You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > আদরের বৌমা

আদরের বৌমা

Your ads will be inserted here by

Easy Plugin for AdSense.

Please go to the plugin admin page to
Paste your ad code OR
Suppress this ad slot.

নমিতা দাশ সানি

কাহিনী ১

শবনম নাহার। ঈদ উপলক্ষে লন্ডন থেকে আসার দুই সপ্তাহ পর মোহাম্মদপুর থেকে সিলেটে তালতলা বাবার বাসায় এসেছে মাত্র । এখনও ছোট ফুফু’র সাথে দেখা হয়নি ; নিজের একমাত্র বোনের সাথে কথা হয়নি। এরই মাঝে শ্বশুর বাড়ি থেকে ফোন। ননদকে দেখতে পরশু ছেলে পক্ষ আসছে, এই সময় বাড়ির বৌ বাড়িতে না থাকলে ব্যাপারটা খুব দৃষ্টিকটু হবে। আত্মীয় স্বজনরাও বাজে কথা বলবে, অতএব বাক্স পেটরা বাঁধো, যাবার আগে সময় থাকলে আরও দুই দিন এসে বাপের বাড়ি থেকে যেও। আর কি চাও?

উনিশে বিয়ে, সদ্য কলেজ এর গন্ডি পেরিয়ে যখন সব বান্ধবীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য আদাজল খেয়ে ভর্তি যুদ্ধে নেমেছে ঠিক তখন বাবা-চাচাদের আদেশ পালন করার জন্য তাকে সাজতে হয়েছে বিয়ের কনে। ছেলে বিদেশে থাকে, ভালো চাকরি করে। সুতরাং এমন পাত্র হাতছাড়া করার মতো বোকা ধরা ধামে কেউ নেই, শবনমের চাচা বাবা’রাও খুব চালাক। তাই ২৪ এর কোঠায় পৌছাঁতেই শবনম দুই ছেলের মা। স্কুল কলেজে যারা ওর মতো পড়ায় ভালো ছিল তারা অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, সরকারি অথবা বেসরকারি। শবনমের বাবারা স্বচ্ছল, চাইলে মেয়েকে পড়াতে পারতেন। কিন্তু চাইবেন কেন? শবনমের বাবার এক কথা, পড়ালে ছেলেকে পড়াবো, মেয়েকে কেনও পড়াবো! এর কোনও উত্তর ওদের পরিবারের কারো জানা ছিল না।

লন্ডনের চার দেয়ালের মাঝে শবনমের নিজের কোনও জগত নেই, ওখানে ওর পরিচিত সবাই গৃহিণী। এর বাইরে ওদের কোনও পরিচয় নেই। আর যে কোনও পরিচয় বাঙালি মেয়েদের থাকতে পারে এটাও ওদের মনে হয় না। কেবল এখনও ওর নিজের চিরচেনা শহরটাকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব, ঘরের উঠানে হাঁটতে ইচ্ছে করে, মায়ের বকুনি শুনতে ইচ্ছে করে, একান্নবর্তী পরিবারে ভাইবোনদের একসাথে ঈদের ঘোরাঘুরি এই সহজ সাধারণ কিছু ইচ্ছে এখনও মনের কোণে উড়াউড়ি করে অবিরাম। কিন্তু দেশে যতবারই আসে আগে যেতে হবে শ্বশুর বাড়ি। এক মাসের ছুটি পেলে বড়জোর এক সপ্তাহ বাবার বাসায়। এর বেশি কখনো তার ছুটি হয়না।

বলা হয় ঈদটা শ্বশুর বাড়িতেই করতে হয় মেয়েদের। এটাই নিয়ম, এতেই সবার মন ভালো থাকে। কিন্তু শবনমের কি মন ভালো থাকে? বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করে, ওদের ইচ্ছে স্বাধীন জীবনের গল্প শুনতে ইচ্ছে করে, ঈদের দিন সারাদিন সেজে গুজে বেড়াতে ইচ্ছে করে, রাতে মা’য়ের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এগুলো আর কোনদিনই হয়না। শ্বশুর বাড়িতে ঘোমটা দিয়ে সকাল থেকে রান্না করে নেয়ে ঘেমে দিন শেষে ফরমায়েশি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে করতে প্রতিটা ঈদ একঘেয়ে হয়ে গেছে শবনমের কাছে। নিজের জীবন, নিজের আনন্দ বলতে এখন আলাদা করে আর সে কিছুই খুঁজে পায় না।    

কাহিনী ২

নীলা’র বাবার বাড়ি পুরান ঢাকায়, স্বামীর চাকরি সূত্রে সে থাকে সিঙ্গাপুর। এক মাসের ছুটিতে এসেছে এবার। উত্তরা শ্বশুর বাড়ি থেকে এই নিয়ে তিন দিন মা’কে দেখতে এসেছে, একঘণ্টা যেতেই স্বামী ফোন করে রীতিমতো ধমক – তুমি এখনও ওখানে কেন? মা (নীলার শাশুড়ি) তোমাকে এক ঘণ্টার ভিতরে বাসায় ফিরতে বলেছিলেন, এখনো যাওনি কেন?

যতবারই আসে কখনো এক সপ্তাহ বাবা-মা’য়ের সাথে সে থাকতে পারেনা। বিষয়টা এরকম দাঁড়িয়েছে: ঢাকার ভিতরে যেহেতু বাপের বাড়ি, সেহেতু আর এক সপ্তাহ না থেকে কয়েকদিন পরে এসে ঘুরে যাও, শ্বশুর বাড়িতে একটু বেশি সময় দাও, ওরা তো তাদের বৌ’কে কাছে পান না, তাদেরও তো একমাত্র ছেলের বৌ’য়ের সেবা পেতে ইচ্ছে করে।

নীলার চোখে সেদিন জল চলে এসেছিলো, ওর মা তখন অসুস্থ। রিক্সা করে বাসায় ফিরতে একটু সন্ধ্যা হয়ে গেলো, শাশুড়ি মুখ কালো করে বসে রইলেন।  কোনো কথাই বললেন না। নীলা ওর মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। পরশু ওরা সিঙ্গাপুর ফিরে যাচ্ছে, নীলা’র আর কোনদিনই মা’য়ের সাথে দেখা হয়নি। পরের বছর ঈদের আগেই ওর মা মারা গিয়েছিলেন।

মারা যাবার তিনমাস পর নীলা দেশে এসেছিল, একদিনের জন্য মা’য়ের বাসায় গিয়েছিলো, দেয়ালে মৃত মা’য়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছিলো কিছুক্ষণ। এরপর ফিরে এসেছে শ্বশুর বাড়িতে, যেটা নাকি মেয়েদের আসল বাড়ি!             

Similar Articles

Leave a Reply