You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > আমি শুধু নারীই নই, আমি একজন মানুষ

আমি শুধু নারীই নই, আমি একজন মানুষ

ফাহমিদা খান ঊর্মি

কিছুদিন আগে ডিপার্টমেন্টের ফিল্ডওয়ার্কের কাজ শেষ করে আমরা পাঁচজন সিএনজি অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের সংগৃহীত ডাটাগুলো নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরতে হবে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটা অটো পাওয়া গেল। টুপ করেই হয়ত উঠে বসা যেত। কিন্তু বাঁধ সাধল আমাদের ‘নারী’ পরিচয়টা। আমরা পাঁচজনই মেয়ে ছিলাম কিনা। সিনএনজির পেছনে তিনজন বসার ব্যবস্থা। বড়জোর কষ্টেসিষ্টে না হয় চারজন বসা গেল, কিন্তু বাকি একজন? সে চাইলেই তো আর সামনে চালকের পাশে বসতে পারবে না। মেয়ে কিনা!

সময় স্বল্পতা আর সিএনজি সংকটের কারণে আমি ভুলে গেলাম আমার সেই ‘সীমাবদ্ধতা’টুকু। কিন্তু যখনই আমি চালকের পাশের সিটটাতে বসতে গেলাম অমনি চালক লোকটা এমন একটা ভঙ্গিমায় আমার দিকে তাকালো যেন আমি বেহেশত থেকে বিতাড়িত কোনো এক পাপি নারী। পাত্তা দিলাম না। যাই হোক, আস্তে আস্তে আমার ৩২০ একরের ক্যাম্পাসে ঢুকলাম। কিন্তু আমি দুঃখজনক হলো সিএনজি চালকের আচরণ আমি যতটা সহজভাবে নিয়েছি তারচেয়েও বেশি অবাক হয়েছি দেশের সবচে নামকরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত এবং সুশীলদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। সবাই ভূত দেখার মতো তাকিয়ে রইল। আর পরিচিত যারা ছিল তারা যে কত টিটকারি দিল সেসব আর এখানে নাই বলি।

একটা মেয়ে সিএনজির সামনে বসে যাচ্ছে! কি লজ্জা। এ যেন ঘোর কলিযুগ। পরিচিত একজন তো ফেসবুকে স্ট্যাটাসই দিয়ে দিল।

আরেকদিনের ঘটনা বলি। সিএনজি করে যাচ্ছি। পাশে বসেছেন মাঝ বয়েসি দাঁড়িওয়ালা এক লোক। বাবার বয়েসি লোকটা বারবার গা ঘেষার চেষ্টা করতে লাগলো। এতে অবাক হওয়ার কিছু না। কাজের প্রয়োজনে যাদের সিএনজিতে এভাবে সিএনজি চড়েন যেসব নারী তাদের প্রায় সকলেরই এরকম কমবেশি তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মেয়েকে এসব ভদ্রলোকের ‍মুখোশ পড়া পশুদের দ্বারা হয়রানির শিকার হতে হয়। অথচ এই তথাকথিত ভদ্রলোকেরাই কিনা একটা মেয়ের সিএনজির সামনের সিটে বসা নিয়ে আঙ্গুল তোলেন। এরাই যখন নারী দিবসে বড় বড় বুলি আওড়ান তখন রক্ত মাথায় উঠে যায়।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সামনে একজন মেয়ে দেখলেই হলো। পাশের বন্ধুকে বলে ওঠেন -‘মালডা দেখছস? এক্কেরে খাসা।’ ফেসবুকে কোনো ললনার ছবি দেখকেই আপনার চেতনাদণ্ড দাঁড়িয়ে যায়। মান সম্মানের তোয়াক্কা না করে অশ্লিল কমেন্টস করে বসেন- ‘সাইজ কতো?’, ‘রেট কতো?’ ব্লা ব্লা ব্লা…। পারলে ফিতা নিয়ে আসেন কোমর মাপতে, শরীর মাপতে।

বুকের ওড়নাটা সরে গেলে নারী বেপর্দা হয়ে যায় আপনার চোখে। কিন্তু কখনো রাস্তায় হাঁটার সময় অন্তর্বাস কোনভাবে স্পষ্ট হয়ে যায় তখন তো আপনার ‘পর্দা’ওয়ালা চোখ বেপর্দা হয়ে যায় মুহুর্তে। উৎসুখ হয়ে রঙ, ব্রান্ড খোজার চেষ্টা শুরু করেন।

প্রেম করেন। প্রেমিকাকে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারলে নাকি আপনি প্রেমিকই না। আর যদি অন্তরঙ্গ মূহূর্তের ছবি আর ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ না করেন তাহলে কি ষোলোকলা পূর্ণ হয়? আবার আপনার আবেদনময়ী ডাকে সাড়া দিলে এই আপনিই আবার আখ্যা দেন- ‘সস্তা নষ্টা মাগী’।

আমি দু:খিত। জানি লেখার ভাষাগুলো পড়তে গিয়ে আপনার হয়ত লজ্জা লাগছে, সংকোচবোধও হতে পারে। ভাবছেন একটা মেয়ে এইরকম লাজ লজ্জাহীনের মত লিখে গেলো। কিন্তু বাস্তবতা হল, আপনিই যখন মুখ দিয়ে এসব শব্দ উচ্চারণ করেন তখন তা দোয়া কালামের মত পবিত্র হয়ে যায়। আমার লজ্জা হয়, এই আপনি/আপনাদের মুখে নারী দিবসের শুভেচ্ছা শুনতে। প্রতিটি পুরুষকেই আমি ঢালাওভাবে খারাপ বলছি বিষয়টা সেরকম নয়। অবশ্যই ভালো মনের পুরুষ আছেন। তবে সেই সংখ্যাটা বড্ড কম যে। পশু চরিত্রের সংখ্যাই বরং বেশি দেখি আশাপাশে। আমি আবারো দু:খিত, এ ধরণের নরপশুরাও যে নারী দিবস পালনে অংশ নেয় সেই নারী দিবসে একাত্ম হতে পারলাম না বলে। কারণ আমি পশু না।
আমি নারী। শুধু নারীই নয়, আমি একজন মানুষও।

 

Similar Articles

Leave a Reply