You are here
নীড়পাতা > প্রতিবেদন > অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আহত ধর্মানুভূতি

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আহত ধর্মানুভূতি

বাংলাদেশে আবারও সাম্প্রদায়িক হামলা। ঘটনার স্থান ভিন্ন হলেও কাহিনী প্রায় একই। লেখাটি প্রায় এক বছর আগে লেখা। অথচ আজকের দিনে কতই না প্রাসঙ্গিক সেটি…

জেসমিন চৌধুরী
ফেইসবুকে আপত্তিকর একটি পোস্টের জেরে ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের উপরে উপর্যুপরি হামলা, তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দির ধ্বংসের ঘটনায় দেশে-বিদেশে মানবতাবাদী সকলেই মর্মাহত। তার বিরুদ্ধে নানান ধরণের প্রতিবাদ হয়েছে ফেইসবুকেই। ‘স্টপ ভায়োলেন্স অন হিন্দুজ’ প্রোফাইল পিকচার আর ‘আমি মালাউন’ কাভার পিকচার ঝুলিয়েছি আমিও। কিন্তু এসব করে আসলে কি কোন লাভ হবে? যেসব সন্ত্রাসীদের পেছনে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতার মদদ তারা কি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে বারবার সরব এবং সক্রিয় হয়ে উঠবে না?
আমি প্রায়ই বলি ‘সংখ্যালঘু’ ধারণাটাই সব বিপত্তির মূলে, এরকম একটা শব্দ থাকাই উচিৎ নয়। মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত বা যৌন পরিচিতির ভিত্তিতে যাচাই না করলে আমরা সবাই মানুষ হতাম, কেউ লঘু বা গুরু হতো না। কিন্তু এসব কথা থিয়োরি হিসেবেই ভাল, বাস্তবতা অনেক বেশি নির্মম। ৮৭% মুসলমানের দেশে মাত্র ১২% হিন্দুর একজনের একটা আপত্তিকর পোস্টের জন্য শতশত হিন্দুর বাড়িঘর ভাংগা হবে, তাদের মন্দির মাটিতে মিলেয়ে দেয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। সংখ্যা অনেক বড় একটা ব্যাপার, মানবতা তার কাছে কিছুই নয়। তাইতো একজন মুসলিম সাইফুল যখন ছুরি দিয়ে এক হিন্দু শিশুর যোনি কেটে নিজের কামলিপ্সা চরিতার্থ করে, তখন দু’চারটা লেখালেখি হয় এদিকে সেদিক কিন্তু গর্জে উঠেনা বাংলাদেশ, আগুন জ্বলেনা কোথাও। যে দেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু সে দেশে এক হিন্দু শিশুর যোনির চেয়ে ফেইসবুকবাসী ঈমানদারদের ধর্মানুভূতি অনেক বেশি গুরুত্বের দাবী রাখে।
এইকি আমাদের সংগ্রামলব্ধ সেক্যুলার বাংলাদেশ, যেখানে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী প্রকাশ্যে হিন্দুদের মালাউন বলে গালি দেবার পরও চাকরিতেতে বহাল থাকেন? সংবিধানকে কাঁচকলা দেখিয়ে, ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে ভেংগে দিয়ে আমাদের চোখের উপরে দিনে দিনে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে ইসলামী রাষ্ট্র যেখানে দু’দিন পরপর ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে হিন্দুদের উপর হামলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার স্বার্থে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দেয়া হয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ আর তার চরম মূল্য দিতে হয় আমাদের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে। ফেইসবুকে আমার এক বন্ধু তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন ‘আমাদের ‘গণতান্ত্রিক’ নেতৃত্ব দুই দশকের যাত্রায় ধর্মীয় বা ভাষাভাষি ‘সংখ্যালঘু’দের নাগরিক অধিকার, জানমালের নিরাপত্তা এমন কি বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও নিশ্চিত করতে পারে নি|’
আর শুধু কি রাজনৈতিক মদদ? আগেও বলেছি, আবারো বলছি, এবং ভবিষ্যতেও বলে যাব সাম্প্রদায়িক আক্রমণ দেখে এতো অবাক হবার কিছু নেই। মুখে আমরা যা’ই বলি না কেন, আমাদের অনেকের ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আঘাত আর নির্যাতনের ইংগিত। গতকাল আমার এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র মন্তব্য করেছে ‘আমাদের ধর্ম কখনোই অন্যদের আক্রমণ করতে বলেনা, সুরা কাফিরুনে তা স্পষ্ট করেই বলে দেয়া আছে।’ আবার সেই একই স্ট্যাটাসে আরেকজন মন্তব্য করেছেন ‘তোমার হিন্দু বন্ধুকে রেখেই তোমাকে বেহেস্তে যেতে হবে কারণ অমুসলমানরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী।’
এই যে বিশ্বাস, সকল অমুসলমানরা চিরকালের জন্য জাহান্নামে যাবে, এর মধ্যেই তাদের প্রতি একধরণের ঘৃনা লুকিয়ে আছে। কাজেই যখন কিছু অমুসলমানের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়, তাদের মন্দির ভাঙ্গা হয়, কেন আমরা এতো অবাক হয়ে যাই? এরা তো মৃত্যুর পর অনন্ত কাল ধরে আগুনে পুড়বেই, সাপের কামড় খাবেই; অনন্ত যন্ত্রনা ভোগ করবে কিন্তু মৃত্যুর স্বস্তিটুকুও পাবে না। আমাদের বিশ্বাসে যদি অমুসলমানদের প্রতি অনন্ত কাল ধরে চলতে থাকা ভায়োলেন্সের জন্য সাপোর্ট থাকে, তাহলে তাদের প্রতি আচরণে কিছু ভায়োলেন্স থাকতে দোষ কি?
ভিন্ন ধর্ম বা মতাবলম্বিদের প্রতি মানুষের অসহিষ্ণুতা দেখলে মেডেলিন লিংগলের ‘আ রিংকল ইন টাইম’ নামক সায়েন্স ফিকশনের কথা মনে হয় যেখানে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবী দখল করে নিয়েছে ‘ইট’ নামক এক অশুভ শক্তি এবং তার ইচ্ছা অনুযায়ী সব মানুষের মগজে একই রকম প্রোগ্রামিং করে দেয়া হয়েছে। তারা একই রকম করে ভাবে এবং আচরণ করে, একই রকম দেখতে বাসাগুলোর সামনে একই রঙের সমান সংখ্যক ফুল। কোথাও কোন ভিন্নতা নেই, নেই কোন বৈচিত্র্য। ক্লাস সেভেনের বাচ্চাদের এই গল্প পড়াতে গিয়ে আমি শিউরে উঠতাম আর ভাবতাম, কী সুন্দর আমাদের এই পৃথিবী তার সমস্ত ভিন্নতা আর বৈচিত্র্য নিয়ে।
আমাদের দেশের ‘মালাউন নিধন’ দেখলে মনে হয় এই লোকগুলা ঐ সায়েন্স ফিকশনের মতই একটা পৃথিবী গড়তে চায়, যেখানে সবার ভাবনা আর বিশ্বাস হবে হুবহু এক। একটা বিশেষ ধর্মগ্রন্থে লিখিত নিয়ম কানুন অনুযায়ী একই ভাবে আচরণ করবে পৃথিবীর সব মানুষ, নিজে থেকে কেউ কিছু ভাবতে পারবেনা, শুধু অনুসরণ করবে। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে।
বাকি থাকে কথায় কথায় মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগার কথা কিন্তু ব্যাপার হলো, যে পৃথিবীতে নানান রকমের ধর্মবিশ্বাস এবং অবিশ্বাদের অস্তিত্ব আছে, সেই পৃথিবীতে ‘বাই ডিফল্ট’ সবাই কি সবাইকে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে না? আপনি যদি একটা ধর্মের অনুসারী হন আর দাবী করেন যে সেই ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম, তাহলে আপনি অন্য সকল ধর্মকে মিথ্যা বলছেন, সেইসব ধর্মের অনুসারীদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছেন। আপনি যখন অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বা অবিশ্বাসীদের ‘অন্ধ বধির ও মূক’ বলছেন আপনি তাদের অপমান করছেন। আপনি যখন বলছেন অন্য ধর্মের মানুষরা জাহান্নামে যাবে, আপনি তাদেরকে ছোট করছেন।
যেহেতু প্রতিটা ধর্মই কাউকে না কাউকে ভুল বলে দাবী করছে, কারো না কারো অনুভূতিতে আঘাত করছে, সেহেতু কে কার ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে সে হিসাবে না গিয়ে নিজের বিশ্বাসকে আরো মজবুত করে তুলাটাই কি ভাল নয়, যাতে তা এতো অল্পতেই আঘাত প্রাপ্ত না হয়, আর মন্দির মসজিদ ভাঙ্গারও প্রয়োজন না পড়ে?
এই পর্যন্ত পড়ে কেউ হয়তো আঘাত পেয়ে বসেছেন। কেউ হয়তো আবার রেগে গিয়ে আমার নামে চাপাতি ধারাতে বসেছেন। এক বন্ধু বলেছিলেন ‘সত্য কথা বলার জন্য এদেশে হয় তোমাকে গ্রেপ্তার করা হবে, না হয় চাপাতি পার্টি কোপিয়ে মারবে। আমাদের মত মানুষের কোনদিকে নিস্তার নাই।’
আমার মতন বিশ্বাস-বিভ্রান্ত মানুষরাই বোধ হয় বাংলাদেশে সবচেয়ে সংখ্যালঘু। আমাদের মন আর মগজ ছাড়া অন্য কোন মসজিদ মন্দির নেই বলেই বোধ হয় কয়েকদিন পরপর কারো না কারো মাথার উপরে চাপাতি নেমে আসে। ভেতরে ভেতরে আসলে আমি অনেক ভীতু একটা মানুষ। পুরনো এক ছাত্র সেদিন ইনবক্সে ফোন নাম্বার চাইল। তার দাঁড়ি টুপি দেখে এতই ভয় পেলাম যে তাকে ব্লক করে দিলাম। নিজের এই জাজমেন্টাল আচরণে নিজের কাছেই আমি লজ্জিত।
নিজেকে নিয়ে বড়বড় অনেক চিন্তা ছিল একসময়, কিন্তু এখন জানি আমিও একটা ভীতু ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ যার কোনমতে বেঁচে থাকার দায়িত্ব পালন করা ছাড়া জীবনে আর কোন করনীয় নেই। শুধু রবিঠাকুর যখন স্মরণ করিয়ে দেন, বেঁচে থাকার বাইরেও কিছু দায়িত্ব আছে, তখন ঝামেলায় পড়ে যাই আর ভাবি, হয়ত চাপাতি বা হাতকড়া দেখলে ভয়ে কাঁপব, দৌড় দেব অথবা কাপড় খারাপ করব, সে তখন দেখা যাবে। এই মুহুর্তে একটু মরাল রোমান্স করে ফেলি,
‘যদি দুঃখে দহিতে হয় তবু অশুভচিন্তা নয় ।
যদি দৈন্য বহিতে হয় তবু অশুভকর্ম নয় ।
যদি দন্ড সহিতে হয় তবু অশুভ বাক্য নয় ।

যদি দুঃখে দহিতে হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয় ।
যদি দৈন্য বহিতে হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয় ।
যদি মৃত্যু নিকট হয় তবু নাহি ভয়, নাহি ভয় ।’

Similar Articles

Leave a Reply