ্ধতা মাখানো।যেমন মায়াবী চোখ, তেমনি গোলাপী ঠোঁট ।পাতলা খাড়া নাক।বাবা আদর করে কেটি ডাকেন।কেতকী ডাকেন।তবে মা কেয়াই ডাকেন।  গাইবান্ধা কলেজে যায় আসে রিকশায়।গানের গলা খুব চমৎকার ।মফস্বল শহর আলো করা এক মেয়ে।শহরের যুবকদের হার্টথ্রব।

খন্দকার জহিরুল নামে এক যুবকের সাথে মন দেয়া নেয়ার প্রথম পাঠ শুরু হয়েছে কেবল।রাজশাহী বেতার এ নিবন্ধনকৃত শিল্পী সে।সরকারী এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে যায় শিল্পকলা একাডেমীতে।এসডিও আর ম্যাজিস্ট্রেটদের স্ত্রীরা ছিলেন আর ছিলেন প্রিন্সিপাল স্যার ।

পরদিন বিকেলবেলা প্রিন্সিপাল স্যার সাথে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে ওদের বাসায় আসলেন। কেতকীর ডাক্তার বাবার সাথে ড্রয়িংরুমে বসে কথা বললেন ।চা নাশতা খেয়ে রাতের খাবার খেয়ে তারপর চলে গেলেন।

পরদিন কলেজ  থেকে ফেরার পর আব্বা আর মা ওকে কাছে ডাকলেন।বললেন
-কেয়া তোমার প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে যে ম্যাজিস্ট্রেট আসলেন উনি রইস খান।সিএসপি অফিসার ।প্রথম পোস্টিং আমাদের মহকুমায়।উনি গতকাল তোমার গান শুনেছেন।তোমাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে।প্রিন্সিপাল স্যার নিজে উনার সম্পর্কে এসডিও সাহেবের কাছে  খোঁজ নিয়েছেন এই যে তার ছবি।আমাদের পছন্দ  হয়েছে। তুমি পড়ালেখা করতে পারবে।গানও করতে পারবে।লজ্জা পেয়ে ঘরে ছুটে চলে যায় কেয়া।মা ছবি নিয়ে আসেন বললেন -মারে তুই দেখতে ভাল। গুণ আছে।ভাল ছাত্রী তবুও এতো ভাল বিয়ের প্রপোজাল আসবে ভাবিনি কখনো।কোন দাবী দাওয়া নাই।আমরা হ্যাঁ বলে দেই?
-না মা এখনি বিয়ে দিও না।অন্তত আই এ টা পাশ করি।
-মাত্র পোস্টিং হয়েছে। এখানে থাকবে অন্তত দুই বছর, ততদিনে আই এ পাশ করে ফেলবি।

কলেজ থেকে ফেরার পথে রিকশায় সোজা চলে গেলো শিল্পকলার রিহার্সেল রুমে।।জহিরুল সবাইকে ইশারায় বাইরে যেতে বলতেই কেয়া জহিরুলের একদম বুকের কাছে এসে  বললো
-বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন।।
চলো আমরা পালিয়ে যাই।
জহিরুল কেয়ার চুলের মিষ্টি  ঘ্রাণ পাচ্ছে ।প্রাণ চায় একলহমায় কাছে টেনে নেয়, পান করে সবটুকু সূধা।ওর কপালে চুলে হাত বুলিয়ে মুখে বলে
-না তুমি যাও।লক্ষিটি।বাড়ি যাও।এ মূহুর্তে তোমাকে বিয়ে  করে কোথায় নিয়ে যাব?কী খাওয়াবো?
আমি কোনভাবেই তোমার যোগ্য নই। তোমার যোগ্য বর তোমার বাবা ঠিক করেছেন।
সহসাই দরজায় গিয়ে বাইরের ছেলেদের ভেতরে নিয়ে আসলো।আর কিছু বলার সুযোগই পেলো না কেয়া।ধীরে ধীরে মাথা নীচু করে বের হয়ে গেল।চোখ বেয়ে গড়ালো জল।কেয়া চোখ মুছে রিকশায় বসলো।বাড়ি গেলো।

রানীর মত সাজিয়ে দিলো মিতা দিদি।শেষবিকেলের সোনালী আলোয় প্রথম দেখা হলো রইস খানের সাথে।লম্বা ফর্সা টকটকে গায়ের রং। নেভী ব্লু স্যুট পরে প্রিন্সের মতো লাগছে ।মুগ্ধ হয়ে গেল কেয়া।জহিরুল খন্দকার এর পাশে এক ভিখারি প্রেমিক। অভিমানে আরো অবহেলা ঝরে পড়ে।

প্রিন্সিপালস্যার এসডিও আর ডিএসপি সাহেবদের স্ত্রীরা এসেছেন।সবুজ কাতান পরা কেয়ার অনামিকায় রিং পরিয়ে দিলো রইস খান।কেয়ার সৌন্দর্যে রইস খানের চোখে পলক পরে না।

আর পরের সপ্তাহে বিয়ে হয়ে গেল।মহা ধুমধামে ডাক্তার রকীবউদ্দিন তার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলেন অবাঙালি সিএস পি অফিসারের সাথে।যার বাড়ি পশ্চিম  পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে ।

সরকারী ডাকবাংলোয় যে  ভিআইপি রুম, সেখানে বাসর সাজানো হয়েছে।লাল টকটকে শাড়ি আর তিনসেট জড়োয়ার গহনা পরা কেয়াকে রাজ ইন্দ্রানীর মতো লাগছিলো।জোৎস্না রাত ছিলো।তুমুল ভালবাসার ভেতর দিয়ে রাত পোহালো। কেয়ার চেয়ে কেটি নামটা নাকি বেশী ভাল। তাই কেতকী তামান্না হয়ে গেল মিসেস খান।আর কেয়া ইতিহাস হয়ে পেছনে পড়ে রইলো।

সরকারী বাসা পেয়ে লাল ইটের কোয়ার্টারে গেল।যখন তখন বন্ধু দের বাড়ি যেতে পারে না।তাতে কী? ভালবাসা আদর রোমান্টিকতা  আর মান অভিমানে বেশ সুখী সুখী ভাব ফুটে উঠেছে চেহারায় শরীরে।

তখনই জানতে পারলো রইস খান লাহোরে বদলি হয়ে গেলো।লাহোরে  জয়েন করার আগে পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে কেটিকে।একমাসের ছুটিতে ওরা রাওয়ালপিন্ডিতে  গেল।
এই এক মাসে কেটি অনেকটা উর্দু শিখেছে। রাওয়ালপিন্ডি যেয়ে  ওকে নিয়ে উঠলো নিজের বাড়িতে। মা বাবা নেই।শুধু এক ভাই আর চাচা-চাচী।অনেক বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা হলো।

লাহোরে বিবাহোত্তর সম্বর্ধনার আয়োজন করলো।অফিসার্স ক্লাবে বধুবেশে ওকে নিয়ে যখন ঢুকলো অনেকের চোখ ঈর্ষায় সরু হয়ে গেলো।খাওয়া দাওয়ায় প্রচুর স্টেক,রোস্ট কাবাব নান রোটি পোলাও ছিলো।খেতে বসে স্টেকে ছুরি চালাতে গিয়ে কাটাচামচ ছিটকে পড়ে গেল।অপ্রস্তুত হয়ে গেল কেয়া।কটমট করে তাকালো রইস খান।ওর বন্ধুরা সব আহা আহা করে উঠলো।এলকোহল পানের আসর বসলো।কেয়া চুপচাপ বসেই ছিলো।ওর বন্ধুরা সব জোকস্ বলে হাসাহাসি করছিলো।প্রচুর পান করে রইস খানের এক বন্ধু হঠাৎই কেয়াকে বলল
-তুম ইতনি খুব সুরত হ্যায়।ম্যায় তুমারা সাথ ডান্স করুঙ্গি।আও মেরি জান …নাচতে আহবান জানায়।নাচতে অস্বিকৃতী জানিয়ে কেয়া এক চড় বসিয়ে দেয়।আর তাতেই খেপে যায় রইস খান।হলরুম থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসে কেয়াকে।বাসায় এনে রুমে ঢুকেই কোমরের বেল্ট খুলে আরম্ভ করে পিটানো।জলন্ত সিগারেট চেপে ধরে শরীরের এখানে ওখানে ।

পরদিন সকাল থেকে প্র্যাকটিস শুরু।কাটা ছুরি কিভাবে ধরতে হয়।আর নাচতে হলে ফ্লোরে কীভাবে অন্যের কোমর পেঁচিয়ে ধরতে হয়।

একবারো সরি বললো না বরং ক্রমাগত অর্ডার করতে লাগলো।শাড়ি পরতে হবে। দেহের বাঁক গুলো ফুটিয়ে তুলতে হবে।স্লীভলেস ব্লাউজ পরতে হবে।পার্টিতে যে ড্যান্স করতে চাইবে তার সাথে হাসিমুখে ড্যান্স করতে হবে।মদ পান করতে হবে।না বলা অভদ্রতা। আনকালচারড।গাইয়া।তা করা যাবে না।কথার নড়চড় হলেই শপাং শপাং চাবুকের ঘা।সিগারেটের ছ্যাকা বুকে পিঠে।আর সহ্য হয় না। অনুষ্ঠানে যাওয়ার আতঙ্কে থাকে সব সময় ।

একটা বোরকা যোগাড় করে কেয়া।একদিন দুপুরবেলা রইস খান যখন অফিসে, তখন পাসপোর্ট নিয়ে ঘর ছাড়লো কেতকী ,বাবা মায়ের আদরের কেয়া।

 

Similar Articles

Leave a Reply