You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > কনে দেখা (পর্ব এক)

কনে দেখা (পর্ব এক)

অনন্যা হক

কই রে জামিলা? আজ তোর এত কি কাজ, এদিকে আয়।

কি দাদি, ডাক কেন?

কি করিস? বেলা হয়ে গেল, গোসল করবি না? 

তোমার ছাগল কে কাঠালের পাতা খাওয়াই।

থাক  আজ না হয়, কাজ একটু কম কর বোন ।এদিকে  আয়, এই যে তোর জন্য, মসুর ডাল আর হলুদ বেটে রেখেছে সখিনা, এইটা  নিয়ে কিছু ক্ষণ হাতে,মুখে মেখে তারপর  গোসল করতে যা।

কেন দাদি,  একদিন  চকচকে দেখালে কি হবে, তারপর  আমি যেমন, তেমনই দেখবে প্রতিদিন।আমি  এগুলো মাখবো না,  তুমি মাখ।

আরে,শুধু মুখে মুখে তর্ক করিস কেন? তুই শ্বশুর বাড়ি গেলে বড় বিপদে পড়বি।

জামিলা কে দাদি খুব ভালবাসে। জামিলার গায়ের রং কালো, তাই দাদির চিন্তার কোন শেষ নেই।আজ তাকে দেখতে আসবে, ছেলের বাড়ি থেকে ।

জামিলা দাদির কাছে এসে বসে, বলে, দাও দাদি তোমার পান ছেঁচে দেই।

দাদি বলে, আজ আর সময় নেই, সখিনা দিয়েছে।তুমি জানো না, আজ তোমারে দেখতে আসবে?

আচ্ছা দাদি, তোমার আমাকে নিয়ে  এত চিন্তা কেন? দেখ বিয়ে আমার হবেই, আমি কত কাজের তুমি তো জান।সংসার করতে তো কাজই লাগে!

শুধু কাজ জানলে হয় না রে, পুরুষ মানুষ রূপেরও পাগল থাকে।

কই দাদি, আমার মা এত সুন্দর, কই তোমরা তো তার রূপ দেখে খুশি হয়ে বসে থাক না?

আমি তো জন্মের পর থেকে দেখি মা সারাদিন ঘুম বাদে কাজ করে। কোন দিন তোমাকে বা আব্বাকে বলতে শুনিনি, বউ যাও একটু ঘরে, অবসর নাও, তোমার চেহারাটা শুকনা দেখায়?

-তারে সারা দিন খাটতে কি আমি বলি? সে তার ইচ্ছেতেই খাটে। তুই এত হ্যাপা করিস কেন? 

জামিলার মা মরিয়ম রান্না করতে করতে মিট মিট করে হাসে, আর ভাবে, নিজের রক্তের সব মাফ রে মা, আমি তো পরের রক্ত।

কিন্তু কোন কথা বলে না, সে দেখে, তার মেয়ে একটু বুদ্ধি খোলার পর থেকেই, তাকে একটা ছায়া দিয়ে আসছে।

জামিলা তাঁর দাদিকে বলে, তুমি বল না, আব্বা বলে না, তাইলে সংসারে একটু  এদিক সেদিক হলে তো , এত গুলো কথা শোনাও। আবার আব্বাও তো সুন্দর বলে গদগদ থাকে না, সেও তো কমে ছাড়ে না। তোমার ছেলেও তোমার মত।

কই থেকে কই গেলি তুই? তোরে আজ দেখতে আসবে বিকালে, এত মুখ নাড়িস না, চেহারা রুক্ষ হয়ে থাকবে, এবার হাসির কথা বল, কেমন সুন্দর লাগে দেখি।

মুখ নাড়া শিখছি তোমার কাছে।

আচ্ছা দাদি, একটা কথা কও তো, তুমি  এত সুন্দর, তুমি কি দাদা রে দেখে বিয়ে করনি?

কি বলিস এসব, আমাদের সময়  এসব ভাবাও পাপ ছিল, যার সাথে দিছে, চোখ বন্ধ করে বিয়ে করছি সবাই।

কত বড় সাহস ছিল তোমাদের দাদি, একেবারে  না দেখে, একেবারে অজানা এক পুরুষের সাথে  প্রথম দিনেই  এক ঘরে?

জামিলা হেসে দিয়ে বলে, এজন্যই তো ঠকেছো তুমি।তাই তো তোমার কালো ভোমরার মত বর, তাই তোমার ছেলে কালো,আর ঐ অত সুন্দর মায়ের পেটের  আমি  কালো।

একারণেই তোমার রাতের ঘুম শেষ, আমার বিয়ে নিয়ে।

আমারও অনেক চিন্তা  আছে দাদি।

এ কেমন কথা দাদা রে নিয়ে? দাদি হাসে মিটিমিটি, ফাজিল মেয়ে, আসলেই চাপার জোর আমারই মত। সে বোঝে, এই নাতনিটা তার মতই অনেক কিছু পেয়েছে, শুধু গায়ের রং টা বাদে।

শোন তোর দাদার রং দেখে, বিয়ের রাতে প্রথম ভয়ও পাইছি, দুঃখও পাইছি। তয় পরে আর কষ্ট ছিল না কোনো।লোক টার মন টা  ভাল ছিল, আমারে সে কোন দিক দিয়েই খারাপ রাখে নাই।তাই  রংয়ের দিকে আর তাকাইনি কোন দিন।

সে তোমার কপাল !

এসব কথায় আমার মন ভুলবে না দাদি। আমার তো কাল রং ভাল লাগে না, আমি কিন্তু  তোমার মত ছেলে না দেখে বিয়ে করবো না। তাকে দেখবো, কথা বলবো কয় দিন তারপর  বিয়েতে মত দেব, বলে রাখলাম তোমারে।

এখন কিন্তু  মোবাইলের যুগ।

আর এই হলুদ, পাউডার মেখে ফাঁকি দিয়েও বিয়ে করবো না। আমি যেমন তেমনই যদি ভাল লাগে তো লাগবে।

এ কেমন জেদ তোর, এগুলো  আমি তোর বাবা রে বলি কিভাবে, কি জ্বালায় ফেললি আমারে তুই ?

সব তোমারে করতে হবে  দাদি, এই আমার শেষ কথা।

শোন আরও একটা কথা, ঐ ঘর ভরা লোকের সামনে  আমি, রেবেকার মত উঠে দাঁড়াতে পারবো না, হেঁটে দেখাতে পারবো না, মাথার চুল খুলে দেখাতে পারবো না, মা বল তো কি কি পারো, এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারবো না।

আমি কিন্তু  হাট থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পছন্দ করে কেনা ছাগল না দাদি।

আমি  তুমি না, তোমার  মেয়ে না, তোমার  ব্যাটার বউও না, আমি তোমার নাতি জামিলা, মনে রেখ কথাটা!

বলে মোবাইল টা  হাতে নিয়ে ঘরে চলে গেল।

দাদি বেচারা  তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে রইলো।সে যেন  আরও  বড় চিন্তার মধ্যে পড়ে গেল।

চলবে…

 

 

Similar Articles

Leave a Reply