You are here
নীড়পাতা > অন্য মাধ্যমে প্রকাশিত > সংবাদপত্র > ‘আফস্পা’ অত্যাচার : সেনার আচরণে রাশ সুপ্রিম কোর্টের

‘আফস্পা’ অত্যাচার : সেনার আচরণে রাশ সুপ্রিম কোর্টের

নাকে ‘রাইলস টিউব’, দেড় দশক ধরে অনশন চালিয়ে আসা ইরম শর্মিলা চানুর এই ছবিটা গোটা দুনিয়া চেনে। সাদা কাপড়ে ‘ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস’ লিখে কাংলা দুর্গের সামনে মণিপুরের মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদের ছবিটাও ১২ বছরের পুরনো।

কিন্তু এত কিছুতেও মণিপুরে জওয়ানদের অত্যাচারী আচরণে রাশ টানা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে বারবার। একই ভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ এবং জম্মু-কাশ্মীরেও সেনার আচরণ বদলায়নি বলে সরব হয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। কারণ তাদের জন্য আছে সামরিক বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বা ‘আফস্পা’। যে আইনকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গি সন্দেহে ভুয়ো সংঘর্ষ বা এনকাউন্টারের নামে বহু নিরীহ যুবক-যুবতীকে মেরে ফেলার অভিযোগ বারবার উঠেছে সেনার বিরুদ্ধে। সে সবের কোনও তদন্ত বা বিচার হয়নি। সেনার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই আফস্পা।

অবশেষে আজ শীর্ষ আদালত জানাল, সেনাবাহিনী বা আধা সেনা কোনও ভাবেই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা প্রতিশোধমূলক আচরণ করতে পারবে না। তা সে যতোই জঙ্গি উপদ্রুত এলাকা বলে আফস্পা বলবৎ থাকুক না কেন। সন্দেহ হলেই কাউকে হত্যা করা চলবে না। সুপ্রিম কোর্টের রায়, গত দু’দশকে মণিপুরে দেড় হাজারের বেশি সাজানো সংঘর্ষে হত্যার যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রত্যেকটির তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ সত্যি হলে আদালতে তার বিচারও হবে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান অভিযান ও সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে ১০ দফা নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন জওয়ানদের। সেনার ‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ নামে পরিচিত এই নির্দেশিকা মেনে চলতেও এ দিন জানিয়েছে আদলত।

মণিপুরে ভুয়ো সংঘর্ষে ১৫২৮টি হত্যার ঘটনাকে একত্র করে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যালার্ট’ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল। তিন বছর আগে শীর্ষ আদালত এর মধ্যে ছ’টি ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সন্তোষ হেগড়ের নেতৃত্বে যে কমিশন গড়ে, তার রিপোর্ট অনুযায়ী, ছ’টিই ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনা!

আজ সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি মদন বি লোকুরের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সংবিধানের ৩২-তম অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে জানিয়েছে, সাধারণ মানুষকে বিচার পাইয়ে দিতে এই সব ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। বেঞ্চের রায়, সামরিক বাহিনীর নিয়মাবলীতে কী করা যাবে কী করা যাবে না, তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কোনও অবস্থাতেই সেই নিয়ম ভাঙা যায় না। জওয়ানরা ভারতীয় দণ্ডবিধির ঊর্ধ্বে নয়।

মণিপুর থেকে আফস্পা প্রত্যাহার ও ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যায় জড়িতদের সাজার দাবিতে লড়াই চালানো মানবাধিকার সংগঠনগুলির কাছে এই রায় নৈতিক জয়। যদিও তাদের দাবি, এটি কোনও ভাবেই দোষী জওয়ানদের সাজা বা আফস্পা প্রত্যাহারের বিকল্প নয়। বন্দি শর্মিলার হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া তাঁর ভাই ইরম সিংহজিৎ বলেন, ‘‘আদালতের রায়ে দিদি খুশি। তবে আফস্পা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অনশন চলবে। মণিপুরে আফস্পার নামে যা হচ্ছে, বাকি দেশ কিছুটা হলেও তার আঁচ পেল।’’ মানবাধিকার কর্মী বীনালক্ষ্মী নেপ্রামের আশা, এ বার হয়তো আফস্পা প্রত্যাহার করা হবে। তবে মূল মামলাকারী মানবাধিকারকর্মী বাবলু লইতংবাম এখনও বিশ্বাস করেন না যে এর পরেও জওয়ানদের আচরণে বদল আসবে।

১৯৫৮-য় উত্তর-পূর্ব ভারতে আফস্পা চালু হয়। তখন থেকেই অসম, ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অসম লাগোয়া মেঘালয়, মিজোরাম, অরুণাচলের বিভিন্ন অংশে আফস্পা বলবৎ আছে। ত্রিপুরা গত বছর আফস্পা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত পঞ্জাব-চণ্ডীগড়ে আফস্পা বলবৎ ছিল। ১৯৯০ থেকে জম্মু-কাশ্মীরে আফস্পা বলবৎ রয়েছে। মণিপুরের মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, রাজ্যে গত ৫৮ বছরে নিছক সন্দেহের বশে নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে খুন করেছে। নিহতদের পরিবার কোনও বিচার বা ক্ষতিপূরণ পায়নি। ২০০০-এর ২ নভেম্বর মালোম গ্রামে ১০ জন গ্রামবাসীকে খুনের অভিযোগ ওঠে জওয়ানদের বিরুদ্ধে। সেই থেকে অনশন শুরু শর্মিলার। ২০০৪-এর ১০ জুলাই টি মনোরমাকে গণধর্ষণের পর গুলি করে খুনের অভিযোগ ওঠে সেনার বিরুদ্ধে। তার প্রতিবাদে কাংলা দুর্গের সামনে নগ্ন হয়ে মিছিল করেন মহিলারা। তার পরেও এই ধরনের ঘটনা কমেনি বলেই অভিযোগ।

হেগড়ে কমিশন মোট ৬২টি মামলার তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ১৫টিই ভুয়ো বলে জানিয়েছে তারা। যদিও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩১টিই সাজানো! আজ শীর্ষ আদালত ৬২টি মামলারই তথ্য চেয়েছে। আইনজীবীরা জানান, বেশির ভাগ ঘটনাই এতো পুরনো যে জওয়ানদের বিরুদ্ধে সেনা আইন মাফিক কোর্ট মার্শাল প্রক্রিয়া অসম্ভব।
সৌজন্যে : আনন্দবাজার পত্রিকা

Similar Articles

Leave a Reply