You are here
নীড়পাতা > মুক্তমত > মতামত > আমার মা আমার অনুপ্রেরণা, এগিয়ে যাওয়ার শক্তি

আমার মা আমার অনুপ্রেরণা, এগিয়ে যাওয়ার শক্তি

ফাহমিদা খান ঊর্মি

কমলাফুলী কমলাফুলী কমলালেবুর ফুল… বয়স কতই বা তখন? বছর দেড়েক। সবে মাত্র বুলি ফুঁটেছে মুখে। আধো আধো ভাষায় ছোট্ট মেয়েটি ছড়া কাঁটছে। মা তাকে কোলে করে সারাবাড়ি হেঁটে হেঁটে ছড়া শেখাচ্ছেন। ভাঙা ভাঙা গলার সেই ছড়া আবার উৎসাহ নিয়ে টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করছেন মা। তাঁর ছোট্ট মেয়েটির সেই আবৃত্তি মুগ্ধ করছে মাকে, তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছেন। মেয়েটি যখন আরেকটু বড় হলো তখন সারাবাড়ির কালো মেঝে জুড়ে সাদা চকের আঁকিবুকি। মা অক্ষর শেখাচ্ছেন মেয়েকে, সাথে আরো কত রকমের ছবি। ঘর নষ্ট হচ্ছে তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই, ছোট্ট মেয়েটার হাতের লেখা সুন্দর, সবাই প্রশংসা করছে তাতেই মা আনন্দে আটখানা। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে সবচেয়ে সুন্দর ক্লিপ কিংবা ফিতা, বাজারের সবচেয়ে সুন্দর বেবি অর্নামেন্টস কিংবা পোশাক চাই তাঁর মেয়ের জন্য। কখনো বা নিজেই নকশা করে তৈরী করে ফেলছেন মেয়ের জন্য স্বতন্ত্র ডিজাইনের পোশাক, যা আর কারও পাওয়ার সুযোগ নেই। ছোট্ট মেয়েটির কান্না থামাতে রাতের পর রাত কাটিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে কোলে করে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আবছা স্মৃতিপটে এইটুকুনই মনে পড়ে ছোটবেলার।

বলছিলাম আমাকে নিয়ে আমার গর্ভধারিণীর কথা। তাঁর প্রথম সন্তান আমি। যদিও আমার আগে পৃথিবীতে আসা তাঁর প্রথম সন্তানটি মারা গিয়েছিল। প্রথম সন্তান হারিয়ে যখন আরেকজনকে প্রথম হিসেবে পেয়েছিলেন, তখন পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সকল ভালোবাসা দিয়ে, সকল শক্তি দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন । মুখে মুখে আবৃত্তি শেখাতেন। তাঁর শেখানো আবৃত্তি দিয়েই আমি প্রায়শই অনুষ্ঠানের মঞ্চে শ্রোতাদের হাততালি কুঁড়াতাম। যখন পুরস্কার হাতে বাড়ি ফিরতাম, তখন তাঁর সে কি আনন্দ! হাঁতের লেখার হাতেখড়িও তাঁর কাছে। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সুন্দর হাতের লেখায় যখন পুরস্কার পেতাম তখন অনেকেই জানত না এর নেপথ্যে কে আছেন। তিনি যে খুব ভালো আঁকিয়ে ছিলেন তাও নয়। তবে আমার আঁকাআঁকির প্রথম স্কেচবুক তিনিই। ছোটবেলা থেকেই তিনি চাইতেন তার মেয়ে সর্বগুণে গুণান্বিত হোক। তাঁর সেই চেষ্টা চলছে আজবদি।

urmi mother-womenwords

 

 

আমার জন্মের ঠিক দুই বছর আটমাস পর পৃথিবীতে আসে আমার ছোটবোন। যে রাতে তার জন্ম, সে রাতে তিনি তার সদ্য জন্ম নেয়া কন্যাকে কোলে নিতে পারেননি আমার জন্য। আমাকে বুকে আগলে না রাখলে যে আমি ঘুমাতাম না। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোটবোনকে তাই জীবনের প্রথম রাতটি কাটাতে হলো দূর সম্পর্কের এক নানীর কোলে। এমনটা যে শুধু সে রাতে ঘটেছে তা নয়। বছরের পরে বছর ধরে এই ধারাবাহিকতা চলেছে। নিজের হাতে খেতে চাইতাম না কোনো সময়। কাজের চাপে তিনি খাইয়ে না দিলে না খেয়েই থাকতাম অর্ধেকদিন। বকা ঝকা করে ঠিকই প্লেট নিয়ে হাজির হতেন। আমার এস.এস.সি পাশ করা পর্যন্ত চুল বেঁধে না দিলে আমার স্কুলে যাওয়া হতো না।

তিনি খুব কম বয়েসে পড়ালেখা ইস্তফা দিয়েছেন। মেধাবী ছাত্রী হওয়ার পরও বেশীদূর নিয়ে যেতে পারেননি নিজের স্বপ্নকে। পারিবারিক প্রথা আর সামাজিক কিছু রূঢ় নিয়ম তার হাত পা বেঁধে দেয়। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি। স্বপ্ন দেখেছেন তার গর্ভজাত তিনকন্যাকে নিয়ে। বড় মেয়ে হিসেবে আমার মাধ্যমেই শুরু তার স্বপ্নযাত্রার। তিনি স্বপ্ন দেখেন তার মেয়ে হাজারো মানুষের সামনে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে, কিংবা বিশেষ কোনো কৃতিত্বের জন্য বড় বড় অক্ষরে তার নাম আর ছবি ছাপা হয়েছে দেশের বড় কোনো পত্রিকায়। একটা জিনিস আমাকে খুব ভালোভাবে শিখিয়েছেন, নিজেকে মেয়ে না ভেবে মানুষ ভাবা। জন্মের পর থেকে আমার মাথায় তিনিই ঢুকিয়ে দিয়েছেন, আমার কোনো ছেলে নেই। তুমিই আমার বড় ছেলে, ছোট দুই বোনের বড় ভাইয়ের দায়িত্ব তোমার হাতে। রাস্তাঘাটে ভালোই মারপিট করতাম। কোনো ইভটিজার আজ পর্যন্ত পার পায়নি আমার হাত থেকে। এই শিক্ষা আর সাহসটা আমি আজীবন তার কাছেই পেয়েছি। রাস্তাঘাটে বখাটেদের শায়েস্তা করার জন্য ব্যাগে ছুরি নিয়ে ঘুরতে বলেন। তবুও কখনো থেমে থাকতে বলেন নি। বরং, অনুপ্রেরণা দিয়ে, সাহস দিয়ে এগিয়েই যেতে বলেছেন আজীবন। আমার স্বাধীনচেতা, কাউকে পরোয়া করে না চলা-এই বীজ- মনে তিনিই বপন করে চারা গাছটির পরিচর্যা করে বড় করে তুলেছেন।

আজকাল অনেক ব্যস্ত থাকি। সময় করে কথা বলার সময় হয়ে ওঠে না সবসময়। তবুও ওপাশে একজন মানুষ অনেক উৎকন্ঠা নিয়ে বসে থাকেন আমার কন্ঠস্বরটা শোনার জন্য। গলার স্বর শুনে বুঝে যান শরীর কিংবা মন খারাপের বিষয়। উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। ব্যাকুল হয়ে যান আমাকে দেখার জন্য। অসুস্থতাজনিত কারণে এপর্যন্ত তাকে যে কত বার আমার শুশ্রূষা করতে মাসের পর মাস হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। নিজের ওপর বড্ড রাগ আমার। জন্মের পর থেকে আমার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও বাস্তব, একটা বার বিরক্ত হন না। কারণ তিনি মা। জানি মায়ের ঋণ কখনোই শেষ হয় না। তবুও সৃষ্টিকর্তার কাছে একটা ই প্রার্থনা এই মানুষটি যেভাবে আগলে রেখেছেন সকল প্রতিকূলতা থেকে, আমিও যেন তাকে আগলে রাখতে পারি সারাজীবন। আজ মা দিবস। সবাই কত কথা লিখছে মাকে নিয়ে। আমি শুধু জানি আমার মা আমার অনুপ্রেরণা। এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। ভালোবাসা পৃথিবীর সকল গর্ভধারিণীর জন্য।

 

Similar Articles

Leave a Reply