ফাহমিদা খান ঊর্মি
‘আপ্পী আমরা কবে শপিংয়ে যাব’, মধ্য রমজান থেকে এই একটা কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসতে লাগলো কানের কাছে ছোটবোন শাম্মীর ঘ্যানঘ্যানও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো। কিন্তু কেন জানিনা আজকাল আর ঈদের শপিং আমায় টানে না। কারণ খোঁজতে গিয়ে আবিস্কার করলাম ‘বড় হয়ে গেছি’। আগের সেই উচ্ছ্বাস আর উৎফুল্লতা আর নেই যেন মনের গহীনে।
আর আগে! রমজানের চাঁদ দেখার পর থেকেই শুরু হত হাতের আঙ্গুলে গুণা, ঈদের আর ক’দিন বাকি। ঈদের শপিংয়ে যাওয়ার আগেরদিন তো ঘুমই আসতে চাইত না চোখে। কি কিনব, তার কত্ত পরিকল্পনা। জামার সাথে ম্যাচিং জুতো, ক্লিপ, চুড়ি আরো কত কিছু। দুইবোন সমসাময়িক হওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই একরকম দেখতে জামাে কেনা হতো। বাকি জিনিসগুলাও মোটামুটি একই থাকত।

ছোটবেলার ঈদে আমার অনেকগুলা জামা হয়ে যেত। একটা আব্বু দিতেন, একটা দাদাভাই, একটা চাচ্চু, একটা নানা ভাই আর একটা মামা। ঈদের আগে কখনোই নিজের জামা অন্যকে দেখাতাম না। কেউ দেখতে আসলেই বলতাম, দেখানো যাবে না, দেখালে আমার ঈদ চলে যাবে। লুকিয়ে লুকিয়ে রাতের বেলা নতুন জামার গন্ধ শুকতাম। সবগুলা জামার সাথে ম্যাচিং জিনিসগুলা আবার দাদাভাই আমায় কিনে দিতেন। একবারের ঘটনা এখনও মনে দাগ কেটে আছে। আমার বয়স তখন তিন কি চার বছর। কেনাকাটা মোটামুটি শেষ। কিন্তু আমার একটা ড্রেসের সাথে জুতা ম্যাচিং হয়নি। মন খারাপ হল খুব। দাদাভাই তখন আমাকে তার মোটরসাইকেলের সামনে বসিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ১৯কি.মি. দূরে জেলা শহরে ছুটলেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হল রাস্তা যেন শেষ হয় না। আম্মুর কাছে যাব বলে আমি কান্না জুড়ে দিলাম। দাদা ভাই পড়লেন মহাবিপদে। আমাকে সামলাতে তখন দাদাভাইকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল।

আরেকবার রাত্রিবেলা মনে হল ঈদের দিন সানগ্লাস পড়বো। তখনও ঈদের অনেকদিন বাকি। দাদাভাইকে বললাম এনে দিতে। তিনি সকালে এনে দেবেন বলায় আমি কান্নাজুড়ে দিলাম। অবস্থা বেগতিক দেখে রাতের বেলাতেই দাদাভাই বের হলেন। দোকানির বাড়ি গিয়ে তাকে ঘুম থেকে তুলে বাজারে এনে দোকান খুলিয়ে সানগ্লাস নিয়ে আসলেন।

আমার চাচারা সবাইই চাকুরীজীবী। চাকুরীর কারণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। ছোট চাচ্চু প্রতি ঈদেই বাড়ি আসতেন, আর বড় চাচ্চু দু-এক বছর পরপর। ঈদের কয়েকদিন আগে আসতেন তারা। চাচাতো ভাইবোনগুলা কবে আসবে সেই প্রতিক্ষায় আমার তখন দিন কাটত না। যে চার-পাঁচ দিন তারা বাড়ি থাকত বাড়িটা পুরো গমগম করতো। বয়স কম হলেও আমি ছিলাম তাদের মুরব্বী। কারণ সবগুলাই ছিল আমার ছোট। সারাদিন শুধু পেছন পেছন ঘুরত আর আব্দার করতো -বপ্পী (বড় আপ্পী) এইটা, বপ্পী ঐটা। নিজেকে বেশ দায়িত্ববান মনে হত। ঈদের আগের রাতে আমাদের ঘুম উধাও। মাঝরাত পর্যন্ত দাদাভাইয়ের সাথে উঠোনে সবগুলা ভাইবোন মিলে সে কি হৈ-হুল্লোড়। আম্মু-চাচীরা সারারাত জেগে ঈদের নানা আয়োজনে ব্যাস্ত। কত্ত মজার মজার পিঠা পায়েস।

আহ! চাঁদরাতে অনেক দেরীতে ঘুমোতে যেতাম। বালিশের নিচে ঈদের কাপড়চোপড় নিয়েই। খুব ভোরে উঠেই গোসল করে নতুন জামাকাপড় পড়তাম। কি যে সেই সুবাস! আজও নাকে লেগে আছে যেন।

Similar Articles

One thought on “এবেলায় পিছু ফিরে…

Leave a Reply