You are here
নীড়পাতা > মুক্তমত > প্রতিক্রিয়া > অবিশ্বাসের ভাইরাস

অবিশ্বাসের ভাইরাস

শবনম সুরিতা ডানা

জন্মের পর চোখ ফুটতে সময় লাগে বেশ কয়েক ঘন্টা। কোন কোন ক্ষেত্রে কয়েক দিনও লেগে যেতে পারে। চোখ মেলে চারদিক দেখতে থাকি আমরা, আর আস্তে আস্তে বোঝার চেষ্টা করি দুনিয়াটা আসলে কী জিনিস। চাইলেই আশেপাশের সবকিছু নিজেদের মত করে এক একটা নাম দিতে পারতাম হয়ত, কিন্ত তেমন নিয়ম অন্তত এই দুনিয়ার নেই। সুতরাং শুরু হল মুখস্থ করার পালা। এটা গাছ, ওটা জানালা, ওটা পাহাড়, এটা মা- এভাবে একে একে বাড়তে থাকে শব্দভাণ্ডার। প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করছি আমিই, কিন্ত একটাও নাম আমার দেওয়া নয়। নতুন শব্দ আবিষ্কার আমরা করিনা। স্বতস্ফুর্ত কোন শব্দের উচ্চারণে ভরে যায়না আমাদের চারপাশ কখনোই। এই একই ভাবে আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয় কাকে বিশ্বাস করব সবচেয়ে বেশি। আর কাকে বিপদ জেনে এড়িয়ে যাব আজীবন।

বাড়ির চার দেওয়ালের ভিতর থাকলে, রাস্তায় গা ঢেকে হাঁটলে, গোমাংস ভক্ষণ না করলে নিরাপদে থাকার অধিকারে বিশ্বাস করতে শিখেছি। যে বলেছে আমি শ্যামলা, সুপুরুষ বর পাব না, সুতরাং চাকরি করে নিজের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে, তাকেও অবিশ্বাস করিনি। আমি জানি পরিবার-পরিজনেদের বিশ্বাস করতে হয়। শরীরের যে কোন অঙ্গে তাদের অনধিকার প্রবেশ মূলত গোপন রাখতে হয়, এটাও বিশ্বাস করেই এসেছি আমি এতদিন। কিন্ত এগুলো জন্মেই মায়ের পেট থেকে আমদানি করতে পারিনি। হাতে ধরে, সযত্নে শিখেছি আমি সামাজিক জীব হবার পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলী।

জন্মের পরমূহুর্ত থেকে আমরা টিউশন পড়ার অভ্যেস রপ্ত করতে ওস্তাদ হয়ে উঠি। একই অঙ্ক বারবার প্র্যাকটিস করার মত সমানে আমাদের ভেতর গাঁতিয়ে ঢোকানো হয় কিছু আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন, ঝক্কি-ঝামেলা এবং কতগুলি নাম, সম্বোধন। সদ্য জন্মানো শিশুর কপালের কোণ কাজলের টিপ ব্যতীত অসম্পূর্ণ, এবং কুনজরের জন্য আদর্শ চুম্বক, এমন শেখানো হয়ে থাকে প্রায়ই। শুনেছি বাঁ হাতের সারা জীবনের যত অশৌচের ইতিহাসের কারণে ঠাকুরের বাসন বাঁহাতে ছোঁয়া যায় না। অবিবাহিত মেয়েরাই পারে চালকুমড়োয় ছুরি বসাতে, কারণ সধবা মহিলার কাছে কুমড়োই তার স্বামীর প্রতিরূপ, এমন উদ্ভট যুক্তিও যে আমায় পাশ কাটিয়ে গেছে তা বুক ঠুকে বলতে পারব না। এক্ষেত্রে সকল স্বামীরাই চিরকালীন কুমড়োপটাশ কি না এ বিষয়ে তথ্য উদ্ধার করা এখনও হয়ে ওঠেনি যদিও, তবে যে সকল স্বামীরা নির্দ্বিধায় শিবরাত্রির দিন নিজেদের মানুষ কম ভগবান বেশি ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের কুমড়োপটাশত্ব নিয়ে আমি নিশ্চিত।

এহেন সমস্ত চালচুলোয় আমাদের রীতিমত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ছোটবেলা থেকেই। ভদ্র ভাষায় যাকে আমরা “মানুষ করা” বলি, তার ফাঁকফোকরে এভাবেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে কুসংস্কারের আভাস। বেঁচে থাকার কায়দা শেখাতে গিয়ে বড্ড বেশি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে তাই আমাদের দৃষ্টি। সে কারনেই প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা আর ‘করোয়া চৌথ’-এর একেপেশে উপোস মাথার ভেতর ঘেঁটে একসা।

বিশ্বাস করাটা মানুষের স্বভাব। অবিশ্বাসও তাই। কিন্ত কী এক অজানা কারণবশত বিশ্বাসের পাল্লাটাই যেন বেশি ভারী। জন্ম-মৃত্যু, ক্ষুধা-তাপের সত্যতাকে অবিশ্বাস করার ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্ত ওই চারপাশের সবকিছুকে একটা নাম দেবার অভ্যাস শুরু থেকেই বয়ে এনেছি আমরা। সুতরাং যা কিছু অবিশ্বাস্য তাকে বুঝবার নূন্যতম চেষ্টা না করে পাঁচমেশালী পোঁটলা বেঁধে নাম দিয়েছি সমাজব্যবস্থা, ধর্ম। যার গায়ে রঙ চড়াতে শৌচ-অশৌচ, পুণ্য-পাপ ইত্যাদি অসংখ্য গয়না পরানো হয়েছে যুগ যুগ ধরে।

আরো অনেক কায়দার নামকরণ আছে চারদিকে। উদাহরণস্বরূপ ধরে নেওয়া যাক ‘সংস্কৃতি’। কুসংস্কারকে জনসমক্ষে বের করে আনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এটি। আজ অবধি কত মানুষের কাছে যে ‘ভারতীয় বা বাঙালি সংস্কৃতি’ নিয়ে কচকচানি শুনেছি, সত্যি বলছি মনে করা অসম্ভব। সবাই যেন এক একজন ভারতের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের স্বনির্বাচিত রক্ষক। সাংস্কৃতিক পুলিশের আচরণে বোঝা ভার হয়ে ওঠে মানুষের জন্য সংস্কৃতি, নাকি সংস্কৃতির জন্য মানুষ সৃষ্ট। সব সময় যেন একটা মার-মার কাট-কাট ভাব। সীমান্তে সদাজাগ্রত সৈন্যের তুলনায় এরাও কম যান না মোটেও। আশেপাশের মানুষটা ‘আম্মা’, ‘ইমা’, ‘মাম্মি’ যাই বলুক না কেন আমার মুখ থেকে যাতে শুধুই ‘মা’ ডাক বেরোয়, তা দেখে রাখার জন্য পুলিশের অভাব তাই এখন আর পাওয়া যায় না।

ইস্কুলে পড়াকালীন আমিও অঙ্কে টিউশন পড়তে যেতাম। পড়ায় কাঁচা ছিলাম বরাবরের। তাই ভয়ে থাকতাম হাত-পা সিটিয়ে। কিন্ত অঙ্কের বোকা বোকা ভুলের বকাও এড়িয়ে যেতে পারতাম ক্লাস শেষ হবার পর মাস্টারমশাইকে দু-একখানা গান শুনিয়ে। সেই দিন আর নেই। মাস্টারমশাইরা বোধহয় আর গান-টান শোনেননা। ছাত্ররাও আর কেউই তেমন কাঁচা হয়না। সবারই এগোনোর তাড়া।

গলদটা এখনও ধরতেই পারছি না আমরা কেউ। নিপাট মুখস্থবিদ্যায় শিক্ষা যেভাবে কোনদিন আমাদের দেশে উন্নতি করেনি, ছাত্রের কৌতূহল যেভাবে কোন টিউশন ক্লাসই তোতাপাখির ন্যায় গলাধঃকরণে জাগাতে পারেনিা, জাতিও তেমনি পাখিপড়া বিদ্যার হাত ধরে গা এলিয়ে বসেই থাকবে। একচুলও এগোবে না। নড়বে না।

আসলে নামকরণটা নিজেই শিখতে হবে। কোনটা শিক্ষা, আর কোনটা জাকির নায়েক, নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। পাশের মানুষ যতই বলুক ডাইনোসরেরা আদপে হিন্দু, নিজেই সত্য যাচাই করে জেনে নেব হিটলার আসলেই কে ছিল।

বিশ্বাসের প্রতি অন্ধবিশ্বাস নাহয় এতদিন অনেক হল।

এবার নাহয় অবিশ্বাসেই আস্থা রাখা যাক খানিক।

আর যে বিশ্বাসের ঠেলা নেওয়া যাচ্ছে না!

Similar Articles

Leave a Reply